মাস্টারি বিডি । শিমুল আহসান
জাতীয় । ঢাকা । ১৮ মার্চ ২০১৯ । ০৪ চৈত্র ১৪২৫
শিশুদের জন্য এক উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশকে তিনি এমন সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চান যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অক্ষরজ্ঞানহীনতা থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধশালী করে এমনভাবে গড়ে তুলবো যেখানে আগামীর শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত থাকবে এবং তারা সুন্দর জীবনের অধিকারী হবে, যে স্বপ্ন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ অপরাহ্নে জাতির পিতার ৯৯তম জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে এখানে তাঁর সমাধিসৌধ প্রাঙ্গণে আয়োজিত শিশু-কিশোর সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন।
জাতির পিতা যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তেমন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সবাইকে হারিয়ে ৬ বছর বিদেশে থাকতে বাধ্য হওয়ার পর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেশে ফিরেই তিনি এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন।

লাখো জনতার মাঝে হারানো স্বজন খুঁজে ফেরা বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আমি দেশবাসী বিশেষ করে টুঙ্গীপাড়া ও কোটালিপাড়ার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই, তাঁদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই এই কারণে যে, এই এলাকাটা (তাঁর নির্বাচনী আসন) আমার দেখার কোন প্রয়োজনই হয় না। এখানকার সব দায়িত্বই জনগণ নিয়ে নিয়েছে। আমি তিন ভাই হারিয়েছি, কিন্তু পেয়েছি লাখো ভাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ যদি ভাল থাকে, উন্নত জীবন পায়- সেটাই তাঁদের সবথেকে বড় পাওয়া। আর এজন্যই দেশের জন্য তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই বাংলাদেশকে গড়ে তুলবো উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। যেন আজকের শিশু আগামী দিনে সুন্দর একটা ভবিষ্যত ও সুন্দর জীবন পায়।
‘ক্ষুধা, দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশে আজকের শিশুদের ভবিষ্যত সুন্দর করে গড়ে তুলতে চান’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা শিশুদেরবে সবসময় ভালবাসতেন। তাই তাঁর জন্মদিনটি আমরা শিশু দিবস হিসেবেই সবসময় উদযাপন করি।’
প্রধানমন্ত্রী কোটালিপাড়ার সন্তান এবং ক্ষণজন্মা কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে বলেন- ‘চলে যাব তবু যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ।/ প্রাণপনে এ পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল।/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান সেলিনা হোসেন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গোপালগঞ্জ মালেকা একাডেমীর পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী লামিয়া সিকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র আরাফাত হোসেন স্বাগত বক্তৃতা করেন।

শেখ হাসিনাকে অনুষ্ঠানে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোখলেসুর রহমান গোপালগঞ্জ জেলা ব্রান্ডিং-এর লোগো’র একটি রেপ্লিকা উপহার দেন এবং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা চিঠির উপর ভিত্তি করে রচিত ‘বঙ্গবন্ধুকে লেখা চিঠি’র মোড়ক উন্মোচন করেন।
অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে লেখা সেরা চিঠিটি ১০ম শ্রেণীর ছাত্রী সুরাইয়া শারমিন পাঠ করে শোনান।
পরে ‘আমার কথা শোন’ শীর্ষক একটি ভিডিও চিত্রও প্রদর্শিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী একটি বই মেলার উদ্বোধন করেন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের আঁকা ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গীপাড়া এবং কোটালীপাড়ার দু’জন দরিদ্র মহিলা কণা বেগম এবং তানজিলার নিকট সেলাই মেশিন হস্তান্তর করেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষ্যে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন আয়োজিত সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝেও পুরস্কার বিতরণ করেন।
শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সত্য সব সময়ই আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সেই সত্য আজকে উদ্ভাসিত হয়েছে বলেই আজ দেশের প্রকৃত ইতিহাস দেশের মানুষ যেমন জানতে পারছে তেমনি ৭ই মার্চ জাতির পিতার ঐতিহাসিক যে ভাষণ, ’৭৫-এর পর সারাদেশে নিষিদ্ধ ছিল, যে ভাষণ বাজাতে গিয়ে সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মীকেই একদা জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছিল, আজ তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের এক অমূল্য দলিল হিসেবে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক প্রামান্য দলিলে স্থান করে নিয়েছে। যাতে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে।’
বিশ্বে আড়াই হাজার বছরে মানুষকে উজ্জীবিত করার যত ভাষণ রয়েছে তাঁর মধ্যে ৭ই মার্চের ভাষণ শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতির পিতা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করে দিয়ে যান।’
‘তিনি মেয়েদের শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যন্ত অবৈতনিক করে দেন এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় ১৯৭৪ সালেই এই বাংলাদেশে শিশু অধিকার আইন প্রণয়ন করেন। যা তখন জাতিসংঘ পর্যন্ত করেনি, তাঁরা করেছে এই ১৯৮৯ সালে’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতির পিতার করে যাওয়া শিশু অধিকার আইনের আলোকেই তাঁর সরকার ২০১১ সালে জাতীয় শিশু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা, খেলাধূলা, শরীর চর্চা, সাংস্কৃতিক চর্চা- সর্বদিকে যেন তাঁদের পারদর্শিতা গড়ে ওঠে সেদিকে তাঁর সরকার দৃষ্টি দিয়েছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলে শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তি দক্ষতা সম্পন্ন করে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, তাঁর সরকার দেশের প্রতি জেলায় একটি করে মোট ৬৫টি ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাবসহ ২ হাজার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা পাঠ্য পুস্তক প্রদান এবং তাঁর সরকারের শিক্ষা সম্প্রসারণে বৃত্তি এবং উপবৃত্তি প্রদানের তথ্য তুলে ধরেন।
মাসের শুরুতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মায়েদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বৃত্তির টাকা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে এবং ঝরেপড়া বন্ধে স্কুল পর্যায়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ এবং অভিভাবকদের সহযোগিতায় ‘মিড যে মিল’ বা ‘টিফিন’ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম