Home / জাতীয় / নারীর হাতে এখন ৯ জেলার দায়িত্ব
9dcmbd

নারীর হাতে এখন ৯ জেলার দায়িত্ব

মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা ০১ অক্টোবর ২০১৬ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৩

জেলা প্রশাসক হিসেবে একদিনেই নিয়োগ পেলেন চার নারী। ৬৪ জেলায় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে এখন নারীর সংখ্যা নয়। জেলা প্রশাসক হিসেবে একসঙ্গে এত নারী কখনও কাজ করেননি।

রক্ষণশীল বাঙালি সমাজে নারীদেরকে বাইরে কাজ করতেই বাধা দেয়া হতো তিন দশক আগেও। কিন্তু কোনো কোনো পরিবার আবার উৎসাহ দিয়েছে, তাদের সাফল্য দেখে আবার অনুপ্রাণিত হয়েছে অন্যরা। দিনে দিনে পড়ালেখা আর চাকরিতেও বাড়ছে নারীর সংখ্যা।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশকে এখন পৃথিবীতে উদাহরণ হিসেবেই দেখা হয়। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার-তিন জনই নারী। কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে না, শিক্ষা, প্রশাসন, চাকরি, সব ক্ষেত্রেই নারীর অগ্রগতির প্রশংসা করছে সারা বিশ্ব।

মেয়েরা ইদানীং পড়াশোনায় ছেলেদেরকেও পিছে ফেলে দিয়েছে। চলতি বছর এইচএসসিতেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভালো করেছে। আর তাদের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমনও বলেছেন যে, ‘ছেলেদেরকে পড়াশোনায় আরেকটু মনযোগী হতে হবে। তারা বাইরে ঘোরাঘুরি বেশি করে, পড়াশোনায় মনযোগ দিতে চায় না।’

মেয়েদের অগ্রগতিতে দারুণ খুশি নারী অধিকার কর্মীরা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই মন্তব্য করে আরও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নের কথা বলেছেন তারা। নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, অনেক অগ্রগতি হলেও এখনও কেবল নারী বলেই অনেককে থেমে যেতে হয়, থামিয়ে দেয়া হয়। পাশাপাশি নারীর ওপর সহিংসতা, সন্ত্রাসের অবসান হয়নি এখনও। তবে নারীরা আরও সফল হয়ে গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে দেবেন বলেই বিশ্বাস করেন তারা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দেশের নয় জেলায় নারী। এটা অবশ্যই নারীর ক্ষমতায়নের দিনে থেকে গর্বের বিষয়। এটা বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতির একটা ইতিবাচক লক্ষণ। তবে নারীরা এখনো নারীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সাম্য ও সমঅধিকারের দিক থেকে পিছিয়ে আছে। তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। উত্তরাধীকারেও নারী সাম্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এসব দিকে রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক কিছু করার আছে।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘নারীদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। প্রশাসনে নারী অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। এটা অবশ্যই ভাল দিক। কিন্তু এই সংখ্যাটা আরও বাড়তে হবে।’

নারী জেলা প্রশাসকরা

বাংলাদেশের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন রাজিয়া বেগম। এরপর বিভিন্ন সময়ে নারী জেলা প্রশাসক হয়েছেন। গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে পাঁচ জন নারী জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন। এরা হলেন- মানিকগঞ্জের রাশিদা ফেরদৌস, হবিগঞ্জে সাবিনা আলম, পাবনায় রেখা রানি বালো, চুয়াডাঙ্গায় সায়মা ইউনুস, রাজবাড়ীতে জিনাত আরা কর্মরত আছেন।

আর ২৩ আগস্ট ফরিদপুরে বেগম উম্মে সালমা তানজিয়া, সিরাজগঞ্জে কামরুন নাহার সিদ্দীকা, মুন্সিগঞ্জে বেগম সায়লা ফারজানা এবং নাটোরে বেগম শাহিনা খাতুনকে নিয়োগ দেয়ার আদেশ হয়েছে।

‘সম্মান আদায় করছেন নারীরা’

হবিগঞ্জে সাবিনা আলম নিয়োগ পান তারও আগে ২০১৫ সালের জুনে। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এসব পদ এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং। তবে সব চ্যালেঞ্জই সফলভাবে মোকাবেলা করা যায়। একজন নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে সব সময় গর্ববোধ করি।’ নারী হওয়ায় বাড়তি কোনো সুবিধা বা সমস্যা আছে?- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজ করতে চাইলে নারী-পুরুষ কোনো ব্যাপারই না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নারী হওয়ায় আমি আলাদা কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িনি। আমাকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে সেটা যে কোনো পুরুষ জেলা প্রশাসককেও মোকাবেলা করতে হবে।’

সাবিনা আলম বলেন, ‘কেবল এই পদ বলে কথা না। প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই এখন আগের চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি আসছে নারীরা। তারা ভালোও করছে। হয়তো আগে নারীদেরকে সেভাবে সম্মানের চোখে দেখা হতো না। এখন তাদের কাজের কারণেই সহকর্মী হিসেবে সম্মান করে সবাই। আমি আশা করি এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আরও চাই সরকারের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।’

রাজবাড়ীতে জিনাত আরা নিয়োগ পেয়েছেন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ছয় মাস ধরে বেশ সাফল্যের সঙ্গেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি।

ঢাকাটাইমসকে জিনাত আরা বলেন, ‘নারীরা একটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন। এটা অবশ্যই সম্মানের। নারীর ক্ষমতায়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’

পাবনার জেলা প্রশাসক হিসেবে রেখা রানী বালো নিয়োগ পান গত জানুয়ারিতে।

ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই এটা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। নারীদেরকে আটকে রাখা যায়নি। বিরুদ্ধ পরিবেশেও তারা সাফল্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এখন সবাই বুঝতে পারছে নারীদেরকে বাদ রেখে উন্নয়নের সোপানে পৌঁছানো সম্ভব না।’

রেখা রানী বালো জানান, তার জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবেও কাজ করছেন একজন নারী মাকসুদা বেগম সিদ্দীকা। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন এবং র্যাবের কমান্ডার হিসেবে কাজ করছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপর বিনা রানী দাস।

পাবনার জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নারী-পুরুষ যদি সমানভাবে এগিয়ে না যায় তাহলে কোনো দেশই এগিয়ে যেতে পারে না। তাই নারী-পুরুষ উভয়কেই এগিয়ে যেতে হবে। উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছতে হলে এর বিকল্প নেই।’

মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস নিয়োগ পেয়েছেন গত ২৫ জুন। তার মতে প্রশাসনের নারী কর্মীরা বরাবরই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে। তিনি বলেন, ‘একজন নারী যখন অফিস করেন তখন তিনি কিন্তু কাজের মধ্যেই ঢুকে থাকেন। তারা বাইরে আলাপের চেয়ে অফিসের কাজই বেশি করে থাকে। পুরুষরা হয়তো কেউ ধুমপান করেন, কেউ বা আড্ডাবাজি পছন্দ করেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা নেই বললেই চলে।’

নারীরা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলে তৃণমূলের নারীদের জন্যও সুবিধা হয়। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় নারী প্রতিনিধিরা কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে বেশি গুরুত্ব পেতো না। আমি আসার পর চেয়ারম্যানদেরকে বলে নারীরা যাতে বেশি ভিজিডি কার্ড বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পায়। উন্নয়নমূলক কাজে তিন শতাংশ ক্ষেত্রে নারীরা যেন দায়িত্ব পায় সেটাও বলে দিয়েছি।’

চুয়াডাঙ্গায় সায়মা ইউনুস যোগ দিয়েছেন এক বছরেরও বেশি সময় হলো। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘কেবল জেলা প্রশাসক কেন, ঠিকভাবে কাজ করতে পারলে নারী তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদেও আসীন হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশে আমার বার্তা হচ্ছে, তারা যেন আরও যত্নশীল হয়। মনোযোগ দিয়ে কাজ করে। তাহলে তারাও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবে।’

‘মেয়েদের স্বপ্ন দেখাতে চাই’

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বেগম উম্মে সালমা তানজিয়া। এর আগে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে কাজ করেছেন। আরও কাজ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবেও। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমি মেয়েদের স্বপ্ন দেখাতে চাই। আমি যখন ফরিদপুরের রাস্তা দিয়ে হাঁটবো তখন নারীরা আমাকে দেখে অনুপ্রেরণা পাবে। তারাও স্বপ্ন বুনবে। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের স্কুলে একবার ডিসি এসেছিলেন এক অনুষ্ঠানে। তখন থেকেই আমার স্বপ্ন, আমিও একদিন ডিসি হবো।’

মুন্সিগঞ্জের নিয়োগ পাওয়া সায়লা ফারজানা বলেন, ‘জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়াকে অবশ্যই গর্বের মনে করি। ’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য অনেক কিছুই করার আছে। আমি প্রথমে চিহ্নিত করবো নারীরা কোথায় পিছিয়ে আছে।’

জেলা প্রশাসকের সংখ্যা নয় জন দেখে আপ্লুত নন সায়লা ফারজানা। বলেন, ‘আরও নারী আসা উচিত এই পদে। এদের যোগ্যতা আছে। সেটা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জে নিয়োগ পাওয়া কামরুন নাহার সিদ্দীকার কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ৩০ শতাংশ নারী ডিসি দেয়ার কথা বলেছেন। বলেছেন, নারীর ক্ষমতায়ন হতে হবে। এই হিসাবে নারী জেলা প্রশাসকের সংখ্যা তো আরও বেশি হওয়া উচিত।’

এই জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পুরুষের চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন না করতে পারলে নারীর উন্নয়ন হবে না। পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সেই পরিবর্তনেই আমি কাজ করবো।’

নাটোরে নিয়োগ পাওয়া শাহিনা খাতুন বলেন, ‘আমি যখন ডিসি হিসেবে কাজ করবো তখন কেবল নারী নয়, সবার সুবিধাই দেখার চেষ্টা করবো।’ তিনি বলেন, ‘নির্যাতিত নারী যেন ন্যায়বিচার পায়, প্রতিবন্ধী যেন সহযোগিতা পায় সেই দিকে দৃষ্টি থাকবে।’

অন্য নারীদের প্রতি কী বার্তা থাকবে- জানতে চাইলে শাহিনা খাতুন বলেন, ‘নিজের পরিচয়ে বড় হতে হবে। নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলবে হবে, যেন কেউ বলতে না পারে ঘুরপথে সাফল্য পেয়েছো তুমি।’-সংগৃহীত

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

28 25 5 2

কারাগারে ঈদ ১৬১ ভিআইপির

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৮ মে ২০২৬ মাসস পবিত্র ঈদুল আজহায় এবার কারাগারে ঈদ উদযাপন করবেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী …

Leave a Reply

Your email address will not be published.