Home / আরও / দুটি বাড়ি ছিল বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক সচিবালয় : রেহমান সোবহান
bb+house+mbd

দুটি বাড়ি ছিল বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক সচিবালয় : রেহমান সোবহান

মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ০৯ জুন ২০১৭ । ২৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৪

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সেই বাড়িটিসরকারি কর্তৃত্ব যখন কার্যত বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে আসে, তখন অর্থনীতি সচল রাখতে তাঁকে প্রতিদিনই নানা রকমের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হতো। সমস্যাগুলোর মধ্যে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল আরোপ করা, পশ্চিম পাকিস্তানের টাকশাল থেকে টাকা আসা বন্ধ হওয়ায় নগদ টাকার স্বল্পতা, রপ্তানিনীতি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির মূল্য পরিশোধের মাধ্যম নির্ধারণ প্রভৃতি, যেগুলোর সমাধান বের করা জরুরি ছিল।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদ ও কামাল হোসেনকে দায়িত্ব দেন, তাঁদের সঙ্গে অর্থনীতিবিদেরা তো ছিলেনই। তাঁরা আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁরা কখনো ধানমন্ডিতে নুরুল ইসলামের বাড়িতে বসতেন, কখনো সার্কিট হাউস রোডে কামাল হোসেনের বাড়িতে বসতেন। এ দুটি বাড়ি হয়ে ওঠে শেখ মুজিব সরকারের অর্থনৈতিক সচিবালয়। সেখানে তাঁরা প্রতিদিন আমলা, ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যাংকারদের সঙ্গে বসে সুনির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন সমস্যার পর্যালোচনা করতেন। তাঁরা নানা আদেশ ও নির্দেশনা দিতেন, যেগুলো ব্যবসায়ী, আমলাসহ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। তাঁরা সেখান থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দিতেন। কোনো কোনো দিন কামাল হোসেন, কোনো দিন তাজউদ্দীন আহমদ ৩২ নম্বর বা কামাল হোসেনের বাসা থেকে এসব নির্দেশনা দিতেন।
স্থানীয় অর্থনীতির সমস্যা মোকাবিলা করার পাশাপাশি অর্থনীতিবিদদের আরেকটি কাজ ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া। প্রথিতযশা ও গুণী বিদেশি সাংবাদিকেরা প্রতিদিন নুরুল ইসলামের বাড়িতে আসতেন। তাঁদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত সাংবাদিকও ছিলেন, যেমন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর টিলম্যান, পেগি ডারডিন, সিডনি শনবার্গ, দ্য গার্ডিয়ান-এর পিটার প্রিস্টন, মার্টিন উলাকোট, মার্টিন অ্যাডিনি, দ্য টাইমস-এর পিটার হ্যাজেলহার্স্ট, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর সাইমন ড্রিং, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সেলিগ হ্যারিসন প্রমুখ। এঁদের মধ্যে সিডনি শনবার্গকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য পাকিস্তান সরকার দেশ থেকে বের করে দিয়েছিল, যার জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার প্রায় পেয়ে যাচ্ছিলেন। আর পিটার প্রিস্টন পরবর্তীকালে দ্য গার্ডিয়ান-এর সম্পাদকও হয়েছিলেন। সাইমন ড্রিং, উলাকোট, সিডনি শনবার্গের মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিকেরা শুধু পেশাগত কাজের জন্য নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে আবেগের সম্পর্কে বাঁধা পড়ে প্রতিবেদন করে গেছেন। আরেকজনের কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন দ্য সানডে টাইমস-এর নিকোলাস টমালিন, যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ কাভার করে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলেন। কেমব্রিজে এক অনানুষ্ঠানিক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ অনেক রাজনৈতিক ঘটনার সংবাদ তিনি করেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের মতো আর কোনো দেশের সঙ্গে তিনি এতটা আবেগের সম্পর্কে বাঁধা পড়েননি।
এরপর আমি যখন লন্ডনে প্রচারণা চালিয়েছি, তখন চাওয়ামাত্র তাঁরা আমাকে তাঁদের প্রতিবেদন ও কলামের কপি দিয়ে সাহায্য করেছেন। ফলে আমি দ্য টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, নিউ স্টেটসম্যান, নিউ রিপাবলিক ও দ্য নেশন পত্রিকায় লিখতে পেরেছি। এমনকি তাঁরা আমাদের পাকিস্তানি শাসক চক্রের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খবরাখবর দিয়েও সহায়তা করেছেন। পিটার হ্যাজেলহার্স্ট মার্চে কামাল হোসেনের বাড়িতে চা খেতে খেতে আমাকে বলেছিলেন, ভুট্টো মনে করেন, বাংলাদেশিদের এই আন্দোলন আসলে শহরের কিছু শিক্ষিত মানুষের কারসাজি, যাঁরা সশস্ত্র সংগ্রাম সম্পর্কে কিছুই জানেন না। সেনাবাহিনী তো কিছু মানুষকে মেরেছে, আর কিছু মানুষকে জেলে পুরলে ও ভয় দেখালেই তা শেষ হয়ে যাবে।
যা-ই হোক, আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ওই সময় নুরুল ইসলামের বাড়ি বিদ্রোহী সরকারের ঘাঁটিতে পরিণত
হয়, সামরিক কর্তারাও এই বাড়িকে দেশদ্রোহী কাজের ডেরা হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর কারণ হচ্ছে, নুরুল ইসলামের নিকট আত্মীয় (ব্রাদার–ইন–ল) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্নেল ইয়াসিন ও টিঅ্যান্ডটির এস হুদা সেখানে যেতেন। কর্নেল ইয়াসিনের ওপর ঢাকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর খাদ্য সরবরাহের ভার ছিল। এই খবর আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে চলে যায়, ফলে তাঁরা কিছু সরবরাহকারীকে চাপ দিয়ে এই জোগান বন্ধ করতে প্ররোচিত করেছিলেন। এই কৌশল বেশ কাজে লেগেছিল। জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার স্মৃতিকথায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

রেহমান সোবহান
রেহমান সোবহান

এর পরিণতি ছিল ভয়ংকর। ২৫ মার্চের আক্রমণের পর কর্নেল ইয়াসিন ও হুদা দুজনকেই সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। ইয়াসিনকে লাহোরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়, আর হুদার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে চক্রান্ত করে ভারতের সঙ্গে গোপন টেলিযোগাযোগ স্থাপন করেছেন। ইয়াসিনকে জোর করে বঙ্গবন্ধু ও ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে হরতালের কারণে ঢাকা নগরে যানবাহনের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবে ফোরাম-এর সম্পাদক হওয়ায় আমার ভকসওয়াগনের কাচে সাংবাদিকের স্টিকার লাগানো ছিল, এতে করে আমি বেশ স্বাধীনভাবেই ঘুরতে পারতাম। ফলে আমি দিনের সময়টা সম্পাদক, অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদক—এভাবে ভাগ করে নিতে পারতাম, সব ভূমিকায়ই আমাকে কাজ করতে হতো। ফলে ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত আমি ও হামিদা হোসেন ফোরাম-এর খুবই ভালো কিছু সংখ্যা বের করতে পেরেছিলাম।
বঙ্গবন্ধু যতক্ষণ বাংলাদেশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন, ততক্ষণ আওয়ামী লীগের কর্মী ও আমজনতা নিজে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। সাধারণ মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় এটা সম্ভব হয়েছিল। তবে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় অবাঙালিদের ওপর হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। এর সংখ্যা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সেটাই অতিরঞ্জিত করে বাঙালিদের কচুকাটা করার যুক্তি দিয়েছে।
কথা হচ্ছে, অবাঙালিদের দুঃখ-কষ্ট সইতে হয়েছে, তা সে যে মাত্রায়ই হোক না কেন। কিন্তু ১ মার্চের পর থেকে অবস্থাপন্ন অবাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে শুরু করে। একসময় আওয়ামী লীগের নেতারা এই ভেবে শঙ্কিত হন যে তারা হয়তো অস্থাবর সম্পত্তি যেমন টাকা ও গয়না নিয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগের কিছু স্বেচ্ছাসেবী নির্দেশনা ছাড়াই বিমানবন্দর অভিমুখী গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করতে শুরু করেন। এ কারণে আওয়ামী লীগের প্রশাসন বাধ্য হয়ে নির্দেশনা জারি করে, এসব বন্ধ করতে হবে। কারণ এতে অবাঙালিদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার খবর আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।
খবর আসে, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন কাঠের ডামি রাইফেল নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আরও শুনলাম, বিভিন্ন দপ্তরের সশস্ত্র রক্ষীদের পয়েন্ট ৩০৩ রাইফেল চুরি হয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের পরীক্ষাগার থেকে রাসায়নিক পদার্থ খোয়া গেছে। কিন্তু এসব শৌখিন কাজে মানুষের মনে এই আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়নি যে আমরা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত।
ওদিকে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সহকর্মী আনিসুর রহমান শিল্পী কামরুল হাসানকে নিয়ে আমাদের চেতনা উজ্জীবিত রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপার্টমেন্টে গণসংগীতের আসর বসান। আনিসুর ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালানো হবে। সে কারণে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বন্ধুদের চিঠি লিখে আহ্বান জানান, তাঁরা যেন এর বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশে জনমত তৈরি করেন।
১৯৭১ সালের মধ্য মার্চে ইয়াহিয়ার ঢাকা আগমনের কারণে মনে হয়েছিল, সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভুট্টোর আসার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, তাঁর কাজই হচ্ছে মুজিব ও ইয়াহিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সম্ভাবনা নস্যাৎ করা। তাঁরাই ঠিক ছিলেন।

লেখকের আত্মজীবনী আন ট্র্যাঙ্কুইল রিকালেকশন্স : দ্য ইয়ার্স অব ফুলফিলমেন্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

রেহমান সোবহান : অর্থনীতিবিদ। চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

Jafar+Iqbal+int+mbd

একটি স্বপ্ন : মুহম্মদ জাফর ইকবাল

…এটা যদি ঠিকভাবে তৈরি করে সবাইকে জানানো যায়, তাহলে শুধু যে দেশ থেকে মানুষজন জায়গাটায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published.