
মাস্টারি বিডি । শান্তা ইসলাম
ফিচার । ঢাকা । ১৮ মার্চ ২০১৯ । ০৪ চৈত্র ১৪২৫
কালজয়ী কবি জীবনানন্দের কবিতায় আকন্দ ফুলের কথা এসেছে এভাবে,
“এখানে আকাশ নীল–—
আকন্দ ফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ”
গৃহস্থ বাড়িতে নয়, পল্লীতে আঘাটা নামে পরিচিত স্থানেই দেখা মিলে আকন্দের। বনবাদাড়ের কিনারে নয়তো রাস্তার পাশে অনাদরে এখানে ওখানে বেড়ে ওঠা আকন্দের ঝোঁপ। আদরণীয় ফুল নয়, বুনো ঝোঁপ হিসাবেই পরিগণিত আকন্দ। উদ্ভিদের শ্রেণী বিচারে গুল্ম শ্রেণীতে পড়ে বড় জোর দশ বারো ফুট উচ্চতায় ঝোঁপ বেঁধে বেড়ে উঠা আকন্দ।

সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ফুল হিসাবে কদর না থাকলেও আদিকাল হতেই আকন্দের ব্যাপক সমাদর ভেষজ চিকিৎসায়।
প্রতিটি ফুলে পাঁচটি পাঁপড়ি এবং তার মাঝে সুন্দর একটি ‘রাজমুকুট’। তাই ইংরেজিতে একে বলে ক্রাউন ফ্লাওয়ার। বৈজ্ঞানিক নাম : Calotropis gigantea.
সারা বছরই ফোটে আকন্দ ফুল।
আকন্দের একটি বৈশিষ্ট্য আছে পল্লীতে বেড়ে উঠা সবার শৈশবের স্মৃতিতে। আর ‘দুধকষ’। পাতা ছিঁড়লে, ডাল ভাঙলে বা ফুলের বোঁটা ছিড়লে টপ টপ করে বেয়ে পড়ে সাদা রঙের কষ। দুধ বরন রঙ বলেই একে বলে দুধ কষ। ছাগলের দুধ ঘন বলে একে তুলনা করা হয় ‘আকন্দের কষের মতো ঘন।’

গোলাপের পরিবর্তে প্রিয়জনকে আকন্দের গোছা উপহার কি ভাবা যায়? থাইল্যান্ডে কিন্তু আকন্দ ফুল হচ্ছে ভালোবাসার প্রতীক। তাই ওদেশে আকন্দ ফুলের ব্যবহারের প্রচলন আছে বিয়ের অনুষ্ঠানে।
শাস্ত্রে, পুরাণে, কাব্যে চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে আকন্দ,
“আকন্দ বিল্বপত্র আর গঙ্গাজল
এই পেয়ে তুষ্ট হোন ভোলা মহেশ্বর।”
তবে শুধু সৌন্দর্য্যের বিচারেই নয়, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়ও অপরাপর লতা গুল্ম বৃক্ষরাজির মতোই অশেষ গুরুত্ব বহন করে আকন্দ। এই ছবিতেই আছে, প্রতিটি আকন্দে নিবিষ্টমনে মধুপাণরত পিপীলিকা।
তাই, পিপীলিকা ছাড়াও ভীমরুল, মৌমাছি, ভোমরার বিচরণক্ষেত্র আকন্দের ঝোঁপ। তাই আকন্দের প্রাচুর্যের সাথে জড়িত এদের খাদ্যের যোগান তথা বংশবৃদ্ধি।

যতোই অগ্রাহ্য করা হোক আকন্দকে, আকন্দ ছাড়া কিন্তু অসম্পূর্ণ পল্লীবাংলার রূপ প্রকৃতি। তাই জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার কাব্যে ঘুরে ফিরে এসেছে আকন্দ ফুল।
“আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মঠ
আপনার মনে ভাঙিতেছে ধীরে ধীরে –”
আকন্দের সৌন্দর্যের প্রতি একেবারেই উদাসীন পথচারী। কিন্তু কবিগুরুর চিত্ত ঠিকই মুগ্ধ হয়েছে আকন্দের রূপে। তাই আকন্দ প্রকাশ পেয়েছে এভাবে তাঁর কবিতায়,
“আছিলে কাব্যের দুয়োরাণী
পথপ্রান্তে গোপন আঁধারে।
সঙ্গী যারা ছিল ঘিরে তারা সবে নামগোত্রহীন,
কাড়িতে জানে না তারা পথিকের আঁখি উদাসীন।
ভরিল আমার চিত্ত বিষ্ময়ের গভীর আনন্দ,
চিনিলাম তোমারে আকন্দ।”
তবে আশার কথা হচ্ছে, আজকাল নানান প্রজাতির বুনো ফুল স্থান পাচ্ছে সৌখিন লোকদের আঙিনায় অথবা টবে। তাই, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আকন্দকেও দেখা যাবে নগরীবাসী সৌখিন পুষ্পপ্রেমীদের আঙিনায়।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম