…আমাদের বাড়ি ফেরার সময় বাঁশির বেতাল সুরে বারহাট্টার অসহায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতো। শব্দদূষণের ধারণাটা তখনও বাজারে নামেনি।
আমার বোনরা প্লাস্টিকের বা কাচের চুরি কিনে হাতে পরতো। যতদূর হাত, ততদূর চুরি।
ওরা লাল নীল রঙিন ফিতা কিনে মাথার চুল বাঁধতো। মাটির খেলনা পুতুল কিনতো– ছেলে পুতুল মেয়ে পুতুল মিলিয়ে। পুতুলের বিয়ে দেবে বলে মাটির পালকি কিনতো।…
কোনো একটি টিভি চ্যানেলের বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানের
উপস্থাপিকা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলা নববর্ষ উৎসবটি আপনি কীভাবে পালন করেন?
তার প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলেছিলাম, আজও সেকথাই বলবো। আমি বলেছিলাম, উৎসব জিনিসটা হচ্ছে ছোটদের। বড়দের কোনো উৎসব নেই। মানুষ যত বড় হয়, ততই সে উৎসব থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে। বড়রা তখন নিজের ভিতরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। ছোটদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার পক্ষে উৎসবের আনন্দহুল্লোড়ে যোগদানের মন মানসিকতা তাদের আর থাকে না।
পাল্টা প্রশ্ন ছিল, তাহলে উৎসবের সময় বড়দের কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি বলছিলাম, যা বলেছিলাম, তা আজও বলি– বড়দের কর্তব্য হচ্ছে ছোটদের উৎসব পালনে উৎসাহ জোগানো। তারা যেন নির্ভয়ে, নিরাপদে উৎসবের আনন্দ প্রাণ ভরে উপভোগ করতে পারে, তার জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষের উৎসব চলাকালে বোমা হামলার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর কোথাও কখনও না ঘটে– সেটা নিশ্চিত করা। ছোটদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনে দেয়া, যাতে নতুন জামা কাপড় পরে তারা প্রজাপতির মতো রঙিন পাখনা মেলে ঘুরে বেড়াতে পারে, উড়ে বেড়াতে পারে। বৈশাখী মেলাগুলো থেকে তাদের প্রিয় জিনিসগুলো, এটা ওটা কিনতে পারে।
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমরা ভাইবোনদের নিয়ে বৈশাখী মেলায় যেতাম, সেখান থেকে বাঁশের বাঁশি, রাবারের বল বা নানা আকারের, নানা প্রকারের, নানা রঙের বেলুন কিনতাম। তারপর কেনা শেষে বাঁশের বাঁশি বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরতাম।
আমাদের বাড়ি ফেরার সময় বাঁশির বেতাল সুরে বারহাট্টার অসহায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতো। শব্দদূষণের ধারণাটা তখনও বাজারে নামেনি।
আমার বোনরা প্লাস্টিকের বা কাচের চুরি কিনে হাতে পরতো। যতদূর হাত, ততদূর চুরি।
ওরা লাল নীল রঙিন ফিতা কিনে মাথার চুল বাঁধতো। মাটির খেলনা পুতুল কিনতো– ছেলে পুতুল মেয়ে পুতুল মিলিয়ে। পুতুলের বিয়ে দেবে বলে মাটির পালকি কিনতো।
একটু বড় হলেই যে তাদের বিয়ে হয়ে যাবে, এটা মেয়েরা কেমন করে যেন বুঝে যেতো খুব ছোটবেলা থেকেই। ছেলেরা, ভ্যাবলা কার্তিকের দল তখনও বিয়ের কথা চিন্তাও করতো না।
তাই ছেলেরা যখন চৈত্রের বারুনী মেলা থেকে খেলাধুলার সামগ্রী কিনতো, তখন মেয়েদের পছন্দ ছিলো বিবাহসামগ্রী।
জীবনের প্রথম ষোল বছর আমার এক নাগাড়ে গ্রামে কেটেছে বলে, গ্রামজীবনের বৈশাখী মেলার অনেক সুখস্মৃতিই আমার মনে পড়ে।
নগর জীবনে, ঢাকায় নববর্ষ উদযাপনের ঘটনাটিতে নতুন মাত্রা যোগ করে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে জন্মগ্রহণ করে ছায়ানট।
সে এক নতুন ইতিহাস।
সবাইকে জানাই শুভ নববর্ষ ১৪২৪।
(কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর ফেসবুক থেকে Nirmalendu Goon)
মাস্টারি বিডি ডটকম । ঢাকা । ১৪ এপ্রিল ২০১৭ । ০১ বৈশাখ ১৪২৪
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম