Home / ফটো গ্যালারি / জামদানি শাড়ি এ শীতে যোগ করতে পারে অন্যরকম মাত্রা
jamdani+mbd-ok-2

জামদানি শাড়ি এ শীতে যোগ করতে পারে অন্যরকম মাত্রা

…চারদিকে এখন শীতের আগমন বার্তা। জামদানি শাড়ি এ শীতে যোগ করতে পারে অন্যরকম মাত্রা। উজ্জ্বল জামদানি শাড়ি আপনাকে সহজেই বিষণ্ণ শীতল পরিবেশে করে তুলবে প্রাণবন্ত। লাল জামদানির পাশাপাশি আপনি অনেক ধরনের রঙের শাড়ি রাখতে পারেন আপনার পছন্দের তালিকায়। জামদানি শাড়ির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, শাড়ি কিছুটা মলিন হয়ে গেলে সামান্য কিছু খরচ করেই আবার করে নিতে পারেন নতুন জামদানি শাড়ি। সরাসরি তাঁতি বাড়িতে বা জামদানি শাড়ির দোকান থেকে ২০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচের মাধ্যমে এভাবেই আপনার পুরনো জামদানির নতুন রূপ দেয়া যেতে পারে।…

jamdani+mbd-3

মাস্টারি বিডি ডটকম ।
ঢাকা । ২৫ নভেম্বর ২০১৭ । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

জামদানি একান্তই আমাদের। জামদানি প্রাচীনকালে তাঁত বুনন প্রক্রিয়ায় কার্পাশ তুলার সুতা দিয়ে মসলিন নামে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো এবং মসলিনের ওপর যে জ্যামিতিক নকশাদার বা বুটিদার বস্ত্র বোনা হতো তারই নাম জামদানি। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়ি বোঝানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশায় সমৃদ্ধ ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, ঘাগরা, রুমাল, পর্দা, টেবিলক্লথ সবই জামদানির আওতায় পড়ে। জামদানি শাড়ি অনেক ধরনের হয়। তবে প্রাথমিকভাবে জামদানি শাড়ির উপাদান অনুযায়ী এটি দুই ধরনের। ১. ফুল কটন জামদানি- যা সম্পূর্ণ তুলার সুতায় তৈরি। ২. হাফ সিল্ক জামদানি যার আড়াআড়ি সুতাগুলো হয় রেশমের আর লম্বালম্বি সুতাগুলো হয় তুলার। সপ্তদশ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এছাড়া মুঘল নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহৃত হতো। জামদানির নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে। একটি মত অনুসারে, ‘জামদানি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। ফার্সি জামা অর্থ কাপড় এবং দানা অর্থ বুটি, সে অর্থে জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়। এ কারণে মনে করা হয় মুসলমানরাই ভারত উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ও বিস্তার করেন। আরেকটি মতবাদ হল, ফারসিতে ‘জাম’ অর্থ এক ধরনের উৎকৃষ্ট মদ এবং ‘দানি’ অর্থ পেয়ালা। জাম পরিবেশনকারী ইরানি সাকির পরনের মসলিন থেকে জামদানি নামের উৎপত্তি ঘটেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকেও বঙ্গ থেকে সোনারগাঁ বন্দরের মাধ্যমে মসলিনের মতো সূক্ষ্ম বস্ত্র ইউরোপে রফতানি হতো।

jamdani+mbd-7

তবে মসলিন শব্দটির উৎপত্তি সম্ভবত ইরাকের মসুল শহর থেকে। আর জামদানি শব্দটি এসেছে পারস্য থেকে। বুটিদার জামা থেকে জামদানি শব্দটি পাঠান সুলতানদের আমলে বাংলায় সুপ্রচলিত হয়। নবম শতকে আরব ভূগোলবিদ সুলাইমান বাংলাদেশের মসলিন ও জামদানির উল্লেখ করেছেন তার গ্রন্থে। প্রখ্যাত পর্যটক ইবনেবতুতা ১৪০০ শতকে লেখা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে সোনারগাঁয়ের বস্ত্র শিল্পের প্রশংসা করতে গিয়ে মসলিন ও জামদানির কথা বলেছেন।

jamdani+mbd-ok

মুঘল আমলে মসলিন ও জামদানি শিল্পের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়। সে সময় নানা রকম নকশা করা মসলিন ও জামদানি দিল্লি, লখনৌ ও মুর্শিদাবাদে চড়া দামে বিক্রি হতো। মসলিন কাপড় এত সূক্ষ্ম ছিল যে, একটি আংটির ভেতর দিয়ে পুরো একটি মসলিনের শাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া যেত। জামদানি বিখ্যাত ছিল তার বিচিত্র নকশার কারণে। প্রতিটি নকশার ছিল ভিন্ন ভিন্ন নাম। পান্নাহাজার, বুটিদার, দুবলিজাল, তেরসা, ঝালর, ময়ূরপাখা, কলমিলতা, পুইলতা, কল্কাপাড়, কচুপাতা, আঙুরলতা, প্রজাপতি, শাপলাফুল, জুঁইবুটি, চন্দ্রপাড়, হংসবলাকা, শবনম, ঝুমকা, জবা ফুল এমনি নানা রকম নাম ছিল এসব নকশার। ভিন্ন জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের বয়নশিল্প হিসেবে প্রাচ্যের বয়নশিল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল জামদানি মোটিফ। এ মোটিফে খুব সহজেই কাপড়ের ভেতর ছায়ার মাঝে তৈরি করা যায় নকশার প্রতিবিম্ব। মোটিফগুলো জ্যামিতিক আইন অনুসরণ করলেও তা শুধু রেখা, চার কোণা কিংবা ত্রিভুজ নয় বরং তা দিয়ে ফুল, লতা-পাতা থেকে শুরু করে ফুটে উঠে নানা রকম ডিজাইন বিন্যাস। এটি মূলত বাংলার ঐতিহ্যের ধারক মসলিনের এক ধরনের জাতি। তবে এর পাড় ও জমিনে অপেক্ষাকৃত মোটা সুতায় বুননের মাধ্যমে ডিজাইন ফুটিয়ে তোলা হয়। সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতেও শতাধিক পণ্য বাংলা থেকে ইউরোপিয়ানরা হামবুর্গ, লন্ডন, মাদ্রিদ, কোপেনহেগেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠাত; যার মধ্যে জামদানিই সর্বাধিক সমাদৃত ছিল। এক সময় শুধু গজ কাপড় হিসেবে বোনা হলেও পরবর্তীতে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে জামদানি শাড়িতে। বর্তমানে সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া এমনকি হোম টেক্সটাইলেও জামদানি জনপ্রিয় অধ্যায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

jamdani+mbd-5

সাধারণভাবে জামদানি পরলেই মেয়েদের সুন্দর দেখা যায়। সঙ্গে লং স্লিভ বা স্লিভলেস ব্লাউজ বা ফ্যাশনেবল ব্লাউজেই এ শাড়ি ভালো মানায়। আর একেবারেই বাঙালি সাজ জামদানির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো। প্রাচীনকাল থেকেই এ ধরনের কাপড় তৈরির জন্য শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় বরাবর পুরনো সোনারগাঁ অঞ্চলটিই ছিল ব্যাপক উৎপাদন কেন্দ্র।

বর্তমানে রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ এবং সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ১৫৫টি গ্রামে এ শিল্পের বর্তমান নিবাস। প্রাচীন সময়ে জামদানি বয়নে একমাত্র মুসলিম কারিগররাই ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। এখনও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকই এ শিল্পের দক্ষতার সঙ্গে জড়িত। একটি জামদানি কাপড় বুনতে প্রতিটি তাঁতে দু’জন করে কারিগর থাকেন। এদের একজন দক্ষ কারিগর, তার পদবি মূল কারিগর। অপর একজন মূল কারিগরের সহায়তাকারী শিক্ষানবিস বা সাগরিদ। একজন জামদানি শিল্পী প্রকৃত অর্থেই শিল্পী। বহু মেধা ও শ্রমের সঙ্গে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে জামদানি সে তৈরি করে অন্যের ব্যবহারের জন্য, অন্য এক রমণী- যাকে হয়তো সে দেখেনি কোনোদিন তাকেই করে তোলার চেষ্টা করে আকর্ষণীয়। জামদানি শিল্পের নান্দনিক মর্যাদাময় বয়ন নকশা এবং অসাধারণ কারিগরি নিপুণতা সব সময় আমাদের তাঁতশিল্পের এক উজ্জ্বলতম অবিস্মরণীয় উদাহরণ। ‘ইন্ডিয়ান আর্ট অ্যান্ড দিল্লি’ গ্রন্থে জর্জ ওয়াটের ধারণা, জামদানি ডিজাইনের নমুনাগুলো নিঃসন্দেহে ইরানি শিল্প থেকে গৃহীত। সে সময়ের জামদানি তাঁতিদেরও অনুমান ইরানের কিংবা বয়ন নকশা জামদানিকে প্রভাবিত করছে। রঙয়ের বিন্যাস ছিল রুচিসম্মত ও বাহুল্যবর্জিত। পুরনো জামদানি শিল্পকর্মগুলো পৃথিবীর বয়নশিল্পের ইতিহাসের একেকটি প্রামাণ্য দলিল।

jamdani+mbd-13

বহু আগেই জামদানি শাড়ির জনপ্রিয়তা দেশ ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে বিদেশেও। সর্বোপরি জামদানি বাংলাদেশের একটি ব্র্যান্ড। ফ্যাশন মহলে বাংলাদেশের পরিচিতি মসলিন জামদানির দেশ হিসেবেই। বিয়ের শাড়ি মানেই বেনারসি বা জর্জেটে পুঁতি-চুমকির কাজ। কিন্তু এসব থেকে বেরিয়ে এসে একটা জামদানি পরে দেখুন বিয়েতে। তিন-চার মাস আগে থেকে পরিকল্পনা করে বিয়ের শাড়িটা তৈরি করতে পারেন; তাতে প্রকাশ পাবে আভিজাত্যের। জামদানি মানে তো কেবল ছয় গজের শাড়িই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

jamdani+mbd-2

চারদিকে এখন শীতের আগমন বার্তা। জামদানি শাড়ি এ শীতে যোগ করতে পারে অন্যরকম মাত্রা। উজ্জ্বল জামদানি শাড়ি আপনাকে সহজেই বিষণ্ণ শীতল পরিবেশে করে তুলবে প্রাণবন্ত। লাল জামদানির পাশাপাশি আপনি অনেক ধরনের রঙের শাড়ি রাখতে পারেন আপনার পছন্দের তালিকায়। জামদানি শাড়ির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, শাড়ি কিছুটা মলিন হয়ে গেলে সামান্য কিছু খরচ করেই আবার করে নিতে পারেন নতুন জামদানি শাড়ি। সরাসরি তাঁতি বাড়িতে বা জামদানি শাড়ির দোকান থেকে ২০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচের মাধ্যমে এভাবেই আপনার পুরনো জামদানির নতুন রূপ দেয়া যেতে পারে।

jamdani+mbd

জামদানি আমাদের দেশে যেটি হচ্ছে এখন তা ঢাকাই জামদানি নাম পেয়ে গেছে। কারণ আমাদের দেশ ছাড়াও ভারতে প্রচুর পরিমাণে জামদানি তৈরি হচ্ছে। ভারত থেকে যে জামদানি হচ্ছে সেগুলো টিস্যু জামদানি, নেট জামদানি নামে বিক্রি হচ্ছে। এতদিন ভারত থেকে আমাদের দেশে দাদারা এসে জামদানি শাড়ি নিয়ে গেছেন সেটি দেখেই অভ্যস্ত ছিলাম; কিন্তু ইদানীং ভারতের জামদানি আমাদের দেশে ঢুকে গিয়েছে।

jamdani+mbd-6

জামদানি শাড়ির যত্ন

শখ করে অনেকেই কিনে নেন জামদানি শাড়ি; কিন্তু যত্নের অভাবে খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে এ সুন্দর পোশাকটি। তাই শুধু শখ করে কিনলেই চলবে না, নিতে হবে যথাযথ যত্ন। জামদানি শাড়িটি কেনার সঙ্গে সঙ্গেই ফলস বা পাড় লাগিয়ে নেবেন। এতে করে ময়লা বা জুতার ঘষায় পাড় নষ্ট হবে না। শাড়ি যদি বৃষ্টিতে বা ঘামে ভিজে যায় তাহলে বাড়ি ফিরে যত দ্রুত সম্ভব ফ্যানের বাতাসে ছড়িয়ে দিন। যদি সম্ভব হয় তাহলে হালকা রোদে, যেমন বিকালের রোদে শুকিয়ে নিন। হাফ সিল্ক বা রেশমের জামদানি শাড়ির বুননে মূলত মাড় ব্যবহার করা হয়, যার ফলে পানি বা ঘাম লাগলে সাদা দাগ বসে যায়। আর শাড়িটা যদি হয় সাদা তাহলে হলদে ময়লা দাগ বসে যায়। তাই গরমের সময় সুতি জামদানি পরাই ভালো। ব্যবহারের পর অনেকদিন শাড়ি ভাঁজ করে রেখে দিলে তা ভাঁজে ভাঁজে ফেটে যায়, আবার হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলেও মাঝখান থেকে ফেটে যায়। তাই জামদানি শাড়ি হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে বা ভাঁজ করে না রেখে থান কাপড় যেসব রোলে পেঁচিয়ে রাখে, সেসব রোলে পেঁচিয়ে রাখুন। অনেকদিন পর্যন্ত শাড়ি ভালো থাকবে।

jamdani+mbd-11

সর্বশেষে বলা যায়, বর্তমান সময়ে প্রসার অনেকটা কমে আসা আমাদের গৌরবের আলোকশিখাকে দীপ্যমান করার প্রচেষ্টায় আসুন আবারও আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। সময়োপযোগি পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যদিয়ে আমাদের নিজস্ব শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখি। আমাদের প্রয়োজন- সময়ের বাস্তবতায় প্রতিকূলতাকে জয় করে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে জামদানি তাঁতিদের স্বর্ণযুগের পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ। এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে আমাদের সবাইকে।

সূত্র : সমকাল

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

logo_20250411_115413268

নতুন লোগো প্রকাশ করল বাংলাদেশ পুলিশ

ঢাকা, শুক্রবার ১১ এপ্রিল ২০২৫ মাসস দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাংলাদেশ পুলিশের লোগোতে কিছুটা ‘সংস্কার’ করা হয়েছে। এতে জাতীয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published.