মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ২৬ অক্টোবর ২০১৬ । ১১ কার্তিক ১৪২৩
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্যসেবাকে যুগোপযোগী করে জনগণের দোড়গোঁড়ায় নিয়ে যাবার জন্য ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে চিকিৎসকদের আরো আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়ে বলেন, ‘বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য আমরা ১৫ বছর মেয়াদী টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। এ লক্ষ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। বিসিপিএস এই মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স (বিসিপিএস)-এর ১৩তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। সংবাদ বাসস-এর।
শেখ হাসিনা চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা রোগীদের চিকিৎসা সেবাটা ভালভাবে দেবেন। একটা কথা মনে রাখবেন- ওষুধের চাইতে একজন ডাক্তারের মুখের কথাতেই অর্ধেক অসুখ কিন্তু ভাল হয়ে যায়। কারণ আমরাতো রোগী হই মাঝে মাঝে আমরা বুঝি।’
চিকিৎসা সেবাকে একটি মহান ব্রত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়, একটি মহান ব্রত। আপনারা নিষ্ঠা ও মেধা প্রয়োগ করে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন। আর্ত-পীড়িতদের সেবাদানের জন্য সামর্থ্য অর্জন করেছেন। এখানেই শেষ নয়, আপনাদের মধ্যে সেবাদানের মনোভাব তৈরি করতে হবে। প্রতিটি রোগীকে নিজের পরিবারের একজন সদস্য মনে করে সেভাবে সেবা প্রদান করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারণ বাংলাদেশকে আমরা আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন পিজি হাসপাতাল এবং আজকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতির পিতার দেয়া একটি ভাষণের উদ্ধৃতি দেন প্রধানমন্ত্রী-‘আপনারা ডাক্তার আপনাদের মন হতে হবে অনেক উদার। আপনাদের মন হবে সেবার। আপনাদের কাছে বড় ছোট থাকবে না। আপনাদের কাছে থাকবে রোগ, কার রোগ বেশি কার রোগ কম। তাহলেই তো সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ শিক্ষার জন্য আমরা সব সুবিধা নিশ্চিত করে যাচ্ছি। একের পর এক বিশেষায়িত হাসপাতাল করে দিচ্ছি। আপনারা এ সব সুবিধা কাজে লাগিয়ে জ্ঞান অর্জন করেন, রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং সমাবর্তন বক্তৃতা প্রদান করেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স (বিসিপিএস) সভাপতি অধ্যাপক মো. সানাওয়ার হোসেন।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মো. নাসিম।
স্বাগত বক্তৃতা করেন কলেজের সাবেক সভাপতি এসএএম গোলাম কিবরিয়া।
প্রধানমন্ত্রী সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এফসিপিএস এবং এমসিপিএস ডিগ্রী অর্জনকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাঝে সনদ এবং কৃতি শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বর্ণ পদক বিতরণ করেন।
অনুষ্ঠানে বিসিপিএস সভাপতি অধ্যাপক মো. সানওয়ার হোসেন এদিন সমাবর্তনে সনদ লাভকারি শিক্ষার্থীদের শপথ বাক্য পাঠ করান।
জাতির পিতা জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা- এ পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে তা অন্তর্ভুক্ত করে ছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালে ১৯৭২ সালে দেশে মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চাহিদা মেটাতে এই কলেজ অব ফিজিশিয়ানস্ এন্ড সার্জনস্ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু জনগণ কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য কাঠামোকে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। জাতির পিতা চিকিৎসকদের মর্যাদা ১ম শ্রেণীতে উন্নীত করেছিলেন। তাঁরই পদাংক অনুসরণ করে তিনি সেবিকাদের মর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করেছেন।
জাতির পিতার দর্শনকে ধারণ করেই তাঁর সরকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর দেশে প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি। এখন আমরা প্রত্যেক ডিভিশনে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
তার সরকারের আমলে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে গৃহিত পদতেক্ষপ সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ এবং জনসংখ্যা নীতিমালা ২০১২ প্রণয়ন করেছি এবং এ পর্যন্ত সারাদেশে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে এই কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর উদ্যোগ নিলেও দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তীতে সরকার গঠন করতে না পারায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকান্ডের মত এটাকেও বন্ধ করে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন মেডিকেল হাসপাতালে সরকারের চালু করা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির জন্য সৃষ্ট রেফারেল সিষ্টেমটাও বিএনপি জোট বন্ধ রাখে ।
তিনি বলেন, তাঁর সরকার স্থানীয় পর্যায় থেকে- গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলাভিত্তিক তিনস্তর বিশিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে প্রায় ৩০ ধরনের ঔষধ প্রদান করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের ফলে মোবাইল ফোনকে জনগণের হাতের নাগালে এনে দেয়ার মাধ্যমে তাঁর সরকার সকল জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে মোবাইল ফোনে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং বিভিন্ন হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা প্রবর্তন করেছে।
চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রসারে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩শ’ ৪৫টি নতুন চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। চিকিৎসা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মোট ১২ হাজার ৮শ’ ৪টি আসন বাড়ানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকারের সাত বছরে ১২ হাজার ৭শ’ ২৮ জন সহকারী সার্জন এবং ১শ’ ১৮ জন ডেন্টাল সার্জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার নতুন নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দান প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ৩ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির সর্বমোট ৩ হাজার ৭১টি পদে জনবল নিয়োগ দিয়েছি। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন পর্যায়ে ৪ হাজার ৮শ’ ৫৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে নিয়োগ দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট নিরসনে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের ৩৩তম ব্যাচে ৬ হাজার ২৩৫ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়।
শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করেছে এবং মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার এবং লেকটেটিং মাদার ভাতা চালু করেছে। ২৭ মার্চ ২০১৪-তে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পোলিওমুক্তি সনদ লাভ করেছে ।
চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শয্যা সংখ্যা ৭শ’ থেকে ১৫শ’ করেছি। ৫০-শয্যা বিশিষ্ট জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল স্থাপন করেছি। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটকে ৩শ’শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। ৫শ’ শয্যার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারিদের জন্য ১শ’ ৫০-শয্যার আধুনিক হাসপাতাল এবং জাতীয় ইএনটি ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্ল্যাড ক্যান্সার এবং থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকার কুর্মিটোলায় ৫শ’ শয্যাবিশিষ্ট এবং খিলগাঁওয়ে ১৫শ’ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল চালু করেছি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক অত্যাধুনিক বার্ন ইউনিটসহ দেশের সরকারী বৃহৎ হাসপাতালগুলোতে বার্ণ ইউনিট খোলা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথক বার্ণ এবং প্লাষ্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণের কাজও এখন চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতিরপিতার পরিবারের অপর জীবিত সদস্য ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ট্রাস্ট করে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট’-এর উদ্যোগে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ খুলনায় শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেষ্টিভ ডিজিজ রিসার্চ ও হাসপাতাল নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী অটিজম আন্দোলনে তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, সায়মা ওয়াজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই অটিজম শিশুদের লুকিয়ে রাখা বা তাকে নিয়ে অভিভাবকদের মুখ লুকানো ভাব অনেকাংশেই বন্ধ হয়েছে। বরং স্পেশাল চাইল্ড হিসেবে তাদের বিশেষ যত্নে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য দেশে বিদেশে সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ১৫টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাধ্যমে অটিজম ও অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্ট সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারাতেই বর্তমানে দেশে মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছরে উন্নীত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এটাই আমার একমাত্র কামনা- সর্বক্ষেত্রে নিজেদেরকে আমরা একটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করব এবং বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার কাঙ্ক্ষিত ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী মহান জাতি, কারো কাছে মাথা নত করে আমরা চলব না। হাত পেতে চলব না। মর্যাদা নিয়ে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলব।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম