‘‘কিডনি রোগে তুলনামূলকভাবে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি আক্রান্ত হয় এবং বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিডনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়া এবং অবহেলিত,’’…
মাস্টারি বিডি ডটকম ।
ঢাকা । ০৮ মার্চ ২০১৮ । ২৪ ফাল্গুন ১৪২৪
‘‘কিডনি রোগে তুলনামূলকভাবে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি আক্রান্ত হয় এবং বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিডনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়া এবং অবহেলিত,’’ সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এ মন্তব্য করেন।
“বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগ একটি ভয়বহ স্বাস্থ্য সমস্যা, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৬ লক্ষ নারী অকাল মৃত্যুবরণ করে কিডনি বিকল হয়ে। সারা বিশ্বে ১৪ শতাংশ নারী পক্ষান্তরে ১২ শতাংশ পুরুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত, অথচ চিকিৎসা গ্রহনের সুযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত, তারা পুরুষ শাষিত সমাজে বৈষম্যের শিকার” বক্তারা বলেন।
‘‘বিশ্ব কিডনি দিবস ২০১৮’’ উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিডনি বিষয়ক বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইট (ক্যাম্পস) ৩ মার্চ রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন-এর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, কিডনি ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশন-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. রফিকুল আলম, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইউরোলজি-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডাঃ এম এ সালাম, প্রথম আলো-এর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, চলচ্চিত্র অভিনেতা ও মডেল ফেরদৌস আহমেদ প্রমুখ।
ক্যাম্পস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল-এর কিডনি বিভাগের চীফ কনসালটেন্ট, অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ এ গোলটেবিল বৈঠক সঞ্চালন করেন। তিনি কিডনি রোগ-এর প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং কিডনি রোগ চিকিৎসায় মহিলাদের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরিকরনের উপায় নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বিএমএ-এর সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শীর্ষ পদগুলোতে এখন নারীর উপস্থিতি অনেক বেশি। আমি দেখেছি এমবিবিএস এ ভর্তির ক্ষেত্রেও এখন মেয়ে প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাই বোঝা যাচ্ছে যে, পিছিয়ে পড়া নারীর অপবাদ ঘুচাতে এখন আমরা অগ্রসর হচ্ছি।
তিনি বলেন, আমাদের মেধা, বুদ্ধি ও তারুণ্য আছে- যা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারব। তবে নারীর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে সর্বমহল থেকে সাহায্য করতে হবে। নারীর যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, নিবিড় কর্মক্ষমতা রয়েছে- তা কাজে লাগাতে হবে।
ডা. জালাল বলেন, তবে একথা স্বীকার করতে হবে যে- দেশের নারীর ভূমিকা, ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবদান রাখতে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহী এবং কর্মতৎপর ।
কিডনি ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, দেশে ব্যাপক সংখ্যক কিডনি রোগীর তুলনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার খুবই কম, মাত্র ৯৬টি এবং ১৮০০০ রোগী এসব সেন্টারে সপ্তাহে ২ বার করে ডায়ালাইসিস পায়। বেসরকারী সেন্টারগুলোতে ৩৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত ডায়ালাইসিস মূল্য রাখা হয়- যা নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের জন্য বহন করা অসম্ভব।

তিনি বলেন, সাউথ এশিয়াতে মোট কিডনি রোগীর তুলনায় মাত্র ১৫ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিস-এর সুযোগ পায় বাকি বিশাল সংখ্যক রোগী অর্থাভাবে ডায়ালাইসিস নিতে পারে না। তাই বাংলাদেশে ডায়ালাইসিস খরচ কমাতে সরকারী বেসরকারীভাবে বাস্তবিক উদ্যোগ নিতে হবে।
নারীদের কিডনি চিকিৎসায় বৈষম্য দূরীকরনে স্বয়ং সরকারকে বিশেষ ভূমিকা রাখার আহবান জানিয়ে ডা. হারুন অর রশি বলেন, এ বিষয়ে সমাজে মানুষের একটি মাইন্ড-সেট আছে- যা পরিবর্তন হওয়া খুবই জরুরী।
চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস বলেন, মানুষ এবং মানবতার জন্য বোধের পরিবর্তন সর্বাগ্রে দরকার। সমাজে নারীর বিষয়ে সুস্থ চিন্তাধারার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি সৃষ্টিশীল চেতনা এবং প্রবণতা থাকে তাহলে বড় সমস্যারও ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
তিনি কিডনি বিষয়ে এবং নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করতে বিষয়ভিত্তিক নাটক, এমনকি সিনেমা তৈরি করে হলেও বার্তাগুলো পৌঁছাতে হবে।
ফেরদৌস গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্যাম্পস-এর ব্যাপক ভূমিকা এবং কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে সমাজের বিত্তবান লোকদের এ ধরনের কাজে পৃষ্ঠপোষণের আহবান জানান।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, নারীরা এদেশে সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রায় সবক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া কিংবা অবহেলার শিকার, সে ক্ষেত্রে অনুৎপাদনশীলতা, গুরুত্বহীনতা, জড়তা, লোকলজ্জা, সহজাত লুকিয়ে রাখার প্রবণতা এসব কারণে বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের বা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী এখনো সীমাহীন বৈষম্যের শিকার। এ চিত্র বাংলাদেশে যেমন প্রকট, বহির্বিশ্বে বা বিশ্বজুড়ে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিভিন্ন দেশেও চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর প্রতি অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।

এ বিষয়টি মাথায় রেখে বিশ্ব কিডনি দিবস উদযাপন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক “বিশ্ব কিডনি দিবস ২০১৮”-এর প্রতিপাদ্য হিসেবে “কিডনি এ্ন্ড উইমেন হেলথ : ইনকুড, ভ্যালু, এমপাওয়ার” নির্ধারণ করা হয়েছে। কিডনির সাথে নারীর স্বাস্থ্য নিবিড়ভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্যের জন্য নারীদের অংশগ্রহণ, মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়ন জরুরী। সমগ্র বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নির্ধারণ করা হলেও দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অতিমাত্রায় প্রযোজ্য, সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। যে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী সে দেশের নারীদের অবহেলা করে কিংবা গুরুত্বহীন রেখে আর্থসামাজিক উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়।
ডা. এম এ সামাদ বলেন, পৃথিবী ব্যাপী কিডনি রোগের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত ব্যাপক। বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি বিকলের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় বহুল বিধায় এদেশের শতকরা ১০ জন রোগী এ চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারে না। অর্থাভাবে চিকিৎসাহীন থেকে অকালে প্রাণ হারান সিংহভাগ রোগী। পক্ষান্তরে, একটু সচেতন হলে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগের উপস্থিতি ও এর কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা।
এ গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, চিকিৎসা করে নয় বরং প্রতিরোধ করেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব প্রশমন করতে হবে। আর এ জন্য সচেতনতাই একমাত্র উপায়।
আলোচকবৃন্দের মধ্যে আরো ছিলেন- অবাস্ট্যাট্রিক্যাল এন্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মেজর (অব.) ডা. লায়লা আঞ্জুমান বানু, বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী মিতা হক, কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, স্বর্ণ কিশোরী নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান ও সিইও ফারজানা ব্রাউনিয়া, জাতীয় প্রেসক্লাব-এর জেনারেল সেক্রেটারী ফরিদা ইয়াসমিন, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট টিম-এর সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, অভিনেতা ও মডেল নিরব হোসেন প্রমুখ।
এ ছাড়াও গোল টেবিল বৈঠকে দেশের সরকারী পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, ক্রীড়াবিদসহ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম