মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ০৪ এপ্রিল ২০১৭ । ২১ চৈত্র ১৪২৩
বাংলার প্রথম মহিলা (আদি) কবি চন্দ্রাবতীর সুবিখ্যাত শিব মন্দিরটির অবস্থান কিশোরগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর দিকে মাইজখাপন ইউনিয়নের কাচারিপাড়া গ্রামে।
দেশের দর্শনীয় নির্দেশন ও পূরাকীর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির। নীলগঞ্জ রেলস্টেশনের নিকটবর্তী কাচারিপাড়া গ্রামে এ মন্দিরটি চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির নামে দেশের সাহিত্যিক বোদ্ধাদের কাছে সুপরিচিত।
ষোড়শ শতকের মনসা মঙ্গলের বিখ্যাত কবি দ্বিজ বংশীদাসের কন্যা ও বঙ্গের আদি মহিলা কবি চন্দ্রাবতী পূজা অর্চণা করত এ মন্দিরে। ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত এ মন্দিরটিকে ঘিরে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে।
নয়ান ঘোষ প্রণীত পালাগান ‘চন্দ্রবতী’ থেকে জানা যায়- চন্দ্রাবতীর সঙ্গে তার ছোটবেলার সাথী জয়ানন্দের গভীর প্রেম ছিল। ছোটবেলা থেকে একে অপরকে গভীরভাবে ভালবাসতো। চন্দ্রাবতীর সঙ্গে তার ছোটবেলার সাথী ও প্রেমিক জয়ানন্দের বিয়ে এক রকম নিশ্চিত ছিল। কিন্তু জয়ানন্দ এক মুসলমান রমণীর প্রেমে পড়ে ধর্মান্তরিত হন। চন্দ্রাবতীর হৃদয় ভেঙ্গে যায়। পরে অবশ্য জয়ানন্দ ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসেন চন্দ্রাবতীর কাছে। কিন্তু, ফিরিয়ে দেন তাকে অভিমানী চন্দ্রাবতী।

আত্মগ্লানিতে জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন। এ ঘটনায় চন্দ্রাবতী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। পিতা দ্বিজ বংশীদাসের কাছে দুটি প্রার্থনা জানান তিনি। ফুলেশ্বরী নদীতীরে মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা জানান। আর অন্যটি চিরকুমারী থাকার ইচ্ছা। চন্দ্রাবতীর পালায় তার বর্ণনা আছেঃ
‘অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে।
শিবপূজা কর আর লেখ রামায়ণে’\\
এমনি করেই এক সময়ের খরস্রোতা নদী ফুলেশ্বরীর তীরে শিব মন্দিরটি স্থাপিত হয়। বর্তমানে নদীটির কোন চিহ্ন না থাকলেও মন্দিরটি কালের সাক্ষী হয়ে, প্রেমের সাক্ষী হয়ে নিজস্ব মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মন্দিরটি নির্মাণশৈলীর শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। মন্দিরটি অষ্টকোনাকৃতির। উচ্চতা ১১ মিটার। আটটি কোনার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য এক দশমিক সাত মিটার। নিচের ধাপে একটি কক্ষ এবং কক্ষে যাবার জন্য একটি দরজা রয়েছে। ভেতরে শিবমূর্তি রয়েছে। শিব পূজা হয়। নিচের অংশটি দুই ধাপে নির্মিত হয়েছে। নিচের ধাপের চারিদিক প্রায় অর্ধবৃত্তাকার খিলানের সাহায্যে নির্মিত। প্রশস্ত কুলঙ্গি রয়েছে। নিচের ধাপের কার্ণিশ পর্যন্ত উচ্চতা ২.৭ মিটার। কক্ষের ভেতরে সাতটি জানালার মতো কুলঙ্গি রয়েছে। যার প্রস্থ্য ৫২ সে.মি. এবং দৈর্ঘ্য ৯৯ সে.মি.। কিছু অনবদ্য কারুকার্যও রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপটি সরলরেখায় নির্মিত। এ পর্যায়টি অর্ধবৃত্তাকার খিলানের সাহায্যে তৈরি এবং এতেও আছে প্রশস্ত কুলঙ্গি। চূড়ার শেষ প্রান্তে খাঁজ কাটা কারুকাজ এবং কলসাকৃতি চূড়ার শীর্ষে আছে ডাটার আকারে ‘ফাইনিয়েল’।
মন্দিরটি দীর্ঘদিন থেকে অত্যন্ত জীর্নশীর্ণ অবস্থায় ছিল। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটি সংস্কার করে। মেরামতের পরে এর সৌন্দর্য বেড়ে গেছে বহুগুণে। কিন্তু, পূর্বের শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেছে বহুগুণে। ১৯৯২ সনের ডিসেম্বরে সাম্প্রদায়িক গোলযোগের সময় মন্দিরটির কিছু ক্ষতিসাধন করে সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতিকারীরা। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় মন্দিরটি সংস্কার করা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোন দৃষ্টি নেই এই দর্শনীয় নিদর্শন ও পূরাকীর্তির দিকে। ফলে গত এক দশকে অবহেলার শিকার হয়ে মন্দিরটি আবারো শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। মন্দিরের পাশের তারকাঁটার বেড়া ভেঙ্গে পড়েছে। এদিকে কারও দৃষ্টি নেই।
দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবীসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে মন্দিরটির প্রতি একটা আলাদা টান রয়েছে। দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী মন্দিরটি দেখতে কিশোরগঞ্জ আসেন।
দীর্ঘদিন যাবৎ মন্দিরটির অবস্থান করিমগঞ্জ উপজেলার পাতুয়াইর গ্রামে উল্লেখ করা হলেও এ তথ্যটি প্রকৃতপক্ষে ভুল। এর নির্মাণকাল সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে মন্দিরটি ষোড়শ শতকের শেষপাদে নির্মিত হয়েছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস’ গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে। দেশের দূরদূরান্ত থেকে বহু প্রেমিক-প্রেমিকা, কবি-সাহিত্যিক আবেগপ্রবণ হৃদয়ের মানুষ মন্দিরটি পরিদর্শনে এসে স্তম্ভিত হৃদয়ে মন্দির অবলোকন করেন। স্থির হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ একান্তচিত্তে জীবনের মর্মন্তুুদ বিরহের স্মৃতি রোমন্থন করে সাগরের লোনাজলের মতো চোখের পানি ফেলেন।
সূত্র : ইন্টারনেট
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম