Home / অপরাধ / নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় প্রধান আসামি নূর হোসেনসহ ২৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড
7+murder+n+gonj+mbd-f

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় প্রধান আসামি নূর হোসেনসহ ২৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড

মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ । ০৩ মাঘ ১৪২৩

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলায় প্রধান আসামি নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও বাকি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ৮ জনকে ১০ বছর ও ১ জনকে ৭ বছরের করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

আজ সোমবার সকাল ১০ টা ১০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন।

এ সময় আদালতে ২৩ জন আসামি উপস্থিত ছিলেন।

মোট ৩৫ জন আসামির মধ্যে মামলার শুরু থেকেই ১২ জন পলাতক রয়েছে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন অপহৃত হন। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ছয়টি লাশ ভেসে ওঠে এবং পরদিন আরেকটি লাশ পওয়া যায়।

7+murder+n+gonj+mbd-in-2

ঘটনার পরের দিন কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদি হয়ে নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।

পরে আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকে হত্যার অভিযোগে চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদি হয়ে একই থানায় আরেকটি মামলা করেন।

তিন বছর আগে নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ শীতলক্ষ‌্যায় ডুবিয়ে দেওয়ার ওই ঘটনায় পুরো বাংলাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই হত‌্যাকাণ্ডে এলিট বাহিনী র‌্যাবের কয়েকজনের জড়িত থাকার তথ‌্য বেরিয়ে এলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ‌্যমেরও শিরোনাম হয়। দেশের মিডিয়া অঙ্গনও বিশেষ গুরুত্বসহকারে এ সংবাদ প্রচার ও ফলোআপ করে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নূর হোসেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সময় র‌্যাব-১১ এর অধিনায়কের দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানাসহ ২৩ আসামি রায়ের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি ১২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েননি।

7+murder+n+gonj+mbd-in

বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করতে সময় নেন মাত্র কয়েক মিনিট। তবে আসামিদের সাজার অংশটিই কেবল তিনি পাঠ করেন।

এদিকে রায় ঘোষণার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলামের সমর্থক এবং আইনজীবী চন্দন সরকারের সমর্থকরা আদালতের বাইরে উল্লাসে ফেটে পড়েন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সন্তুষ্ট। কিন্তু আমরা চাই, এই রায় দ্রুত কার্যকর হোক। এবং হাই কোর্টেও যাতে এই রায় বহাল থাকে।

চন্দন সরকারের মেয়ে সুস্মিতা সরকারও রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মিডিয়াকে জানান, আসামিদের সাজা দ্রুত কার্যকর হোক- এটাই তাদের চাওয়া।

চন্দন সরকারের পক্ষে এ মামলা লড়েন আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এই রায়ে আমরা আনন্দিত। আমরা খুশি হয়েছি। তবে ৩৫ জন আসামির মধ‌্যে সবার মৃত‌্যুদণ্ড হলে আরও বেশি খুশি হতাম।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়…
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়।

একই সময়ে একই স্থানে আরেকটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার চালককেও অপহরণ করা হয়।

ঘটনার তিন দিন পর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকায় শীতলক্ষ্যা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাত জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকের পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

7+murder+n+gonj+mbd-1

নিহত ৭ জন…
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম।

লাশ উদ্ধারের পর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল দুটি মামলা করেন, যার তদন্ত চলে একসঙ্গে।

দুই মামলার তদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ মণ্ডল।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, এলাকায় আধিপত্য নিয়ে বিরোধ থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে হত্যার এই পরিকল্পনা করেন আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

অন‌্যদিকে নজরুলদের অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় ঘটনাচক্রে আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককেও হত‌্যা করা হয় বলে তার জামাতা বিজয় কুমার পালের ভাষ‌্য।

আসামিদের মধ‌্যে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ১৭ জন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনের পাঁচ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। ঘটনার ১৭ মাস পর মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, আসামিদের মধ‌্যে ২১ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্ত চলাকালে নূর হোসেন ভারতে থাকায় তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পায়নি পুলিশ।

গ্রেপ্তার র‌্যাব সদস‌্যরা আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, তাতে হত‌্যাকাণ্ডের ভয়ঙ্কর বিবরণ উঠে আসে।

তারা জানান, অপহরণের পর সাতজনকে চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করা হয়। পরে মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় শ্বাসরোধ করে। লাশগুলো শীতলক্ষ‌্যায় ফেলে দেওয়ার সময় ডুবে যাওয়া নিশ্চিত করতে বেঁধে দেওয়া হয় ইটের বস্তা। আর লাশ যাতে ফুলে না ওঠে সেজন‌্য চিরে ফেলা হয় লাশের পেট।

জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২০১৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মধ‌্য দিয়ে এ মামলার আসামিদের বিচার শুরু করেন।

৩৮টি কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৬৪ জনের সাক্ষ‌্য শোনে আদালত- যাদের মধ‌্যে ৬০ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেন।

দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ৩০ নভেম্বর বিচারক ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রায়ের জন‌্য দিন ধার্য করে দেন।

যেভাবে রায় ঘোষণা…
নারায়ণগঞ্জে বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার বহু প্রতীক্ষিত এ রায়কে ঘিরে আজ সকাল থেকেই জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শফিউদ্দিন জানান, আদালত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঁচ শতাধিক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। সাইনবোর্ড এলাকা থেকে আদালত চত্বর পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলা হয়।

আদালতে ঢোকার মুখে বসানো হয় আর্চওয়ে- সেখানে সবাইকে তল্লাশি করা হয়। আইনজীবী এবং বাদি ও আসামিপক্ষের স্বজনদের ছাড়া কাউকে আদালতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

গ্রেপ্তার ২৩ আসামির মধ‌্যে ১৮ জন ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে। সকাল ৯ টার দিকে তাদের প্রিজন ভ‌্যানে করে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসা হয়।

আর নূর হোসেন, তিন সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ আসামিকে তিনটি প্রিজন ভ‌্যানে করে কাশিমপুর কারাগার থেকে নারায়ণগঞ্জ আদালতে নিয়ে আসা হয় সকাল ৯ টা ৪০ মিনিটে।

ঘড়িতে ১০ টা বাজার ঠিক আগে আগে আসামিদের আদালত কক্ষে নিয়ে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এর পরপরই এজলাসে আসেন বিচারক, আদালত কক্ষে নামে পিন পতন নীরবতা।

সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হলেও বিচার চলে একসঙ্গে। বিচারক একটি মামলা হিসেবে বিবেচনা করেই রায় ঘোষণা করেন।

সূত্র : বাসস ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

12 7 2026 4

বন্যায় ৭ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ মানুষ, নিহত ৫১

রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | মাসস দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি …

Leave a Reply

Your email address will not be published.