Home / কৃষি / ফলবে রাশি রাশি রসুন, ঘটবে শ্বেত বিপ্লব…
nator+garlic+produce+mbd

ফলবে রাশি রাশি রসুন, ঘটবে শ্বেত বিপ্লব…

মাস্টারি বিডি ডটকম ।
নাটোর । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

নাটোর জেলায় চলতি রবি মৌসুমে ২৫ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে রসুন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্যে রসুনের কোয়া ছড়ানো এবং ঐসব রসুনের কোয়া বুনতে নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণে গ্রামীণ জনপদে এখন চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। লক্ষ্যমাত্রার জমি আবাদে নিয়োজিত শ্রমের মোট আর্থিক মূল্য ১১৫ কোটি টাকা।

নাটোরে বিনা চাষে রসুন উৎপাদন হয়। নাটোরে রসুনের আবাদি জমির প্রায় পুরোটাই বিনা চাষের রসুন। ১৯৯৪-৯৫ সালে জেলার সীমান্তবর্তী বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার কৃষকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে বিনা চাষে রসুন আবাদ করেন। গুরুদাসপুর উপজেলার কাছিকাটা এলাকার কৃষক জেহের আলী কার্তিক মাসে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে রসুনের কোয়া বুনে বিনা চাষে রসুন উৎপাদনের সূত্রপাত করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে জমি চাষ করে রসুন লাগানো হলেও এ পদ্ধতিতে রসুন আবাদে জমি চাষ করতে হয় না, সেচও লাগে না। আগাছা থাকে কম এবং সারের ব্যবহার খুবই কম। উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের পরিমাণ বেশী হওয়ায় এ পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রসার ঘটে জেলার অন্যসব উপজেলা ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে।

garlic+nator+mbd-f

জানা গেছে, নাটোর জেলার বেশিরভাগ রসুন উৎপাদিত হয় গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলায়। এসব এলাকাসহ সর্বত্র কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন মাঠে রসুন বুনতে। এ কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। সিংড়া উপজেলার ধুলিয়াডাঙ্গা এলাকার প্রায় একশ’ বিঘা জমিতে কৃষকরা রসুন চাষ করছেন।

রসুন চাষে কর্মরত রহিমা বিবি বলেন, পুরুষদের মজুরী সাড়ে তিনশ’ টাকা হলেও আমরা দিনপ্রতি আড়াইশ’ টাকা পাই। একবিঘা জমি বুনতে ১৫ থেকে ১৬ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় বলে জানান কৃষক আনসার আলী। মাঠজুড়ে একদিকে চলছে রসুন বোনা, অন্যদিকে যুগপৎভাবে চলছে বোনা রসুনকে ধানের বিচালী দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কাজ। বিচালী ঢাকা জমিন থেকে বেরিয়ে আসবে রসুন গাছের সবুজ অঙ্কুরোদগম, ফলবে রাশি রাশি রসুন, ঘটবে শ্বেত বিপ্লব !

মাঠের মত কৃষক পরিবারের বাড়িতেও একই রকম ব্যস্ততা। বাড়ির সকল সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে মেয়েরা মেতে উঠেছেন রসুনের কোয়া ছড়ানোর কাজে। যেন এ কাজে তাদেরই পারদর্শিতা বেশি। বড় সাঁঐল গ্রামের কৃষক বধূ রেবেকা ইসলাম জানান, এ কাজে বাড়ির সদস্য ছাড়াও মহিলা শ্রমিক নেয়া হয়, এক মণ রসুনের কোয়া ছড়াতে পারিশ্রমিক তিনশ’ টাকা।

garlic+nator+mbd

লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২৫ হাজার ৭৯৫ হেক্টর অর্থাৎ এক লাখ ৯৩ হাজার ৪৬২ বিঘা জমির রসুন বুনতে মোট ২৯ লাখ এক হাজার ৯৩৭ জন শ্রমিকের তিন-চতুর্থাংশ পুরুষ হলে, তাদের মোট সংখ্যা ২১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫২ জন এবং জনপ্রতি ৩৫০ টাকা হিসেবে তাদের সমষ্টিক পারিশ্রমিক ৭৬ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। অন্যদিকে, রসুন বুনতে কর্মরত এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ৭ লাখ ২৫ হাজার নারী শ্রমিকের মোট পারিশ্রমিক ২০ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা।

পাশাপাশি, জমিতে মোট প্রয়োজনীয় ২৭ টন বীজ ছড়াতে প্রায় সাত লাখ নারী শ্রমিকের মোট পারিশ্রমিক মণ প্রতি ৩০০ টাকা হিসেবে ১৮ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে এই কর্মযজ্ঞে মোট শ্রমের আর্থিক মূল্যমান দাড়াচ্ছে ১১৪ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা।

বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইল গ্রামের রসুন চাষি তোফাজ্জল হোসেন চলতি মৌসুমে ১০ বিঘা জমিতে রসুন আবাদ করছেন। তিনি বলেন, বন্যার পানি নামতে দেরী হওয়ায় রসুন আবাদে কিছুটা দেরী হলেও অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করায় রসুন বীজের অঙ্কুরোদগম ভাল হচ্ছে, আশাকরি আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে, ফলনও ভালো হবে।।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় ২৫ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে রসূন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বড়াইগ্রাম উপজেলায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৪৫ হেক্টর, গুরুদাসপুর উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টর, নাটোর সদর উপজেলায় ১ হাজার হেক্টর, সিংড়া উপজেলায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর, লালপুর উপজেলায় ৩৫০ হেক্টর, বাগাতিপাড়া উপজেলায় ২৫০ হেক্টর এবং নলডাঙ্গা উপজেলায় ৮৫০ হেক্টর।

garlic+mbd
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে জেলায় রসুনের আবাদি জমির পরিধি ও উৎপাদন উভয়ই ক্রমশঃ বেড়েছে। ২০১২ সালে ১৪ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে রসুন আবাদ করে ফলন পাওয়া গিয়েছিল ১ লক্ষ ১১ হাজার ৪৩৮ টন। ২০১৩ সালে ১৭ হাজার ৮৪০ হেক্টর আবাদি জমি থেকে ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৫৮৪ টন এবং ২০১৪ সালে ১৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমি থেকে ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৩৩১ টন রসুন পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৫ সালে ২০ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৯২৬ টন এবং গত বছর ২৫ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমি থেকে দুই লাখ টন ফলন পাওয়া যায়। আশা করা হচ্ছে চলতি বছর ফলন হবে আশাতীত।

বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি অফিসার ইকবাল আহমেদ বলেন, বিগত দুই দশকে নাটোরে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈচিত্রকরণ হয়েছে। কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃষি বিভাগের নতুন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে প্রচলিত শস্যের বাইরে কৃষকরা অপ্রচলিত কিন্তু লাভজনক শস্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন। এক্ষেত্রে রসুন অগ্রগামী শস্য। বর্তমানে রসুন উপজেলার সবচেয়ে লাভজনক শস্য।

garlic+nator+mbd-2

উপজেলা কৃষি অফিসার আরও বলেন, অনুকূল আবহাওয়া, মানসম্মত বীজের সহজলভ্যতা, সারের পরিমিত ও আদর্শ বাবহারের পাশাপাশি কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও তদারকিতে রসুনের আশাতীত ফলন হবে। তিনি বলেন, বাজারে কৃষকরা রসুনের প্রত্যাশিত দাম পেলে একসময় রসুন এ এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হবে। বাসস

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

14 10 25 2

নদীর চরে লাউ শাক চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

ঢাকা, মঙ্গলবার ১৪ অক্টোবর ২০২৫ মাসস কুমিল্লার গোমতী নদীর বালুচর এখন যেন সবুজের সমারোহে ভরপুর। দূর …

Leave a Reply

Your email address will not be published.