মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ০২ মার্চ ২০১৭ । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৩
ভারতীয় উপমহাদেশে পথনাটকের প্রাণপুরুষ ছিলেন সফদর হাশমি। পথে-প্রান্তরে ঘুরে নাটক করাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। ১৯৮৯ সালে দিল্লির এক বস্তিতে পথনাটকে অভিনয়ের সময় হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় পথনাটকের এই পথিকৃৎ মানুষটিকে। তাঁর স্ত্রী মলয়শ্রী হাশমিও খ্যাতিমান নির্দেশক-সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে পথনাটকের মধ্য দিয়ে সফদর হাশমির পথ অনুসরণ করে চলেছেন তিনি। খ্যাতিমান এই নাট্যনির্দেশকের হাত দিয়ে বুধবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী পথনাটক উৎসব।
‘সাম্প্রদায়িকতামুক্ত শিক্ষা চাই, মুক্ত মানবিক দেশ চাই’ স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া এ পথনাটক উৎসব কাল বিকেলে রঙিন বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করেন মলয়শ্রী হাশমি। আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত চলমান এই উৎসবে দেশের ৩২টি দল তাদের পথনাটক প্রদর্শন করবে।
মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ সব মুক্তিসংগ্রামে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীদের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত। এরপর ছিল আলোচনা পর্ব। তাতে উদ্বোধক মলয়শ্রী হাশমি ছাড়াও বক্তব্য দেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ ও ঝুনা চৌধুরী। পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরার সভাপতিত্বে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পরিষদের সহসভাপতি মিজানুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক আহাম্মেদ গিয়াস। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন উৎসবের আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ বারী। এ ছাড়া হুমায়ুন আজাদের ‘বই’ কবিতাটি পাঠ করেন আহকামউল্লাহ।
উৎসবের উদ্বোধন করে মলয়শ্রী হাশমি চমৎকার বাংলায় বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে এখন দক্ষিণপন্থীদের উত্থান চলছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান নিতে হবে। নাটকের মাধ্যমে শৈল্পিকভাবে প্রতিবাদ করতে হবে।’ স্বামী সফদর হাশমির স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘তিনি নাটকের মাধ্যমে সমাজের সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। আমরা তাঁর দেখানো পথ ধরেই এগিয়ে চলেছি। ’
মলয়শ্রী হাশমি তাঁর সংগঠন জননাট্য মঞ্চের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নাট্যামোদীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘আমার মাতৃভাষা বাংলা। আমার মা বাঙালি। তবে আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ছিল হিন্দি। ভারত ও বাংলাদেশ একই ইতিহাসের অংশীদার। কাজেই আমাদের প্রতিবাদের ভাষা কোনো কোনো সময় ভিন্ন হলেও বিষয়বস্তু একই। ইতিহাসের পাতায় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যাঁদের ভূমিকা ছিল শীর্ষে, তাঁদের বেশির ভাগই জন্ম নিয়েছে এই দেশে, বাংলাদেশে। ’
রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘পথনাটকের ভাষা প্রতিবাদের। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমরা পথনাটকের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলাম। বর্তমান সময়ে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সরকার যে খেলা খেলছে তার বিরুদ্ধে পথনাটকের মধ্য দিয়ে লড়াই করতে হবে।’
নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকে একটি ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার বিভাজন রেখা এঁকেছে। এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো হবে না। ’
আয়োজকরা জানান, ১৯৯২ সালে পথনাটক পরিষদ গঠিত হওয়ার পর নিয়মিত পথনাটক মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। মহান ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ২০০২ সাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে স্বাধীনতার মাসের প্রথম সপ্তাহে নিয়মিতভাবে পথনাটকের উৎসব করা হচ্ছে। এতে পরিষদভুক্ত সারা দেশের নাট্যদলগুলো তাদের সমসাময়িক পথনাটক মঞ্চায়ন করে থাকে। নিয়মিত পথনাটক চর্চার রজত জয়ন্তী উপলক্ষে এবারের উৎসবে দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ আঙ্গিকের পরিবেশনাও থাকছে। প্রথম দিন (গতকাল) ছিল সঙযাত্রা ও ব্রতচারী নৃত্য। আজ বৃহস্পতিবার থাকছে মণিপুরি শাস্ত্রীয় নৃত্য। তৃতীয় দিন আগামীকাল শুক্রবার মঞ্চস্থ হবে রামায়ণ পালা।
উদ্বোধন পর্ব শেষে ব্রতচারী নৃত্য পরিবেশন করেন বাংলার ব্রতচারী সংঘের শিল্পীরা। এরপর মান্নান হীরার রচনা ও নির্দেশনায় আরণ্যক নাট্যদল মঞ্চায়ন করে ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’। এরপর শহিদুল হাসান শামিমের রচনা ও তানভির আহাম্মেদ চৌধুরীর নির্দেশনায় গাজীপুরের মুক্তমঞ্চ নাট্যদল মঞ্চায়ন করে ‘চোর সমগ্র’ (মুখ নাটক)।
আজ উৎসবের দ্বিতীয় দিনে পাঁচটি পথনাটক মঞ্চস্থ হবে। এগুলো হলো—নরসিংদীর বাংলা নাট্যমের ‘বৈশাখী পাগল’, লোকনাট্যদলের (টিএসসি) ‘গুটিবাজ’, বর্ণালী থিয়েটারের ‘প্রতীকী চাতক’, উেসর ‘বর্ণমালার মিছিল’ ও প্রাচ্যনাটের ‘মহাবিদ্যা’। বিশেষ পরিবেশনায় ওয়ার্দা রিহাবের পরিচালনায় থাকবে ধৃতি নর্তনালয়ের মণিপুরি নৃত্য।
সব শ্রেণির দর্শক-শ্রোতার জন্য উন্মুক্ত এই উৎসবে প্রতিদিন থাকছে ছয়টি করে নাটক। শুরু হবে বিকেল ৫ টায়।
সূত্র : বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম