Home / এই দিন / আমার প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ : শেখ নজরুল
nirmolendu+goon+mbd

আমার প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ : শেখ নজরুল

বিষন্ন বর্ষায় জন্মে নির্মলেন্দু গুণের প্রিয় ঋতু বসন্ত। সংগ্রামই সত্য, সংগ্রামই সুন্দর- এই সত্যে বিশ্বাসী নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতার কবি। স্বপ্ন বিনির্মাণের দক্ষ কারিগর তিনি। ঈর্ষণীয় কবিতাসমৃদ্ধ জীবন তার। নাগরিক সমস্যার বাস্তব পেক্ষাপট অত্যন্ত সফলভাবে তিনি তার কবিতায় তুলে ধরেছেন। সেখান থেকে অনবরত উদগীরিত হয়েছে টচকা বমির কালসেটে ফেনাইল। এর প্রতীকী রূপ আমরা তার কবিতায় সহজেই পেয়ে যাই। নির্মলেন্দু গুণ; কবিতার জন্যই জন্ম যার। নিজের হাতে আপন হৃৎপিণ্ড খামচে কবিতার উৎসমুখে সযত্নে রেখেছেন, সঙ্গোপনে নয়, প্রকাশ্যে। হৃৎপিণ্ড খোয়া গেছে ঠিকই কিন্তু কবিতা তাকে বিমুখ করেনি। তিনি স্বয়ম্ভু হয়েই বিবেকের উপলব্ধিতে মানুষের অধিকার প্রাপ্তির বিষয়টি তার কবিতা সফলভাবে তুলে ধরেছেন। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে লিখেছিলেন- ‘আমি আজ কারও রক্ত চাইতে আসিনি’। নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থের এবং মঞ্চে পঠিত প্রতিটি কবিতা সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং গণঅভ্যুত্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তার আলোচিত কাব্যগ্রন্থ- ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘না প্রেমিক না বিদ্রোহী’, ‘আগে চাই সমাজতন্ত্র’,
‘দূর হ দুঃশাসন’, ‘মুঠোফোনের কাব্য’, ‘কামকানন’ উল্লেখযোগ্য। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ তার কাব্যজীবন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবান্বিত হয়। খণ্ড খণ্ড অতীতকে তিনি অখণ্ডরূপে সমসাময়িক রূপে উপস্থাপন করেছেন তার প্রতিটি কবিতায়। যে কবিতা কখনও হয়ে উঠেছে আমাদের যাপিত জীবনের হাহাকার কখনো বা বিদ্রোহের বীর রসসিক্ত শাণিত উপলব্ধি। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা সাধারণ মানুষের সংগ্রামের দিগচিহ্নিত মাইক্রোস্কোপ। প্রেম আর দ্রোহের মিলিত অনুভব- যা আমাদের হৃদয় সরবরে লাল পদ্ম হয়ে ফুটে ওঠে বৃষ্টিহীন দাবদাহেও। সংগ্রামের কবিতা আর নির্মলেন্দু গুণ যেন এক এবং অভিন্ন সত্তা। আর কোনো কবির পক্ষে লেখা সম্ভব ছিল না- ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে/ লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে-/ কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?/ … / শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল/ হৃদয়ে লাগিল দোলা,/ ……………………/ কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর/ অমর কবিতাখানি : এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম;/ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’(স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো)।

nirmolendu+goon+mbd-3

নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতায় সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম কারণ তিনি কবিতাকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পান না। মৃত্যুভয় যার পৌনঃপুনিক অংশও নয়। অনেক জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে সেই সাহসের আকাল লক্ষণীয়। নির্মলেন্দু গুণ গণমানুষের কবি। শ্রমিক সমার্থক, কৃষকের স্বপ্নময় চোখের সমান বয়সি, তাই তিনি অবলীলায় তার কবিতায় কৃষকের কথা বলেছেন। যুদ্ধ আর মানবতার অবয়বে নির্মলেন্দু গুণের কণ্ঠ এবং কলম সর্বোচ্চ উচ্চকিত হয়েছে। তার মানবিক অনুভূতি স্বদেশ অতিক্রম করে বিশ্বে ব্যাপৃত হয়েছে। মুক্ত প্যালেস্টাইনের জন্য তার অন্তরাত্মা রক্তাক্ত হয়েছে। তিনি তার কবিতার অন্তর্গত শক্তিকে তাদের চূড়ান্ত বিজয়েই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। একইভাবে কবি ভিয়েতনামের সেই নাপাম বোমা পতনের ভয়াবহ এবং নৃশংস দৃশ্য ভুলতে পারেননি। তবে তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের ধিক্কার জানিয়েছেন আশাবাদী মননে। ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবই তার জীবন-উপলব্ধ অধ্যায়। তিনি দুঃশাসনের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন নিজস্ব চেতনায়। তবু বারবার দুঃশাসনের কবলে পড়েছে স্বাধীন ভূখণ্ড। তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন-‘দূর হ দুঃশাসন’। প্রেমিক-কবি নির্মলেন্দু গুণ। অসংখ্য প্রেমের কবিতা লিখেছেন তিনি। কিন্তু প্রেমের সঙ্গে কষ্টের অনুষঙ্গ মিশিয়ে পাঠককে এক ভয়ংকর রহস্যময়তার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আমরা তার নীরাকে ভুলতে পারি না। যখন স্বয়ম্ভু সুন্দর কবিতায় আমরা তার অন্যরকম এক প্রেমকে আবিষ্কার করি। বেঞ্জামিন মোলয়াসির প্রতি নির্মলেন্দু গুণের ভালোবাসা বর্ণনাতীত। দৃঢ়ভাবে তিনি বিশ্বাস করেন, তার মৃত্যু কবিতাকেই চিরকালীন সমৃদ্ধি আর তাকে অমরত্ব দিয়েছে। তিনি তাকে সারা বিশ্বের কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা তার সংগ্রাম দীর্ঘ জীবনেরই অংশ। আর কবিতার বিষয়বস্তু আত্মা থেকে উৎসারিত দীর্ঘ বোধের সরব উচ্চারণ। তিনি মহাশূন্যে অবস্থান করেও পৃথিবীকে স্পষ্ট দেখতে পান। অনবরত রাজপথে হেঁটে কালো কালো বিটুমিনের গলিত শরীরের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন অথচ ঘরে ফিরেই ঘরবিমুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। যে ঘরে আলো নেই, বসন্তের হাওয়া নেই; সেই ঘরের জন্য ভাড়া দিয়ে ফতুর হবার বিষয়টি তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি।

nirmolendu+goon+mbd-2

তিনি লিখেছেন- ‘আপনারা কি আমাদের সেইসব ঘরে/ ফিরে যেতে বলবেন,/ যেখানে ছিন্ন মলিন শাড়ি পরে/ স্রেফ ভর্ৎসনা করবার জন্য অপেক্ষা করে/ আমাদের এক সময়ের প্রিয় বধূরা?’/ (আমরা রাজপথে কেন) নির্মলেন্দু গুণের মন বিচিত্রাশ্রয়ী হলেও তিনি প্রকৃত থিতু হয়েছেন কবিতায়। পরাবাস্তবতার বিষয়টি তার কবিতায় এসেছে অদ্ভুতভাবে। তার প্রিয় পাঠকদের অটোগ্রাফ দেবার সঙ্গে তিনি টাকার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষর করার বিষয়টি মেলাতেচেয়েছেন। কখনো কখনো মনে প্রশ্ন জাগে কবি কি স্ববিরোধী? যদি সত্য হয় তা কি মানুষের প্রয়োজনে? এটিই বিশ্বাস করতে ভালো লাগে। স্ববিরোধিতার মধ্যে নিজের আত্মসমর্পণে কবি এক সময় হয়ে ওঠেন সর্বজনীন। নির্মলেন্দু গুণ সেই সর্বজনীন কবি।

মাস্টারি বিডি | সাহিত্যবিভাগ | ঢাকা | ২১ জুন ২০১৯ | ০৭ আষাঢ় ১৪২৬

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

12 4 2026 66

৯২ তে থামলেন আশা ভোসলে

ঢাকা, রবিবার ১২ এপ্রিল ২০২৬ মাসস প্রয়াত বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলে। বয়স হয়েছিল ৯২। শনিবার সন্ধ্যাবেলা হঠাৎই …

Leave a Reply

Your email address will not be published.