মহাদেব সাহা ষাটের দশকের খ্যাতিমান কবি। প্রেম, বিরহ, স্বদেশীচেতনা, নিসর্গসহ জাগতিক জীবনের নানা অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে মহাদেব সাহা তার কাব্যচর্চাকে চলমান রেখেছেন। তিনি বিরল কাব্য প্রতিভা নিয়ে আপন মহিমায় নির্মাণ করেছেন। রোদেলা আলো ঝলমলে তার নিজস্ব কাব্য জগত। তার প্রতিটি কবিতায় পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে। মহাদেব সাহা বাংলাদেশের কবিতা জগতের একটি উজ্জ্বল মুখ। তার সাবলীল ভাষা বিন্যাস, সহজ শব্দচয়ন এবং ব্যতিক্রমী রচনাশৈলী ও বিষয় নির্বাচন তার কবিতার প্রতিপাদ্য। তাকে নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বিস্তর।
করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,/এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। (চিঠি দিও)
এই হচ্ছে মহাদেব সাহার প্রেমজ উচ্চারণ। মহাদেব সাহাকে বলা হয় প্রেম প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের কবি। প্রেম ও প্রকৃতির মাঝে তিনি খুঁজে পান জীবনের অন্য রকম মাদকতা। তবে নারী প্রেমের চেয়ে মানবপ্রেম কখনো কখনো সবকিছু ছাপিয়ে কবিসত্তাকে মহিমান্বিত করেছে। প্রেম ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি তিনি স্বদেশ প্রেম, স্বজাতি চেতনাও তার কবিতার অনুষঙ্গ করেছেন। তার কবিতায় আছে
হৃদয়ের টান, আকুতি ও উচ্ছ্বাস। ষাটের সামাজিক অবস্থা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের জাঁতাকলের নিষ্পেষণের মধ্যে যে কজন কবি নিজস্ব চিন্তাচেতনা নিয়ে, মেধা ও মননে দ্যুতি ছড়িয়ে কাব্যজগতে আজ অবধি সাফল্যের সঙ্গে বিচরণ করছেন তাদের মধ্যে মহাদেব সাহা অন্যতম। মূলত রোমান্টিক চেতনাকে নির্ভর করে তার কাব্য জগতে প্রবেশ ঘটলেও স্বদেশ প্রেম এবং সমকালীন সমাজ তার কবিতায় আলাদা আবেদন তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর কবিতাও তিনি লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন ছাত্রজীবনেই। প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্য তার কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ হলেও জীবন বাস্তবতার সঙ্গে শিল্পের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন তিনি। ষাটের দশকের অনেক কবিই রাজনৈতিক স্লোগানসর্বস্ব কবিতা লিখেছেন, বিবৃতিপ্রধান কবিতা রচনায়ও প্রয়াসী হয়েছেন অনেকেই, জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছেন। মহাদেব সাহা ওই পথ মাড়াননি। তিনি ক্রমান্বয়ে জীবনের গভীরে মাটির গভীরে প্রবেশ করেছেন। লিখেছেন মাটি ও মানুষের কবিতা, প্রকৃতি যেখানে অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ। অতি কল্পনা প্রবণতা, রহস্যময়তা, জটিল জীবন প্রক্রিয়া এসব তিনি কখনোই কবিতায় প্রাধান্য দেননি।
মহাদেব সাহা তার কাব্য প্রতিভার জন্য বহু পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ১৯৮৩ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মননার মধ্যে ১৯৯৫ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, ২০০২ সালে খালেকদাদ চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার অন্যতম। কলকাতা থেকে লাভ করেছেন `বঙ্গবন্ধু` পুরস্কার।

কবি মহাদেব সাহার জন্ম ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট (বঙ্গাব্দ ২০ শ্রাবণ ১৩৫১) সিরাজগঞ্জের এক ছায়াঘেরা পাখিডাকা প্রকৃতির সুন্দর মনোরম পরিবেশে আঁকা ধানঘড়া গ্রামে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি তিনি বহু বছর সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জন্মদাতা গদাধর সাহা ও গর্ভধারিণী বিরাজমোহিনীর একমাত্র সন্তান তিনি। স্ত্রী নীলা সাহা এবং সৌধ ও তীর্থ দুই পুত্র নিয়ে কবির সংসার জীবন।
কবি মহাদেব সাহা তার কবিতার মধ্য দিয়ে বার বার আমাদের অতি কাছের আত্মীয়র মতোই আপন হয়ে আছেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা- প্রিয় কবি।

সালাম সালেহ উদদীন : কথাসাহিত্যিক
মাস্টারি বিডি । ঢাকা । ০৫ আগস্ট ২০১৮ । ২১ শ্রাবণ ১৪২৫
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম