Home / আরও / বিপন্ন প্রকৃতি অসহায় মানুষ : বিপ্রদাশ বড়ুয়া
Prokriti+mbd-4

বিপন্ন প্রকৃতি অসহায় মানুষ : বিপ্রদাশ বড়ুয়া

প্রকৃতি মানুষ ছাড়া বাঁচতে পারে, মানুষ প্রকৃতিকে ছাড়া বাঁচতে পারে না। আবার প্রকৃতি মানুষ থেকে কিছুই না নিয়ে বাঁচতে পারে, মানুষ পারে না। আবার প্রকৃতির মধ্যেও আছে এক রকম তারতম্য। চাঁদে গিয়ে বিরূপ প্রকৃতির মাঝে মানুষের পক্ষে পৃথিবীর অনুকূল প্রতিবেশ রচনা খুব সহজ নয়, কৃত্রিমভাবে সেখানে মানুষকে জীবনধারণ করতে হয়। সেখানে অক্সিজেন, পানি, খাদ্য অর্থাৎ মানুষের জীবনধারণের মতো পরিবেশ নেই। কোনো কালে থাকলেও থাকতে পারে, তাও আমরা জানি না। এই না-জানাটা আমাদের জ্ঞানের অপূর্ণতা। অপূর্ণতাও মানবোচিত; মানুষ জ্ঞানের শেষ সীমায় বা কাছাকাছি চলে গেলে পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটে যাবে। আর তাও খুব দূরে নয়- জানা যাবে।
আইনস্টাইনের আলোর গতির তত্ত্ব এখনও নির্ভুল। সৃষ্টির জন্য একজন মহাপ্রভুর দরকার? এখন তার দরজায় নতুন করে করাঘাত পড়েছে। জাঁ পল সার্ত্র বলেছেন, মানুষের জন্মের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ডারউইন কী বলেছেন? মানুষ তো জীব হিসেবে সৃষ্টি হয়নি। মানুষ হচ্ছে প্রাণীর বিবর্তিত রূপ। এমনও হতে পারে বিবর্তনের ধারায় প্রাণ ধারণের জন্য মানুষও আবার বিবর্তিত হবে। ‘এলিয়েন’ সম্পর্কে যে ধারণা মানুষের তারাই হয়তো ভিন্ন গ্রহের মানুষের বিবর্তিত রূপ। এ পৃথিবীতে না হোক, অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা তারা। অন্তত নক্ষত্রবীথির মাঝে পৃথিবীর মতো গ্রহ যে আছে তা আমরা জেনেছি। সেসব গ্রহের মধ্যে কোথাও না কোথাও প্রাণ আছে, মানুষের মতো প্রাণী আছে, বুদ্ধিতে তারা মানুষের চেয়ে খাটো নয়। কিন্তু এসব এখনও প্রমাণিত সত্যরূপে গৃহীত হয়নি বলে আমাদের বিশ্বের বর্তমান প্রকৃতি নিয়েই আমরা মগ্ন। শুধু মগ্ন নই, বিপন্নও। আবার বিপন্ন জেনেও অসহায়। কারণ বিপন্নতার জন্য যারা দায়ী তারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না, এমনকি তার নিজের পরবর্তী প্রজন্মের কথাও ভাবে না। এখানেই মানবজাতির সমস্যা। ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ও সরকার সাধারণ ও গরিবদের এবং শান্তিপ্রিয় মানুষদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে রাজ্যপাট চালিয়ে যাচ্ছে। আদিকাল থেকে।

Prokriti+mbd-2
প্রকৃতির মধ্যেও আছে যোগ্যতমদের বেঁচে থাকার খেলা বা লড়াই। মানুষের মধ্যেও আছে ক্ষমতাবান, ধূর্ত, শঠ ও চালবাজদের টিকে থাকার চেষ্টা। সাধারণ সৎপ্রকৃতির মানুষ চায় স্থিরতা, প্রকৃতির সঙ্গে সহমর্মিতা বা প্রশংসা ও পূজাও করেন কেউ কেউ। পীর-দরবেশদের আস্তানায় দেখা যায় গাছপালা- পুকুর ও নির্জন আস্তানা। এমনকি শহরের ভিড়ের মধ্যেও দেখা যায় ধর্মস্থানে প্রাকৃতিক পরিবেশ। সাধারণ মানুষও ঘরের আশপাশে, বারান্দায়, ছাদে গাছপালা বা টবের সমাবেশ করে। যেমন একটি আজেলিয়া বা ক্যামেলিয়া, মধুমালতি বা মাধবী, রাতের রানী বা কুমারী অপরাজিতা ফুল। শিউলি- বকুলের জন্য জায়গা দরকার। সুখদর্শন বা ব্যাঘ্রলিলির জন্য টবই যথেষ্ট। এমনকি স্বর্গের পাখির মতো দুর্লভ ফুলও টবে চাষ করা যায়। শুধু আপনাকে জানতে হবে পরিচর্যা ও তার সুলুক সন্ধান। রঙ্গন, রাধাচূড়া, মাকড়শা লিলি, ব্যাঘ্রলিলি, গ্লোরিয়া বল, শটি, হলুদ, আদা, দোলনচাঁপা টবের জন্য আদর্শ ফুল। হে অনুরাগী ফুলপ্রেমী, ফুল ও মানুষের জীবনের উদ্ভিদকাল অমূল্য। তাকে ব্যর্থ যেতে দেয়া ন্যায়ধর্ম নয়। ফুলের জীবনের সঙ্গে মানবজীবনের গভীর গূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। এই রহস্য জানা বা চেনা চর্চার বিষয়। ভালোবাসা থেকে সিদ্ধি লাভ সবই চর্চার বিষয়।
সঙ্গীতের ‘সা রে গা মা পা ধা নি’ অর্থাৎ ষড়ুজ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত, নিষাদ এ সাতটি স্বরকে স্বপ্তস্বর বলা হয়। সাতটি শুদ্ধস্বর রূপে কথিত। ষড়–জ, ঋষভ, প্রভৃতি সপ্তস্বরের পূর্ণ নাম। এ সাত সুর যথাক্রমে ময়ূর, ষাঁড়, ছাগ, ক্রৌঞ্চ (বক), কোকিল, অশ্ব ও হাতি এ সাত রকম জীবের কণ্ঠ নিঃসৃত ধ্বনি থেকে গৃহীত বলে প্রাচীন সঙ্গীতালোচনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। মতান্তরে ময়ূর, চাতক, ছাগ, কোঁচ বক, কোকিল, অশ্ব ও হাতি। অর্থাৎ জীবজগতের কণ্ঠ থেকে সুর আহরণ করেছে মানুষ। হাতির আছে মধুর সুরেলা গলা। ষাঁড়ের গম্ভীর নিনাদ থেকে সা পেয়েছি। ছাগল বললে তুচ্ছ করার আর কারণ নেই।

Prokriti+mbd
‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে’ এবং ‘আষাঢ়, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া।’ রবীন্দ্রনাথের বর্ষার অসামান্য গান। তার গীতবিতান প্রকৃতি, প্রেম ও বিশ্ব রহস্যের বিশাল ভাণ্ডার। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আসে বলেই কি রবীন্দ্রনাথ ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো’ বলেননি! আর আষাঢ় এসে গেলে সে হয় বাঁধন ছাড়া, বাঁধনহারা। আমাদের ছেলেবেলায় চট্টগ্রামের আমার ইছামতি গ্রামে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কখনও কখনও একটানা ছয়-সাত দিন বৃষ্টি হয়ে বান হতো। বান হতে পাঁচ দিন, থাকত তিন দিন, নেমে যেত ওই দিন তিনেকে। সে কি বৃষ্টি! তখন কী উল্লাস মনে। বান মানে তখন আমার আনন্দ। কলেজে পড়ার সময় নৌকো নিয়ে ঘর পাহাড়া দিতাম। গুমাই বিলে যেতাম নৌকো নিয়ে। আমার গল্প উপন্যাসে এর কিছু পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছি। আর এখন আরও গভীর বিশ্বাসী হয়েছি- বান মঙ্গলময়, কল্যাণকর। ক্ষতির চেয়ে উপকার বেশি করে। আর বান তো প্রকৃতির সহচর বা সন্তান। আবার কিছু কিছু বানের জন্য মানুষই দায়ী। কর্ণফুলী ও ইছামতি নদীর ভাঙন ও বানের কারণে আমাদের সুবিশাল ভিটে ভেঙে নদীতে মিশে গেছে। আমরা চলে গেছি ছোট্ট নতুন ভিটেয়। হাঁসফাঁস করে আমাদের মন। কুঁকড়ে থাকি অল্প জায়গায়। তবুও আমি নদী ভালোবাসি, বান ভালোবাসি। আমাদের গ্রামের দুটি পাড়া নিশ্চিহ্ন। আমাদের অন্তত চার একর জমি ভাঙনের গ্রাসে উধাও। আমার ছেলেবেলা ও প্রথম যৌবনের ভালোবাসা গ্রাস করে নিয়েছে প্রকৃতি। প্রকৃতি আমাদের ওপর আক্রোশবশত নয় মানুষের কারণে প্রকৃতির এ ভয়াবহতা হয়তো। তবে এখনও পর্যন্ত আবহবিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে গেছে বলে একবাক্যে মানেন না। তারপরও বলব, মানুষ প্রকৃতি ছাড়া বাঁচতে পারে না। প্রকৃতি বাঁচতে পারে মানুষ ছাড়া।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও নিসর্গী

মাস্টারি বিডি ডটকম । ঢাকা । ০৩ এপ্রিল ২০১৭ । ২০ চৈত্র ১৪২৩

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

12 7 2026 222

মাঝপথ থেকে ফেরি ঘুরিয়ে আনলেন এমপি হান্নান মাসউদ

রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | মাসস নোয়াখালীর হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা …

Leave a Reply

Your email address will not be published.