ঢাকা, শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসস
চৌরঙ্গী, ঘরের মধ্যে ঘর এবং জন অরণ্যের মতো উপন্যাস উপহার দিয়ে দুই বাংলার সহিত্যকে যিনি সমৃদ্ধ করেছেন, সেই মণিশংকর মুখোপাধ্যায় যাকে পাঠকমহল শংকর নামেই চেনেন চিরবিদায় নিলেন।
পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের পাঠকের কাছে কেবল ‘শংকর’ নামেই পরিচিত এ সাহিত্যিকের বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে, নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন পনেরো আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এ সাহিত্যিক। এক পর্যায়ে তার খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুক্রবার বেলা পৌনে ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
বেশ কিছু দিন ধরে বার্ধক্যের নানা সমস্যায় ভুগছিলেন সাহিত্যিক। গেল গত ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল শংকরের। সে সময় অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি।
হাসপাতালে প্রয়াত সাহিত্যিকের চিকিৎসক সুদীপ্ত মিত্র বলেন, “সপ্তাহ দুয়েক আগে ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ৪ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। এত দিন সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। শুক্রবার দুপুরে সেখানেই জীবনাবসান ঘটে সাহিত্যিকের।”
শংকরের প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, “বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জন অরণ্য’—তার কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা।
“বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।”
শংকরের জন্ম যশোরে
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্ম শংকরের। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে আসেন। বসবাস করতে থাকেন হাওড়ায়। সেখানেই শংকরের বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া। তার সাহিত্যচর্চার শুরুও সেখান থেকেই।
কৈশরেই পিতৃহীন শংকরকে সংসারের জোয়াল টানতে কখনও কেরানির কাজ করেছেন, করেছেন হকারিও। আর সেই সূত্রেই কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নায়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের অধীনে চাকরি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লেখেন ‘কত অজানারে’।
১৯৫৫ সালে শংকরের প্রথম এই উপন্যাস প্রকাশের পর
আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলা সাহিত্য পেল এক নতুন সাহিত্যিককে। তবে তাকে প্রকৃত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল ‘চৌরঙ্গী’। শাজাহান হোটেলের সুখ-দুঃখের সেই আখ্যান শংকরকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।
১৯৬৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্র শংকরের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই সিনেমায় মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে একে একে তার কাছ থেকে বাঙালি পাঠক পেয়েছে ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’সহ আরও বহু গল্প উপন্যাস।
শংকরের কয়েকটি উপন্যাস নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে। পিনাকিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় চৌরঙ্গী’ ছাড়াও কিংবদন্তি লেখক নির্মাতা আঁকিয়ে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’।
এছাড়া পরিচালক ঋত্বিক ঘটক শংকরের উপন্যাস ‘কত অজানারে’ নিয়ে সিনেমা করার কথা ভাবলেও সে কাজ শেষ হয়নি।
কিশোর সাহিত্যেও তার ছাপ ছিল। শারদীয়া আনন্দমেলাতে ‘পিকলুর কলকাতাভ্রমণ’ নামের অণু-উপন্যাসটি দিয়ে তিনি কিশোর সাহিত্য শুরু করেন। পরে আবার এই লেখাটির নাম পাল্টে হয় ‘খারাপ লোকের খপ্পরে’। এর সঙ্গে আরও দু’টি লেখা নিয়ে ‘এক ব্যাগ শংকর’ নামে প্রকাশিত হয়।
১৯৯৩ সালে ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য শংকর পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার, ২০২১ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। ২০২২-এ এবিপি আনন্দ তাকে ‘সেরার সেরা বাঙালি’ সম্মান প্রদান করে।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম