Home / আরও / পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা : লিয়াকত হোসেন খোকন
rangamati+tour+mbd

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা : লিয়াকত হোসেন খোকন

মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ১৩ এপ্রিল ২০১৭ । ৩০ চৈত্র ১৪২৩

পাহাড়ের গায়ে গায়ে কত না শহরে—বনপথে ঘুরে বারবার শুধুই মনে পড়েছে বাংলার অপরূপ ‘রাঙামাটি’র কথা। পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রূপ-সৌন্দর্যের সাথে কারো যে হয় না তুলনা। এই জনপদে রয়েছে- হ্রদ, ঝরনা, জলপ্রপাত, অরণ্য, উপজাতি, মেঘ-পাহাড়, পাহাড়ের পর পাহাড়, পাহাড়িয়া আঁকাবাঁকা পথ।

rangamati+tour+sajek+mbd-2

কখনওবা মনে হয় – পাতার বাঁশি বাজায় বসি পাহাড়িয়া কোনো ছেলে…। তাই এই অনন্য রূপের রাঙামাটির – ‘রাঙামাটি’ নামটিও মনের কোণে উঁকি দেয়, গানেও ঠাঁই পেয়েছে বার বার। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা – ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায় রে। ওরে কার পানে মন হাত বাড়িয়ে লুটিয়ে যায় ধূলায় রে …’ গানের এ দু’টি লাইন মনে হতেই ভ্রমণ-পিয়াসীদের রাঙামাটির কথাই তো মনে পড়বে।

rangamati+tour+sajek+mbd-8

ষড়ঋতুর বাংলাদেশের এই রাঙামাটি একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারণ করে – গ্রীষ্মে এখানের হ্রদে সন্ধ্যায় ইঞ্জিনচালিত বোটে উঠলে মন চলে যায় চাঁদের দেশে। বর্ষায় অথৈ জল দেখে বলতেই হয়- ‘ঝরো-ঝরো ধারে ভিজিবে নিচোল, ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল – ওই বেনু বন দোলে ঘন ঘন পথ পাশে দেখ চাহি রে’— এই চরণ দু’টি। শরতে রাঙামাটিতে ঘুরে বেড়ালে- ‘কার মধু ডিঙা ভিড়বে এ ঘাটে ফিরবে কি প্রিয় ঘরে/ শেফালিকা তলে কাঁকনের বোলে মালা গেঁথে থরে থরে’ খুঁজে পাওয়া যায় গানের এই কথারই প্রতিচ্ছবি। হেমন্তে নব সাজে সেজে ওঠে পাহাড়ের অরণ্যে গাছপালা, যেনই তখন হয়ে ওঠে সর্বত্র সবুজের সমারোহ।

rangamati+tour+sajek+mbd-11

শীতে রাঙামাটির পাহাড়ের পথ ধরে চলতে – এই পাহাড়ের পথে ভ্রমণ যেন সফল হয়ে দেখা দেয়। যেনো হৃদয় মন মিশে যায় পাহাড়-অরণ্যের সাথে। তখন ভাবতেই হয়- ‘মন ছুটেছে আজ তেপান্তরে/ ঐ দূর গাঁয়ে ধান ক্ষেতে/ আলোরই ধারে ধারে/ রাঙামাটির ভুবনখানি’ – গানের এই কথাগুলো। বসন্ত এখানে মানে রাঙামাটিকে জানান দেয়- ‘আমি গোলাপের মতো ফুটবো … জানি পাপিয়া দূরে রয়/ আমি স্বপনের কথা বলিয়া স্বপনে ভাসিয়া যাই/ আমি চাঁপার কুঞ্জে কুহু আমি কেতকী বনের কেকা’… গানের এই কথাগুলো।

rangamati+tour+sajek+mbd-5

আহা অপরূপ শোভাময় পার্বত্য জেলা রাঙামাটি হতে পারতো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ স্পট! তা কী হয়েছে?  হয়নি। এর পিছনে যেসব সমস্যা আছে তা হলো, যেমন- রাঙামাটিতে গেলে এর বাইরে – বরকল, মারিশ্যা, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি, রাজস্থলি, কাউখালী, সাজেক, কাসালং, শুভলং, বড়হরিনা, রূপাখড়ি, সারেখং, বুড়িহাট, কমলপতি, কাঁকড়ছড়ি, মোগবন, ছমছমিয়া, ময়দং, ভূষণছড়া, চন্দ্রঘোনা ইত্যাদি কত না আকর্ষণীয় স্পটে যাওয়ার জন্য নেই কোনো প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা ।

rangamati+tour+sajek+mbd-12

রাঙামাটির মতোই আকর্ষণীয় এর প্রতিটি উপজেলা, যেমন- বরকল, বাঘাইছড়ি, কাউখালী, জুরাইছড়ি, লংগদু, নানিয়ারচর, বিলাইছড়ি, কাপ্তাই, রাজস্থলিতে ট্যুরিষ্টদের জন্য রাত্রি যাপনে নেই কোনো সুব্যবস্থা। রাঙামাটির বাইরে ওই সকল পাহাড়ে ঘেরা অপার সৌন্দর্যময় উপজেলাগুলোতে স্থাপিত হয়নি আধুনিকমানের কোনো হোটেল-মোটেল। তাহলে ট্যুরিষ্টরা কী আশায় বুক বেঁধে দলে দলে ছুটবে ওই পাহাড় অরন্যের বন-পথে! এ জন্য অবিলম্বে রাঙামাটির প্রতিটি উপজেলায় হোটেল-মোটেল স্থাপন করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থায়। রাঙামাটির বাইরে পাহাড়-অরণ্যে বেড়ানোর কথা ট্যুরিস্টরা ভাবতেই যেনো ভয় পান।  নিরাপত্তার বড়ই যে অভাব- এটাই আসল কারণ। কখন কী হয়ে যায়, সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করার মতো ঘটনার কথা সবার-ই তো জানা। ভয়-ভীতি নিয়ে কেউ আর রাঙামাটি শহরের বাইরে যেতে চান না। ভ্রমণ যেনো ওখানেই ক্ষান্ত হয়ে পড়ে। অথচ নয়ন লোভা সকল সৌন্দর্য রয়ে গেছে ছোট ছোট উপজেলাগুলোতে কিংবা পাহাড়িয়া গাঁয়ের পথে পথে।

rangamati+tour+sajek+mbd-4

রাঙামাটি থেকে এর প্রতিটি উপজেলায় যাতায়াতের ব্যবস্থা আরও সহজ করার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি ট্যুরিস্টদেরকে দিতে হবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা। রাঙামাটি শহরে ঢুকলে এখন আর চোখে পড়ে না – চাকমা, মগ, মুরং, মারমা, টিপরা নৃগোষ্ঠি।  ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত যতবার গিয়েছি ওখানে উপজাতিদের কণ্ঠে শুনেছি- চাকমা ভাষায় গান, দু’নয়ন ভরে দেখেছি ওদের নৃত্য। সে যুগে রাঙামাটিতে বসবাস ছিলো শুধুই যে উপজাতিদের, তখন এদেরকে উপজাতি বলা হতো—এখন তো বলা হয় ‘আদিবাসী’। ১৯৮০ সালের পর থেকেই রাঙামাটিতে আদিবাসীদের বসবাস হ্রাস পেয়ে বাঙালিদের বসবাস বেড়ে যেতে শুরু করলো।

rangamati+tour+sajek+mbd-6

দ্রুত এর পরিবর্তন হওয়ায় আজ আর মনে হয় না এটি যে একদা ছিল আদিবাসীদের শহর। তাই রাঙামাটি জেলার বরকল, বাঘাইছড়ি, মারিশ্যা, নানিয়ারচর, বিলইছড়ি, জুরাইছড়ি, লংগদু প্রভৃতি উপজেলায় শুধুই আদিবাসীদের বসবাসের ব্যবস্থা রেখে গড়ে তোলা হোক আদিবাসী শহর রূপে। তবেই স্বচক্ষে দেখা মিলবে আদিবাসীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য। আর এভাবেই ট্যুরিস্টদের আনাগোনা বেড়ে যাবে এসব আদিবাসী শহরে। ওইসব পাহাড়িয়া শহরে ট্যুরিস্টদের অবস্থানে আধুনিক মানসম্পন্ন আবাসিক হোটেল-মোটেল স্থাপনের পাশাপাশি তাদের ঘুরে বেড়ানোতে দিতে হবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ।

rangamati+tour+sajek+mbd-13

পাহড়িয়া রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে হাউজ বোটও চালু করতে হবে। হাউজ বোটে ট্যুরিস্টদের রাত্রিযাপনে চাই থাকার ব্যবস্থা। এই হাউজবোটগুলো দুই পাহাড়ের মাঝ থেকে বয়ে যাওয়া নদী হয়ে দূরে-বহুদূরে চলে যেতে পারে- সেই ব্যবস্থারও উদ্যোগ নিতে হবে। রাঙামাটির প্রতিটি উপজেলায় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক এর সমপরিমাণ আনন্দ বিনোদনের ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন। আর তা বাস্তবায়িত করে বিদেশি টিভি চ্যানেলে এর প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হলে বিদেশ থেকে দলে দলে ট্যুরিস্ট আসবে এই রাঙামাটিতে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেই পার্বত্য রাঙামাটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পর্যটন কেন্দ্ররূপে।

লেখক : গবেষক

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

12 4 2026 66

৯২ তে থামলেন আশা ভোসলে

ঢাকা, রবিবার ১২ এপ্রিল ২০২৬ মাসস প্রয়াত বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলে। বয়স হয়েছিল ৯২। শনিবার সন্ধ্যাবেলা হঠাৎই …

Leave a Reply

Your email address will not be published.