মাস্টারি বিডি । বাঁধন খান
ফিচার ডেস্ক । ২৭ অক্টোবর ২০১৮ । ১২ কার্তিক ১৪২৫
‘বিবি মরিয়ম’- ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সুবৃহৎ ও আকর্ষণীয় এ কামানটির নাম হয়তো অনেকের মনে নেই। অথচ এককালে এ কামানটি ছিল বড় বিস্ময়। ঢাকার চার শ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ কামানটির নাম। এ কামানের সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে সুবেদার মীর জুমলার নাম আর সেকালের ঢাকার কামান তৈরির কারিগরদের দক্ষতাও বটে। ওই সময় কামানটি ছিল ঢাকাবাসীর গর্বের ধন। তখন এ কামানকে ঘিরে নগরবাসীর আবেগ উচ্ছ্বাস ও আকাঙ্ক্ষার অন্ত ছিলো না।
১৭ শতকের গোড়ার দিকে সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপন করলে এখানে গড়ে ওঠে প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে ঢাকার নিরাপত্তা নিয়েও শাসকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। কারণ ঢাকার চারদিকে প্রবাহিত নদীতে তখন মগ, পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের উপদ্রব ছিল। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে বেশ কিছু কামান তৈরি করা হয়। এর মধ্যে দুটি কামান ছিল সুবিখ্যাত। বিশালত্বে, নির্মাণশৈলীতে ও সৌন্দর্যে এগুলো ছিল ভারতখ্যাত। কামান দুটির একটির নাম কালে খাঁ জমজম ও অপরটির নাম বিবি মরিয়ম। ব্রিটিশ রাজকর্মচারী ও পর্যটকেরা কালে খাঁকে দেখেই সবচেয়ে বেশি অবাক হন এবং এর বৃত্তান্ত লিখে রাখেন। কালে খাঁ বুড়িগঙ্গা নদীতে তলিয়ে গেলে বিবি মরিয়ম হয়ে ওঠে দর্শনীয় বস্তু।

বিবি মরিয়মের দৈর্ঘ্য ১১ ফুট। মুখের ব্যাস ছয় ইঞ্চি। কামানে ব্যবহূত গোলার ওজন পাঁচ মণ। অত্যন্ত শক্ত ও পেটানো লোহা দিয়ে কামানটি তৈরি করা হয়েছে। তাই তাতে মরচে ধরে না।
এ কামান দুটি প্রমাণ করে তখনকার ঢাকার কামান তৈরির কারিগরদের দক্ষতা। মোগল আমলে ঢাকায় উন্নতমানের কামান তৈরির বহু কারিগর ছিলেন। মজবুত ও টেকসই কামান তৈরিতে তাঁরা ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তখন ঢাকায় এ কামান শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। সুবেদার ও জমিদারেরা ফরমায়েশ দিয়ে এসব কারিগর দিয়ে তাঁদের প্রয়োজনীয় কামান তৈরি করিয়ে নিতেন। বর্তমানে মুর্শিদাবাদে যে বিশাল কামানটি দেখা যায়, নবাব আলীবর্দী খান ঢাকায় কামান তৈরির কারিগর জনার্ধন কর্মকারকে দিয়ে তা তৈরি করিয়ে নেন।
কালে খাঁ জমজম ও বিবি মরিয়মের নকশা তৈরি এবং নির্মাণকাজ তদারকি করেন মোগল কামান নির্মাতারা।
সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৬০ সালে মীর জুমলাকে বাংলার সুবেদার নিয়োগ করেন। মীর জুমলা ১৬৬১ সালে আসাম অভিযানের সময় ৬৭৫টি ভারী কামান ব্যবহার করেন। তাঁর মধ্যে বিবি মরিয়ম ছিল সর্ববৃহৎ। যুদ্ধশেষে বিজয়ী হয়ে তিনি বিবি মরিয়মকে বড় কাটরার দক্ষিণে সোয়ারিঘাটে স্থাপন করেন। তখন থেকে কামানটি মীর জুমলার কামান নামে পরিচিত লাভ করে। কালে খাঁর মতো মীর জুমলাও একই ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছিল মোগল শাসকদের পতনের পর।
ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালটার্স ১৮৪০ সালে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কামানটিকে কাদাপানি থেকে উদ্ধার করে চকবাজারের উত্তরে একটি বেদির ওপর স্থাপন করেন। তখন চকবাজার ছিল ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর স্থান। কামানটি চকবাজারে এনে রাখার পর তা দর্শনীয় হয়ে ওঠে। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে সব বয়সী মানুষ এ কামান দেখার জন্য ভিড় করে। হিন্দু রমণীরা এসে কামানটির মুখে সিঁদুরের ফোঁটা দেন।

চকবাজার ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হলে ১৯২৫ সালে ঢাকার জাদুঘরের কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টশালী কামানটিকে চকবাজার থেকে এনে সদরঘাটে স্থাপন করেন। তখন সদরঘাট ছিল ঢাকার সবচেয়ে মনোরম স্থান। এখানে এনে রাখার পর কামানটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গত শতকের পঞ্চাশ দশকে পাকিস্তান আমলে মীর জুমলাকে সদরঘাট থেকে এনে শোভাবর্ধনের জন্য গুলিস্তানের চৌরাস্তার মাঝখানে স্থাপন করা হয়। তখন গুলিস্তান ছিল ঢাকার কেন্দ্রস্থল এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। এখানে এনে রাখার পর কামানটি গুলিস্তানের কামান নামে পরিচিতি লাভ করে।
১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের সময় মীর জুমলাকে গুলিস্তানের মোড় থেকে উঠিয়ে এনে ওসমানী উদ্যানের প্রধান ফটকের পেছনে স্থাপন করা হয়।
আর তখন থেকেই এ কামান লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে দেশবাসী তো বটেই, ঢাকাবাসীও কামানটিকে ভুলতে বসেছে।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম