মাস্টারি বিডি ডটকম । শেখ নজরুল
ঢাকা । ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩
যুদ্ধক্ষেত্রে মিত্রপক্ষের ফলপ্রসূ প্রচার-প্রচারণা যে কোন ভয়ংকর অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সেই ধারণায় স্বাধীনতা যুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলো ‘স্বাধীন বাংলা বেতর কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান। পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার পর ২৬ মার্চ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর জন্ম ছিল অবশ্যম্ভাবী। হানাদার কবলিত স্বাধীনতাকামী জাতির জন্য চট্টগ্রামের কালুরঘাটে সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি হয়ে ওঠে স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী সেক্টর। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ দ্রুত পরিণত হয় বাঙ্গালি জাতির আকাঙ্ক্ষায়। একাত্তরের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের পর মূলত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়।
অস্থায়ী সরকারে কার্যক্রমের সঙ্গে যুদ্ধরত জনগণের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। একাত্তরের ২৫ মে ৫০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে যার প্রচারের শুভ সূচনা হয়। কেন্দ্রের অনুষ্ঠানসূচিতে বাংলা-ইংরেজি সংবাদ, মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনাভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘অগ্নিশিখা’, বিশেষ কথিকা ‘চরমপত্র’, ‘বঙ্গবন্ধুর বাণী’ ও দেশাত্ববোধক গান ‘জাগরণী’ পরিবেশনার মাধ্যমে ‘স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র’ যুদ্ধের প্রেরণাদায়ক শক্তির বিকাশ লাভ করে।
প্রথমে এই কেন্দ্রের কাজ পরিচালিত হতো একটি দুতলার বাড়ির কক্ষে। স্টুডিও ছিল একটি। পরে অন্য কক্ষে অতিরিক্ত আরও একটি স্টুডিও স্থাপন করা হয়। তবে কোন আধুনিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না বাদ্যযন্ত্র ও পেশাদার যন্ত্রী। আবদুল মান্নানের পরিকল্পনায় যুদ্ধদিনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’ লিখতেন ও পাঠ করতেন প্রয়াত এম আর আখতার মুকুল। মোস্তফা আনোয়ার ও আশরাফুল আলমের পরিচালনার ‘অগ্নিবীণা’য় পরিবেশিত হতো বিদ্রোহী সঙ্গীত। কিছুদিনের মধ্যে অনুষ্ঠানসূচিতে যুক্ত হয় বিশ্ব জনমত এবং সাপ্তাহিক জয়বাংলা পত্রিকার সম্পাদকীয় মন্তব্য। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান ‘রণভেরী’ এবং ‘দর্পণ’ লিখতেন ও পড়তেন আশরাফুল আলম।
একাত্তরের ৬ জুন অনুষ্ঠানমালায় যুক্ত হয় কল্যাণ মিত্রের ‘জল্লাদের দরাবর’। ইয়াহিয়া খানের রূপক হিসেবে কেল্লা ফাতেহ আলী খান শীর্ষক আলোচিত চরিত্রে প্রয়াত রাজু আহমেদের অভিনয় সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রয়াত নারায়ণ ঘোষ (মিতা), জহিুরুল হক, ইফতেখারুল আলম, বুলবুল মহলানবীশ এবং করুণা রায়ের প্রাণস্পর্শী অভিনয়ে জুলাই মাস থেকে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবগাঁথা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে। ‘সোনার বাংলা’, ‘পিণ্ডিপ্রলাপ’, ‘কাঠগড়ায় আসামি’, ‘রণাঙ্গনের চিঠি’, ‘মুক্ত অঞ্চল ঘুরে এলাম’ ইত্যাদি অনুষ্ঠান সংযোজিত হয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যুদ্ধের প্রাণরসায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে’ লিখতেন ফয়েজ আহমেদ এবং দীপ্ত কণ্ঠে উপস্থাপন করতেন কামাল লোহানী।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘প্রতিনিধির কণ্ঠ’। মুক্তিযোদ্ধাদের মনবল বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এবং অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এ অনুষ্ঠান থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করতেন। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এজি ওসমানীও এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর দিগনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছাত্র নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তব্য প্রদান করে ছাত্র-জনতার মনে সাহস ও শক্তি সঞ্চার করতেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠ করার জন্য সেকান্দার আবু জাফর, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী, মাহবুব তালুকদার, বেলাল মোহাম্মদ, বিপ্রদাস বড়–য়া, কাজী রোজী প্রমুখ সাহসী কবি জ্বালাময়ী কবিতা লিখতেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, আবদুল লতিফ, ফজল-এ-খোদা, গোবিন্দ হালদার, নঈম গহর, সলীল চৌধুরী, শ্যামল দাস, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কবি আজিজুর রহমান, হাফিজুর রহমান প্রমুখের কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের সৃষ্টি এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে। আবদুল জব্বার, অজিত রায়, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্র নাথ রায়, মান্না হক, এম এ মান্নান, কাদেরী কিবরিয়া, শাহীন মাহমুদ প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে প্রচারিত হয়েছে উদ্দীপক সঙ্গীত। সন্জীদা খাতুন, কল্যাণী ঘোষ, লাকী আখন্দ, স্বপ্না রায়, মালা খান, রূপা খান, মাধুরী ভৌমিক, অজয় কিশোর রায়, কমর উদ্দীন, রঞ্জন ঘটক, মনোরঞ্জন ঘোষাল, লায়লা জামান, বুলবুল মহলানবীশ, এমএ খালেক, মকসুদ আলী সাঁই, ফকির আলমগীর, প্রবাল চৌধুরী, কল্যাণ মিত্র, রফিকুল আলম, লীনা দাস, মহিউদ্দীন খোকা, সাধন সরকার, ভারতী ঘোষ প্রমুখের সমবেত সঙ্গীত যুদ্ধরত জনতাকে দিন-রাত জাগ্রত রেখেছিল। সুজেয় শ্যাম, কল্যাণ ঘোষ, গোপীবল্লব বিশ্বাস, মৃদুল দত্ত, অবিনাশ শীল, সুনীল গোস্বামী, দিলীপ দাসগুপ্ত, ঝুমা খান, জাহিদ হোসেন প্রধান প্রমুখ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কামাল লোহানী, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, হাসান ইমাম প্রমুখের সম্পাদনায় ছিল যুদ্ধসংক্রান্ত নিয়মিত সংবাদ উপস্থাপন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মূল রেডিও স্টেশন পাক হানাদারদের দখলে থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদপ্রাপ্তিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রই ছিলো মূল ভরসা। এগারটি সেক্টরে ভাগ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হলেও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’কে একটি সেক্টরের মর্যাদা প্রদানের দাবি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। আজও সেই দাবী সর্বোচ্চ উচ্চকিত।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম