মাস্টারি বিডি ডটকম ।
মেহেরপুর । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ইতিহাসের পাতায় ৬ ডিসেম্বর মেহেরপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগর খ্যাত মেহেরপুর জেলা হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলায় টিকতে না পেরে পাকিস্তাানি হানাদার বাহিনী ৫ ডিসেম্বর বিকেল থেকে গোপনে মেহেরপুর ছেড়ে পালাতে শুরু করে। পরের দিন ৬ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় রাজনৈতিক মর্যাদাপূর্ণ মেহেরপুর জেলা। স্বাধীনতা পরবর্তী মেহেরপুরের মুজিবনগরে যেখানে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর লিখিত নির্দেশে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বচ্চ স্মারক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সেক্টরভিত্তিক বাংলাদেশ মানচিত্র নির্মিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের ১৮ এপ্র্রিল দুুপুরে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মেহেরপুরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সড়কপথে চুয়াডাঙ্গা থেকে মেহেরপুরে আসার পথে আমঝুপিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে আট জন গ্রামবাসীকে। পরবর্তীতে তারা মেহেরপুর প্রবেশ করে একের পর এক হামলা চালায় কাঁচাবাজার পট্টিতে, মহাকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে ও বড় বাজারের সবজি পট্টিতে। ১৮ এপ্রিল পাকবাহিনী কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন না হওয়ায় তারা ক্যাপ্টেন মোঃ আব্দুল লতিবের নেতৃত্বে শহরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বাড়িতে লুটপাট চালায়। ২০ এপ্রিল থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সৈন্যেরা মেহেরপুরের থানা কাউন্সিলে স্থায়ী ক্যাম্প গড়ে তোলে। স্থায়ী ক্যাম্প করার কিছুদিনের মধ্যেই সৈন্যের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে মেহেরপুরের ভকেশনাল ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট, কালাচাঁদপুর, কামদেবপুর ও সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পাকবাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা বিরামহীন আক্রমণ চালাতে থাকে।
১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল রাতে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি থাকার অজুহাত এনে যাদবপুর গ্রামকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানি নরপশুরা। পরের দিন ৩১ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা রাজাকার ও পিস কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব দিয়ে মেহেরপুর সরকারি কলেজে একটি অভ্যর্থনা কক্ষ নামধারী বাঙালি নির্যাতন কেন্দ্র খুললেও মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধে বেশি দিন তা চালাতে পারেনি।
১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনী পাকহানাদার বাহিনীর ওপরে টানা আক্রমণ চালাতে শুরু করলে পাকহানাদার বাহিনী অবস্থা বেগতিক দেখে যুদ্ধ সরঞ্জাম গুটাতে থাকে। ওই দিনই মুক্তিবাহিনী সকাল থেকে মেহেরপুরের পাকবাহিনীর আস্তানা লক্ষ্য করে চারদিক থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এতে আহতও হয় বেশ কয়েকজন। ২৮ এবং ২৯ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর একের পর এক হামলায় হানাদার বাহিনী মেহেরপুরে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকবাহিনী ৩০ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে গোপনে পিছু হটতে থাকে। বিতাড়িত হয়ে যাওয়ার পথে হানাদার বাহিনী আমঝুপি ব্রিজ, দিনদত্ত ব্রিজের কিছু অংশ বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়ে যায়। একই রাতে পালানোর সময় মুক্তিবাহিনীর মর্টার হামলায় কুলপালা নামক স্থানে বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়।
১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল থেকেই মেহেরপুর হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হতে থাকে। ২ ডিসেম্বর গাংনী হানাদার মুক্ত হলে শিকারপুরে অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর অ্যাকশন ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন তৌফিক এলাহী চৌধুরী হাটবোয়ালিয়ায় এসে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে ৫ ডিসেম্বর মেহেরপুরে প্রবেশ করে। ১ ডিসেম্বর মেহেরপুর মুক্ত হলেও সীমান্তে পাকবাহিনীর পুঁতে রাখা অসংখ্য মাইন অপসারণের মধ্য দিয়ে মেহেরপুর পুরোপুরিভাবে হানাদার মুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর।
সদর উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলামের কথায়, ৫ ডিসেম্বর আমরা রাত আনুমানিক বারোটা-একটার দিকে সুবেদার সামসুল ইসলামের নেতৃত্বে বারাদির পাটকেলপোতা গ্রামে শক্তিশালী অ্যামবুশ তৈরি করি। সেখানে মর্টার দিয়ে কয়েকটি আক্রমণ চালিয়ে পাক বাহিনীর একটি গাড়ি আমরা পুড়িয়ে দেই। তারপর থেকে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে খবর আসতে থাকলো পাক বহিনী মেহেরপুর ছাড়তে শুরু করে।
এদিকে, মেহেরপুর জেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বশির উদ্দিন জানান, ৫ ডিসেম্বর আমরা মুজিবনগর থেকে গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া পর্যন্ত কঠিন অ্যামবুশ তৈরি করে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছিলাম। আমাদের শক্ত অবস্থানের খবর জানতে পেরে পাকবাহিনীরা ৫ ডিসেম্বর থেকে মেহেরপুর ছাড়তে শুরু করে। ৬ ডিসেম্বর ভোরে আমরা জানতে পারলাম মেহেরপুর পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়েছে। তখন সবাই জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে মেহেরপুর মুক্ত ঘোষণা করি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমার দাবি মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী সে যেই হোক না কেন, তার বিচার আমারা দেখে যেতে চাই। বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম