মাস্টারি বিডি ডটকম । কামাল বারি
ঢাকা । ২৭ নভেম্বর ২০১৭ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
বিশিষ্ট নাট্যকার, শিক্ষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, সাহিত্য সমালোচক শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ৯৩তম জন্মদিন আজ। ১৯২৫ সালের এই দিনে (২৭ নভেম্বর) তিনি ঢাকার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানাধীন গোপাইরবাগ গ্রামে। তিনি ছিলেন ইংরেজ আমলের একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরীর চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। কবীর চৌধুরী তাঁর অগ্রজ, ফেরদৌসী মজুমদার তাঁর অনুজা। ১৯৪৯ সালে লিলি চৌধুরীর সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মুনীর চৌধুরী ও লিলি চৌধুরী দম্পতির তিন সন্তান- আহমেদ মুনীর চৌধুরী, আশফাক মুনীর চৌধুরী (মিশুক মুনীর), ও আসিফ মুনীর চৌধুরী।
ছাত্রাবস্থাতেই মুনীর চৌধুরীর বক্তৃতানৈপুণ্যের সুখ্যাতি ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের প্রথম বছরেই হলের সেরা বক্তা হিসেবে প্রোভোস্ট্স কাপ জিতে নেন তিনি। ছাত্রজীবনেই এক অঙ্কের নাটক ‘রাজার জন্মদিনে’ লিখেছিলেন, যা ছাত্র সংসদ মঞ্চস্থ করেছিল।
রাজনীতিতে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ততার কারণে মুনীর চৌধুরীকে সলিমুল্লাহ হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই কারণে পিতার আর্থিক সাহায্য থেকেও তিনি বঞ্চিত হন। এসময় তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের জন্য নাটক লিখে আয় করতেন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম যে ছাত্রসভা হয়, তাতে মুনীর চৌধুরী বক্তৃতা করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তিনি বন্দী হন। বন্দী অবস্থায় তিনি তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘কবর’ রচনা করেন। এ নাটকটি তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে খ্যাত এবং এর প্রথম মঞ্চায়ন হয় জেলখানার ভেতরে, যাতে বিভিন্ন চরিত্রে কারাবন্দীরাই অভিনয় করেছিলেন।
মুনীর চৌধুরীর ছাত্রজীবন ছিল উজ্জ্বল। ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (বর্তমান ঢাকা কলেজ) থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন এবং ১৯৪৩ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স করেন ১৯৪৬ সালে এবং মাস্টার্স পাশ করেন ১৯৪৭ সালে- উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় শ্রেণীতে। তিনি ছিলেন সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র। মুনীর চৌধুরী ১৯৫৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে আরও একটি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হন। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত একটি ভাষাতাত্ত্বিক সম্মেলনে যোগ দেন।
বাংলা টাইপরাইটিংয়ের কি-বোর্ড মুনীর অপটিমা তিনিই উদ্ভাবন করেন।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের যে কোন ধরনের সংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ১৯৬৬ সালে রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান প্রচারে পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলা বর্ণমালাকে রোমান বর্ণমালা দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে তিনি এর জোর প্রতিবাদ করেন। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে সে আন্দোলনের সমর্থনে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করেন।
তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে- মৌলিক নাটক- ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’, ‘চিঠি’, ‘কবর’, ‘দণ্ডকারণ্য’ ও ‘পলাশী ব্যারাক’। অনুবাদ নাটক- ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’, ‘রূপার কৌটা’, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’।
মানবতাবাদী লেখক-বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী বাংলা একাডেমি পুরস্কার, দাউদ পুরস্কার ও সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব লাভ করেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত ও নিখোঁজ হন। সম্ভবত ঐদিনই তাঁকে হত্যা করা হয়।
বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তান মুনীর চৌধুরী দেশ মাতৃকার জন্য সারাজীবন লড়াই করে গেছেন নিজের মেধা শ্রম বুদ্ধি তথা সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি তাঁর দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। মুনীর চৌধুরীর মতো সংগ্রামী কলমসৈনিকেরা কখনো মরেন না- নিজেদের অমূল্য সৃষ্টির মধ্যদিয়ে তারা চিরদিন বেঁচে থাকেন মানুষের মাঝে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আদর্শ মানুষ হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে থাকবেন মুনীর চৌধুরী।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম