আমি একদিন বেশ অবাক হলাম। কারণ হলো একজন মানুষ যার কোন ন্যূনতম যোগ্যতা নেই, সে পরিচয় দিচ্ছে এভাবে, আমি হলাম শহীদুল হক, পি.এইচ.ডি.। প্রথমেই ধাক্কা খেলাম। ঠিক কত ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহ হবে তা বলতে পারছি না। শরীর আর মন দুটোই বেশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি আমার বস। তার কথায় আমার কাজ করতে হবে। তিনি আমাকে গাইড করবেন আর আমি তা বাস্তবায়ন করবো। যখন আমি বগুড়া থেকে টাঙ্গাইল বদলী হলাম তখন অনেকেই বলছিল, যান ওখানে বেশ ভাল পরিবেশ পাবেন। ওখানকার সবাই বেশ ফ্রেন্ডলী। উন্নয়ন সংস্থার কাজ। বেশ চ্যালেঞ্চ এবং জটিল। আর সহজ এবং সরল, যদি বস ভাল থাকেন এবং মনমানসিকতার দিক থেকে ইতিবাচক হন। যদি তার মনে কোন কুটিলতা না থাকে। অবশ্য আজকাল ভাল বস পাওয়া যেমন ভাগ্যের ব্যাপার তেমনি ভাল পরিবেশ পাওয়াও বেশ দুষ্কর। এর অন্যতম কারন হলো কম্পিটিশন। এখন উন্নয়ন সংস্থাগুলোতে এত বেশী কম্পিটিশন যে মান সন্মান নিয়ে কাজ করাই দুরূহ বিষয়। অহরহ শোনা যায়, ঘর ভাঙ্গার সংবাদ। কী ছেলে , কী মেয়ে। ক্যারিয়ার নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত যে, নিজের সংসারে কী হচ্ছে তার দিকে খেয়ালই করছেন না কিংবা চুপ করে থাকেন। আর এই রহস্যজনক নীরবতাই একসময় সংসারে ঝড় তুলে। কেউ কাউকে স্যাকরিফাইজ করছে না। যে যার মত চলছেন ক্ষনিকের মোহে। ভাবছেন না পরবর্তী প্রজন্মের কথা। সংসার করতে হলে যেমন যুতসই বোঝাপড়া দরকার তেমনি প্রয়োজন আনন্দ-বিনোদনের। এখন দেখা যাচ্ছে আনন্দ-বিনোদন চলে যাচ্ছে উন্নয়ন সংস্থার হাতে বা কর্পোরেট সংস্থায়। টীম গঠন করে ছেলে-মেয়েগুলোকে লোভনীয় অফার দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে দেশের কোন নামকরা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অথবা বিদেশে। বলা হচ্ছে এক্সপোজার ভিজিট বা অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মসূচী। অন্তরালে যা হচ্ছে তা আমরা সবাই জানি না। কিন্তু এর ফলাফল হলো আমাদের সংস্কৃতির বন্ধনকে আলগা করা। আমিও চলছি একই নদীর একই স্রোতের টানে। সরকারী পর্যায়ে সব জায়গায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েই আজ এই উন্নয়ন নদীতে ঝাপ। যে নদী ভাঙ্গছে প্রতিনিয়ত। কখনো এশিয়ায় আবার কখনো আফ্রিকায়। কখনো দাতা আছে আবার কখনো তারা উধাও। আজব নদীর অদ্ভুদ খেলা। চাকরী যা হয় তাও আবার চুক্তি মেয়াদে। মেয়াদ পূর্তির আগেই চলে অন্যত্র গমন। যেন একদল ভাসমান জেলে। যখন যে ঘাটে নৌকা বেড়ে সে ঘাটই হলো তাদের আস্তানা। কিছু মানুষ আছে যারা একসময় সমাজ বদলের জন্য উন্নয়ন সংস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বাস্তবতার আলোকে তাঁরা পুঁজিবাদের কাছে জিম্মি হয়ে ভুল পথে চলতে থাকেন, কালক্রমে তারাই হয়েছেন বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠনের মালিক। পেয়েছেন যশঃ আর প্রতিপত্তি। নব্য সমাজ সংস্কারক হিসেবে পাচ্ছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামকরা সন্মাননা। আমার বস শহীদুল হকও হয়ত একদিন তাদের কাতারে শামিল হবেন। এই প্রত্যয়েই মনে হয় তাঁর পি.এইচ.ডি.।
-এই যে মিস্টার- কী নাম আপনার?
-জ্বী, সুমন খান।
-বাহবা! চমৎকার! যেন নায়ক আমীর খান। বলে সে হেসে যাচ্ছে। কাকে যেন ইশারায় কাছে আসতে বলল। সালাম বিনিময় হলো।
-কী ব্যাপার, বড়ভাই হাসছেন কেন? বড় ভাই এর উচ্চারণ এমন ভাবে করল যেন বিশেষ শ্রদ্ধা প্রকাশ পেল না ইয়ার্কি আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। মনে হলো বড্ড ভাই।
-উনার নাম সুমন খান।
-সুন্দর নামতো। আপনি হাসছেন কেন- বড্ডভাই।
-ও জন্যই হাসছি। আমার নাম শহীদুল হক, পি.এইচ.ডি.। আর ওনার নাম সুমন খান। হলো- কিছু মিলল। ওনার হবে সাইফুর হক বা অন্য কিছু। উনি হলেন খান। তাও আবার খাঁটি না ভেজাল, তাতেও সন্দেহ আছে। বাদ দেন ওসব? সোজা পথে আসেন- আমাকে লক্ষ করে তিনি এ কথা বললেন।
-কোনটা সোজা পথ?
-আমি যা বলবো আপনি তাই করবেন।
-যদি না করি!
একথা শোনার পর তাঁর পাশে দাঁড়ানো মিলার দিকে তাকিয়ে অবাক হল। মিলাকে সে বলল, আমার কথা না মানলে বা না শুনলে কী হয় খান সাহেবকে একটু বল মিলা, আমার কথা আমি নিজে থেকে বলতে লজ্জা পাচ্ছি।
-ঠিক আছে বড্ড ভাই আমি সব ওনার সাথে শেয়ার করছি, আপনি কোন চিন্তা করবেন না।
-তাই যেন হয়। বলে সে অফিসের দিকে হাঁটা শুরু করল। আমার দিকে অবজ্ঞার মত একটা চাহনি দিয়ে মিলাকে চোখ টিপে কী যেন বুঝালেন। যে চোখের টিপের সাথে মিলা পরিচিত। আমি অবাক হলাম এমন মধ্য বয়সের একটা মানুষ কী করে এক তরুণীর সাথে চোখ টিপে ইশারা করে। এটা কেমন ভদ্রতা!
মাস্টারি বিডি ডটকম । ঢাকা । ২৩ মে ২০১৭ । ০৯ জৈষ্ঠ্য ১৪২৪
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম