ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০১ জানুয়ারি ২০২৬ মাসস
স্বাগত ২০২৬ । আশা ও আকাঙ্ক্ষার বছর হয়ে নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হলো আরেকটি নতুন বছর। মহাকালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেলো ঘটনাবহুল ২০২৫ সাল। শুরু হলো আরেক নতুন পথযাত্রা।
নতুন বছরের আবাহনে স্মরণ করা যেতে পারে ফেলে আসা বছরটিকে। ২০২৫ সাল বিশ্ব ও বাংলাদেশের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে—যেখানে পুরোনো অনেক কিছুই ভেঙেছে। চলেছে পুনর্গঠন। তবে নতুন পথগুলো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
২০২৫ সাল বিদায় নিয়েছে বহু প্রশ্ন রেখে, অনেক দ্বিধা রেখে, সংশয়ের পটভূমিতে এবং নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত রেখে। ২০২৫-কে স্মরণ করা মানে কেবল ঘটনাপঞ্জি টানা নয়। বরং বিগত পরিস্থিতির মনস্তত্ত্ব, রাজনীতির প্রবণতা এবং সমাজের ভেতরে চলমান নীরব রূপান্তরকে ধরার চেষ্টা করা। যে চেষ্টার সাফল্যের মধ্যে নিহিত ২০২৬ সালের সফলতা।
বিশ্ব রাজনীতিতে ২০২৫ ছিল ‘একক আধিপত্যের পরবর্তী পর্যায়’। বিশ্বশক্তির ভারসাম্য বদলেছে, কিন্তু স্থিতি আসেনি। বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্বও তাতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে অনেক বেশি অনিশ্চিত আর উত্তেজনাপূর্ণ।
২০২৫ সালে আরও কঠিন হয়েছে: তথ্যের ভিড়ে সত্য খুঁজে বের করা। প্রপাগান্ডার কোলাহলে প্রাসঙ্গিক কণ্ঠকে চাপা পড়তে দেখা গেছে। গুজব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা পরিচালিত নানা অ্যাপ সংবাদ ও তথ্যপ্রবাহে নিয়ন্ত্রণ গড়তে চেষ্টা করেছে। পেশাদার ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমে বারবার ফ্যাক্টচেক-এর আশ্রয় নিতে হয়েছে সত্য খুঁজে বের করার তাগিদে। এমন পরিস্থিতি আরও জটিল ও বিস্তৃত হবে ২০২৬ সালে।
দেশীয় রাজনীতিতে ২০২৫ সাল শিখিয়েছে যে গণতন্ত্র কেবল একটি ঘটনার নাম নয়। এটি একটি প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত চর্চা ও সুরক্ষার দাবি রাখে। নির্বাচন, সংস্কার, রাজপথ ও রাষ্ট্রযন্ত্র—সবখানেই টানাপোড়েন, তর্ক-বিতর্ক ও থেমে থেমে প্রতিবাদ ও সংক্ষোভ ছিল দৃশ্যমান। সমাজে মতপ্রকাশের জায়গা যেমন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তেমনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ক্ষমতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও জোরালো আকারে সামনে এসেছে বেশকিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে। বহুত্ববাদী, উদার, মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে মাঝে মধ্যে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে হঠকারিতার আবেগ।
অর্থনীতি ও সমাজজীবনে ২০২৫ ছিল চাপ ও অভিযোজনের বছর। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, জলবায়ু ঝুঁকি—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তার ছাপ ছিল গভীর। তবে একই সঙ্গে দেখা গেছে টিকে থাকার দৃঢ়তা: প্রান্তিক মানুষের সৃজনশীলতা, তরুণদের নতুন ভাষা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, নারীদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক উপস্থিতি। এসব ছোট ছোট গল্পই বড় শিরোনামের আড়ালে থাকা ২০২৫ সালের আসল বাস্তবতা।
২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা একটাই, রূপান্তর ও পরিবর্তনের যে ইতিবাচক আশা ও আকাঙ্ক্ষা সঞ্চারিত হয়েছে, তার পরিণতি দেখতে চায় মানুষ। অস্থিরতা ও উত্তেজনার বিপরীতে স্থিতি ও শান্তির অপেক্ষা করছে আম-জনতা। একের পর এক চলমান ঘটনার পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত ও বিরক্ত মানুষ তাকিয়ে আছে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুস্থিরতার দিকে। বহুকাঙ্ক্ষত ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অপেক্ষমাণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বাক্ষী হতে। এ কারণেই আগামী বছর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। প্রযুক্তি ও তথ্যের অবারিত যুগে স্বচ্ছতা ও শুদ্ধতার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে সমস্যা আরও গভীর হতে পারে। তৈরি হতে পারে আস্থার সংকট। গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তি ও ক্ষমতার প্রভাব থেকে দূরে থেকে সমাজের সঙ্গে সংযোগ গভীর করে সত্য বলার এবং অংশগ্রহণমূলক সঠিক জনমতের প্রতিফলন ঘটানোই হবে ২০২৬ সালের সাফল্যের মূলমন্ত্র। এক্ষেত্রে সকলের মধ্যে সততা ও সাহসই হবে বিজয়ের মূল পুঁজি।
২০২৫ আমাদের ক্লান্ত ও বিষন্ন করেছে। অনেক শোক ও বেদনা দিয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি নিরাশ করেনি। গণতন্ত্রের প্রত্যাশার জনআকাঙ্খা ঘিরে প্রজ্জ্বলিত আশার প্রদীপ দীপ্তিমান রেখেছে। ফলে ২০২৫ সালের বিদায় দিয়ে ২০২৬ সালকে বরণের বেলায় শোকের দাহকে শক্তির মশালে পরিণত করার প্রতীতিই কাম্য। আবেগের চেয়ে আত্মসমালোচনাই বেশি জরুরি। আশা ও আকাঙ্ক্ষার বছর ২০২৬-কে স্বাগত জানানোর মাহেন্দ্রক্ষণে সবাই অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে আরও সংবেদনশীল ভাষ্য, আরও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা এবং আরও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির। যার ভিত্তিতে সম্ভব হবে ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ পাড়ি দিয়ে আশা ও আকাঙ্ক্ষার সাফল্যচিহ্নিত স্বর্ণালী সৈকতে উপনীত হওয়া।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম