মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ৩০ মে ২০১৭ । ১৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৪
উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ সকাল ৬ টায় কুতুবদিয়ার নিকট দিয়ে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে।
আজ মঙ্গলবার আবহাওয়ার এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়ের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরসমূহকে ১০ (দশ) নম্বর মহাবিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ (দশ) নম্বর মহাবিপদসংকেতের আওতায় থাকবে।
মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৮ (আট) নম্বর মহাবিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ৮ (আট) নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ অতিক্রমকালে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৮৯ থেকে ১১৭ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়টি কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের এর মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় মোরার সর্বশেষ তথ্যাবলি…
ঘণ্টায় একশ কিলোমিটারের বেশি গতির বাতাস নিয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোরা।
* বাংলাদেশ অতিক্রম : মঙ্গলবার ভোর ৬ টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি কুতুবদিয়ার কাছ দিয়ে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম শুরু করে এবং ক্রমশ উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
* শক্তি : উপূকলে আঘাত হানার সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি ছিল। তবে ভোরে টেকনাফে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার।
* অবস্থান : ঘূর্ণিঝড় মোরা উপকূল অতিক্রম করার ঘণ্টা পাঁচেক পর এর মোটামুটি ২০০ কিলোমিটার ব্যাসের এই ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রস্থল পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসে। বেলা ১২ টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ছাড়াও ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, নোয়াখালী ও চাঁদপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল এর বিস্তার।
* সংকেত : চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ১০ নম্বর এবং পায়রা ও মোংলা বন্দরকে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। উপকূলীয় এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি চলতে পারে আরও অন্তত ১২ ঘণ্টা।

* ক্ষয়ক্ষতি :
** প্রাথমিকভাবে কুতুবদিয়া, কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর এসেছে। এর মধ্যে কক্সবাজার পৌর এলাকাতেই সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানিয়েছেন।
** ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে বহু গাছ। সড়কে গাছ পড়ে কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগও বিঘ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ।
** ঝড়ের কারণে কোথাও প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও কক্সবাজার শহরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। আতঙ্কে হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরীর ধারণা।
** উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে। তবে ভাটার সময় ঝড় উপকূল অতিক্রম শুরু করায় জলোচ্ছ্বাস ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেনি।
* সতর্কতা :
** মোরার প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৃষ্টি চলছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে চলছে ভারি বর্ষণ।
** উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলে আভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া অফিস।
** বুয়েটের ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বলছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে মঙ্গলবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় ১২৮ মিলিমিটার থেকে ২৫৬ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে।
** অতি ভারি বর্ষণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসেরও আশঙ্কা থাকে।
** সাগর উত্তাল থাকায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার এবং সমুদ্রগামী জাহাজকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে।

* প্রভাব :
** খারাপ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে সোমবার সকালেই মালামাল খালাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারির পর সোমবার সন্ধ্যা থেকে বন্দরের সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
** চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলো থেকে ২৪টি বড় আকারের পণ্যবাহী জাহাজ (মাদার ভেসেল) সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বহির্নোঙরে। ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১২৭টি জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করছে।
** মঙ্গলবার সকাল থেকে চট্টগ্রামে শাহ আমানত ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠা-নামাও বন্ধ রাখা হয়েছে।
** দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সোমবার বিকাল থেকে সারা দেশে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রেখেছে বিআইডব্লিউটিএ।
** কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সব স্কুল-কলেজ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গলবারের সব ক্লাস-পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
* উদ্ধার ও ত্রাণ :
** দেশের ১৯ জেলার ১৪৭টি উপজেলার ১৩ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা উপকূলীয় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত; সেখানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বসবাস।
** এর মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল ও পিরোজপুর- এই ১০ জেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে।
** ঝুঁকিপূর্ণ এই দশ জেলার ২৫ লাখেরও বেশি লোকের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত উপজেলাগুলোর তিন লাখের বেশি মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
** উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটির (সিপিপি) ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবী ছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, রোভার স্কাউট ও আনসার ভিডিপির কর্মীরা এই দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছেন।
** সম্ভাব্য জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর সব চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে মেডিকেল টিম; খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।

* মোরা :
** গত ২৬ মে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার পর ২৮ মে সকালে তা নিম্নচাপে এবং মধ্যরাতে ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। সোমবার সন্ধ্যায় তা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।
** এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আট দেশের আবহাওয়া দপ্তর ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেলের তালিকা থেকে ক্রম অনুসারে ঠিক হয়েছে এবারের ঘূর্ণিঝড়ের নাম। মোরা নামটি প্রস্তাব করেছিল থাইল্যান্ড।
সূত্র : বাসস ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম