Home / এই দিন / প্রেমাংশুর রক্তে ভেজা কবি
1434912482

প্রেমাংশুর রক্তে ভেজা কবি

মাস্টারি বিডি ডটকম ।  শেখ নজরুল
ঢাকা । ২০ জুন ২০১৭ । ০৬ আষাঢ় ১৪২৪

৭৩ তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা Nirmalendu Goon

nirmalendu_goon

বিষণ্ন বর্ষায় জন্মে নির্মলেন্দু গুণের প্রিয় ঋতু বসন্ত। কবে কখন তিনি  কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন তা জানতে হয়তো তাকেই স্মৃতিআশ্রয়ী হতে হবে। তবে শৈশবের দিনগুলিতে তিনি নিছক ব্যস্ত থাকতেন কবিতার ছন্দ মেলানোর আনন্দে- এটুকু জানা গেছে। স্কুলজীবনে চার পঙক্তির একটি কবিতা রচনা, প্রশংসা এবং সেই আনন্দটুকুই তিনি সহজে স্মরণ করতে পারেন। তারপর বহুদিন গেছে। দিন বদলের সাথে তিনি নিজের ছায়াকে প্রতিবিম্বিত করেছেন ঝকঝকে কাব্যআয়নায়। ঈর্ষণীয় সমৃদ্ধির কবিতাজীবন তার। তিনি নাগরিক সমস্যার বাস্তব প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরেছেন তার কবিতায়।  সেখান থেকে অনবরত উদগরিত হয়েছে টচকা বমির কালসিটে ফেনাইল। যার প্রতীকী রূপ আমরা তার কবিতায় সহজেই পেয়ে যাই-

‘মিউনিসিপ্যালটির ভাঙা ট্রাকে শহরের সবকিছু

আমাদের যাবতীয় শোভন খাদ্যের পরিণতি

ড্রামের আবর্জনা, ড্রেনের হলুদ বমি, রোগীদের কাশ

পচা মুরগীর রান, পাখা, কলার বাকল…’

(মিউনিসিপ্যালটির ট্রাক)

পরবর্তী সময়ে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অল্পসংখ্যক কবিদের কবিতায় এ রকম প্রতীকী প্রতিবাদ পাই কিন্তু নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বিষয়, অনুসঙ্গ এবং উৎপ্রেক্ষা উপস্থাপনার ভিন্ন রকম রহস্যময়তা স্বীকার না করে উপায় নেই।

নির্মলেন্দু গুণ কবিতার জন্যই তিলে তিলে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নিজের হাতে আপন হৃদপিণ্ড খামচে কবিতার উৎসমুখে সযত্নে  রেখেছেন, সঙ্গোপনে নয়- প্রকাশ্যে। হৃদপিণ্ড খোয়া গেছে ঠিকই কিন্তু কবিতা তাকে বিমুখ করেনি। তিনি স্বয়ম্ভূ হয়েই বিবেকের উপলব্ধিতে মানুষের অধিকার প্রাপ্তির বিষয়টি তার ‘অসমাপ্ত কবিতায় সফলভাবে তুলে ধরেছেন-

ভাইসব, চেয়ে দেখুন বাংলার ভাগ্যাকাশে

আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, সানন্দার চোখে জল

একজন প্রেমিকার খোঁজে আবুল হাসান

কী নিঃসঙ্গ ব্যথায় কাঁপে রাত্রে ভাঙে সূর্য

……..রাজিয়ার বাল্যকালীন প্রেম…

(অসমাপ্ত কবিতা)

nirmolendu1434874741কবি নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালের ২১ জুন ১৩৫২ সালের ৭ আষাঢ় নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেন। বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফা, এগার দফা দাবীসহ ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তার ওপর ‘হুলিয়া’ জারি হয়। জনপ্রিয় এবং বহুল পঠিত ‘হুলিয়া’ কবিতাটি সেই প্রেক্ষাপটে রচিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে লিখেছিলেন- ‘আমি কারও রক্ত চাইতে আসিনি’। নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থের এবং মঞ্চে পঠিত প্রতিটি কবিতা সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং গণঅভ্যুত্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তার আলোচিত কাব্যগ্রন্থ- ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী, ‘আগে চাই সমাজতন্ত্র’, ‘দূর হ দুঃশাসন’, ‘মুঠোফোনের কাব্য’, ‘কামকানন’ উল্লেখযোগ্য। তিনি মোবাইল ফোনে কবিতা লিখে এক বিষ্ময় সৃষ্টি করেন- যা পরবর্তীতে ’মুঠোফোনের কাব্য’ নামে খ্যাতি পায়। নির্মলেন্দু গুণ কবিতায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন। ঊণসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ তার কাব্যজীবন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবান্বিত হয়। এ জন্য তাকে বহুদিন হুলিয়া মাথায় পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। তারই প্রেক্ষাপটে রচিত ‘হুলিয়া’ কবিতাটি বাস্তবতার নিরিখে কবির আত্মপোলব্ধিজাত হলেও এর অনুভূতি বর্ণনা বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরকালীন মর্যাদায় আসীন থাকবে। এই কবিতায় আত্মবিশ্লেষণের বিষয়টি এতো বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেখানে চোখের সামনে প্রতিভাত হয় কবির স্মৃতিধন্য গ্রাম আর তার পারিপার্শ্বিক বাস্তব পরিবেশ-

‘বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি

অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও

রফিজ আমাকে চিনলো না

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি…’

(হুলিয়া)

হুলিয়া কবিতাটি নিয়ে পরবর্তীতে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

নির্মলেন্দু গুণ বাংলা কবিতার নিপুণ কারিগর। খণ্ড খণ্ড অতীতকে তিনি অখণ্ডরূপে সমসাময়িক  প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন তার প্রতিটি কবিতায়। যে কবিতা কখনো হয়ে উঠেছে আমাদের যাপিত জীবনের হাহাকার কখনো বা বিদ্রোহের বীর রসসিক্ত শাণিত উপলব্ধি। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা সাধারণ মানুষের সংগ্রামের দিকচিহ্নিত মাইক্রোস্কোপ।  প্রেম আর দ্রোহের মিলিত অনুভব- যা আমাদের হৃদয় সরোবরে লাল পদ্ম হয়ে ফুটে ওঠে বৃষ্টিহীন দাবদাহেও। সংগ্রামের কবিতা আর নির্মলেন্দু গুণ যেন এক এবং অভিন্ন সত্তা-যা আর কোন কবির পক্ষে লেখা সম্ভব ছিল না-

‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে

লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে-

কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?

————————————–

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল

হৃদয়ে লাগিল দোলা,

——————-

কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে শোনালেন তাঁর

অমর কবিতাখানি:

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম;

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

(স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো)

17-5-17+prog+mbdনির্মলেন্দু গুণ সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম কারণ তিনি কবিতাকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পান না। মৃত্যুভয় যার পৌণপুনিক অংশও নয়। অনেক জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে  সেই সাহসের আকাল লক্ষ্যণীয়। নির্মলেন্দু গুণ গণমানুষের কবি। শ্রমিক সমার্থক, কৃষকের স্বপ্নময় চোখের সমান বয়েসী, তাই তিনি অবলীলায় বলতে পারেন-

‘যতক্ষণ তুমি কৃষকের পাশে আছো, যতক্ষণ তুমি

শ্রমিকের পাশে আছো, আমি আছি তোমার পাশেই…’

(প্রলেতারিয়েত)

কিংবা

‘যাদের হাতে অনেক জমি কালো টাকার ভূত,

তাদের সাথে লড়াই করে কতো চাষার পুত

কালো জমিন লাল করেছে বুকের তাজা খুনে

সীমারেরও অশ্রু“ ঝরে সেই কাহিনী শুনে….’

(চাষাভূষার কাব্য)

 

কিংবা

‘কাতর কণ্ঠে বধূটি শুধালো

আইছ্যা ফুলীর বাপ

আমাগো একটু জমিন অবে না

জমিন চাওয়া কি পাপ?…’

(ক্ষেতমজুরের কাব্য)

নির্মলেন্দু গুণ মাঝে মাঝে কিছুটা নস্টালজিক হয়েছেন। সাতই আষাঢ় হঠাৎ তার সামনে মেলে ধরে আঁতুর ঘরের ভেজা মাটি। কাশবনের ছিন্ন কুটির। কাদামাখা যে পথ ধরে তিনি এই শহরে এসেছিলেন তাকে তিনি ভুলতে পারেননি। ঘন মেঘে টুপটাপ বৃষ্টি এখনও তাকে জীবনের খেরোখাতা হাতে ম্মৃতির বারান্দায় দাঁড় করিয়ে দেয়-

‘সাতই আষাঢ় আমাকে দুহাত ধরে

টেনে নিয়ে গেল মফঃস্বলের ঐ কাদাভরা পথে

কাশবনের ছিন্ন কুটিরে; যেখানে আমার জন্ম

আমার আঁতুর ঘরের ভেজা মাটি’

(সাতই আষাঢ়)

যুদ্ধ আর মানবতার অবক্ষয়ে নির্মলেন্দু গুণের কণ্ঠ এবং কলম সর্বোচ্চ উচ্চকিত। তার মানবিক অনুভূতি স্বদেশ অতিক্রম করে সারাবিশ্বে ব্যাপৃত হয়েছে। মুক্ত প্যালেস্টাইনের জন্য তার অন্তরাত্মা রক্তাক্ত হয়েছে। তিনি তার কবিতার অন্তর্গত শক্তিকে তাদের চূড়ান্ত বিজয়েই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন-

‘হয়তো আমার কবিতা

তোমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের সেই প্রত্যাশিত

মুহূর্তকে ছুঁতে চেয়েছিল;

এতদিন তাই সে আসেনি।…’

(আমার কবিতা : মুক্ত প্যালেস্টাইন)

একইভাবে কবি ভিয়েতনামের সেই নাপাম বোমা পতনের ভয়াবহ এবং নৃশংস দৃশ্য ভুলতে পারেননি। তবে তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের ধিক্কার জানিয়েছেন আশাবাদি মননে-

‘নাপাম বোমায় ভষ্ম হয়নি মাটি

বরং পুড়েই পাথর হয়েছে সোনা…’

(ভিয়েতনাম ১৯৮২)

ছেষট্টির ছয় দফা, ঊণসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবই তার জীবনউপলব্ধ অধ্যায়। তিনি দুঃশাসনের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন নিজস্ব চেতনায়। তবু বারবার দুঃশাসনের কবলে পড়েছে স্বাধীন ভূখণ্ড। তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন-

‘তোর হাতে রক্ত, পায়ে কুষ্ঠ, কণ্ঠে নালী ঘা-

আল্লার দোহাই লাগে, তুই নেমে যা, নেমে যা।…’

(দূর হ দুঃশাসন)

প্রেমিক-কবি নির্মলেন্দু গুণ। অসংখ্য প্রেমের কবিতা লিখেছেন তিনি। কিন্তু প্রেমের সঙ্গে কষ্টের অনুসঙ্গ মিশিয়ে পাঠককে এক ভয়ংকর রহস্যময়তার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে তার অবস্থানের এটি একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। আমরা তার নীরাকে কখনই ভুলতে পারি না। বেঁচে থাকার অন্যরকম দৃশ্য উপভোগে নিখিলেশকে আহ্বান- এ যেন আমাদের সবার জীবনের যাপিত অংশ। আবার স্বয়ম্ভূ সুন্দর কবিতায় আমরা অন্যরকম এক প্রেমকে আবিষ্কার করি-

‘যতক্ষণ জেগে থাকি দরজাটা বন্ধ করি না

কেবলই মনে হয় কেউ একজন আসবে।

আমার প্রত্যাশায় এমন একজন নারী আছে

কোন শিল্পী যাকে আঁকতে পারেনি

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

আঁরি মাতিস,

পাবলো পিকাসো

অথবা যামিনী রায়;

কেউ-ই আঁকতে পারেনি তাকে।…’

বেঞ্জামিন মোলয়াসির প্রতি নির্মলেন্দু গুণের ভালোবাসা বর্ণনাতীত। দৃঢ়ভাবে তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর মৃত্যু কবিতাকেই চিরকালীন সমৃদ্ধি আর তাকে অমরত্ব দিয়েছে।  তিনি তাকে সারা বিশ্বের কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বেঞ্জামিন মোলয়াসির জন্য তিনি লিখেছেন-

‘আমরা জানলাম, শুধু শব্দ দিয়ে নয়, শুধু ছন্দ দিয়ে নয়

কখনো কখনো মৃত্যু দিয়ে লেখা হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা…’

(আফ্রিকার প্রেমের কবিতা)

নির্মলেন্দু গুণের কবিতা তার সংগ্রামদীর্ঘ জীবনেরই অংশ। আর কবিতার বিষয়বস্তু আত্মা থেকে উৎসারিত দীর্ঘ বোধের সরব উচ্চারণ। তিনি মহাশূন্যে অবস্থান করেও পৃথিবীকে স্পষ্ট  দেখতে পান। অনবরত রাজপথে হেঁটে কালো কালো বিটুমিনের গলিত শরীরের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন অথচ ঘরে ফিরেই ঘর বিমুখ হয়ে উঠেছেন তিনি।  যে ঘরে আলো নেই, বসন্তের হাওয়া নেই; সেই ঘরের জন্য ভাড়া দিয়ে ফতুর হবার বিষয়টি তিনি কখনই মেনে নিতে পারেননি। তিনি লিখেছেন-

‘আপনারা কি আমাদের সেইসব ঘরে

ফিরে যেতে বলবেন,

যেখানে ছিন্ন মলিন শাড়ি পরে

স্রেফ ভৎসনা করবার জন্য অপেক্ষা করে

আমাদের এক সময়ের প্রিয়-বধূরা?’

(আমরা রাজপথে কেন)

নির্মলেন্দু গুণের মন বিচিত্রাশ্রয়ী হলেও তিনি প্রকৃত থিতু হয়েছেন কবিতায়। পরাবাস্তবতার বিষয়টি তার কবিতায় অদ্ভুতভাবে লক্ষ্ করা যায়। তার প্রিয় পাঠকদের অটোগ্রাফ দেবার সঙ্গে তিনি টাকার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণরের স্বাক্ষর করার বিষয়টি মেলাতে চেয়েছেন।

“গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক সমীপেষু” কবিতায় তিনি লিখেছেন-

‘নারীকে যারা রহস্যময়ী বলে, আমি নিশ্চিত

তারা কখনো আপনাকে দেখেনি।

আপনি কি কখনো টাকা ধার করেন?

আপনি কি কখনো বাজার করতে যান?

আপনার স্বাক্ষরিত টাকার অবমূল্যায়নে

আপনি কি ব্যথিত বোধ করেন? দুঃখ পান?’

কখনো কখনো মনে প্রশ্ন জাগে কবি কি স্ববিরোধী? যদি সত্য হয় তা কি মানুষের প্রয়োজনে? এটিই বিশ্বাস করতে ভালো লাগে। স্ববিরোধিতার মধ্যে নিজের আত্মসমর্পণে কবি এক সময় হয়ে ওঠে সর্বজনীন। তাই বিষন্ন বর্ষায় জন্ম নিয়ে নির্মলেন্দু গুণের প্রিয় ঋতু বসন্ত। জন্মের সময় তিনি অনেক কেঁদেছিলেন কিন্তু এখন তার হাসতে ভালো লাগে।

তিনি স্ববিরোধী কবিতায় লিখেছেন-

‘আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম

এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি।’

বিখ্যাত কবিদের মৃত্যু চিন্তার বিষয়টি প্রায় অভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হতে দেখা যায় কিন্তু নির্মলেন্দু গুণের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রয়াত কবি এবং চিত্রশিল্পী হাসান হাবীবকে তিনি ‘পত্রকাব্য’ শিরোনামে একটি কবিতা উৎসর্গ করেছিলেন। ইচ্ছে করেই তিনি বিষয়টি তাকে জানাননি। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন-

সবাই তো চলে যাবে, প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে যাবে?

দিন যেভাবে রাতের ভিতরে যায় সেভাবে কি?

গন্ধ যেভাবে ফুলের ভিতরে যায় সেভাবে কি?

প্রাণ যেভাবে প্রাণীর ভিতরে যায় সেভাবে কি?

নদী যেমন সাগরের কাছে সর্মপিত তেমনি ঘাস আর শিশিরের মুগ্ধতায় তিনি হাসতে চেয়েছেন- পল্টনের মাউথঅর্গানে- গণসঙ্গীতের নির্ধারিত রাতে। ’প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-

“দেখো, আমার সাহসগুলি কেমন সতেজ বৃক্ষ

বাড়ীর পাশের রোগা নদীটির নীল জল থেকে

প্রতিদিন তুলে আনে লাল বিষ্ফোরণ”

17-5-17+prog+mbd-5

সংগ্রাম সত্য, সংগ্রামই সুন্দর এই সত্যে অমলিন নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। মৃতের দেশে প্রাণ জাগাতেই তার জন্ম।  সেই প্রাণ ভাগাভাগি করতেও প্রাণান্ত চেষ্টা করছে কেউ কেউ। নির্মলেন্দু গুণ বাঙালির আদর্শ। স্বাধীনতার বীর সৈনিক। সংগ্রামী জীবনের মূর্ত প্রতীক। তার কবিতা এইসব কথা চিৎকার করে বলে। আমরা বৎসর বৎসর সেই চিৎকার শুনতে চাই।

 

About Shekh Nazrul

Check Also

17 10 2026

হঠাৎ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী, ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ । মাসস দেশে চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি, চিকিৎসাসেবা ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published.