সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ । মাসস
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক চাকরিজীবীর মাসিক বিদ্যুৎ বিল সাধারণত ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে থাকে।
মে মাসেও ১ হাজার ৬০০ টাকার মতো বিল আসে, কিন্তু জুনে সেটি এক লাফে গিয়ে ঠেকে প্রায় ৭ হাজার টাকায়।
একসঙ্গে এত টাকা বিল দিতে গিয়ে পরিবারের অন্যদের সহায়তা নিতে হচ্ছে জানিয়ে ওই গ্রাহকের ছেলে বলছিলেন, টাকা জোগাড় করে বিল দেওয়া গেলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ জুলাই মাসেও তার মিটারে ৫০০ ইউনিটের বেশি উঠে গেছে।
ঢাকার সেগুনবাগিচার বহুতল ভবনের একজন বাসিন্দার অভিযোগ, তার মিটার পরীক্ষা করে কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি, অথচ ইউনিট দ্রুত বাড়ছে। বিল দেওয়ার শেষ সময় চলে আসায় তাকে টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ অফিস থেকে বলা হয়েছে, সমস্যা ধরা পড়লে পরে সমন্বয় করা হবে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার এক গ্রাহকের এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল গড়ে ৯০ ইউনিট করে। জুনে তা হয় ১০৫ ইউনিট; আর জুলাইয়ে উঠে গেছে ১৭০ ইউনিটে।
এভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে জুনের বিদ্যুৎ বিল কয়েক গুণ হওয়ার অভিযোগ আসছে। কেউ বলছেন, নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র না বসালেও ইউনিট অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, নিয়মিত মিটারের রিডিং না নিয়ে অনুমানের ভিত্তিতে বিল তৈরি করা হচ্ছে।
বাড়তি বিলে নাকাল হয়ে নারায়ণগঞ্জে গ্রাহক সমাবেশ হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দল বেঁধে বিদ্যুৎ অফিসে গেছেন গ্রাহকরা। রাজশাহীতে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে দেওয়া হয়েছে স্মারকলিপি। ফেইসবুকেও আগের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বিল পাওয়ার কথা লিখেছেন অনেকে।
তবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমের দাবি, ব্যাপকভাবে অতিরিক্ত বিল করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে ‘দু-একটি’ ভুল থাকতে পারে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, জুনের বিল নিয়ে অভিযোগ তদন্তে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কমিটি করা হয়নি। প্রতিটি বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিকে নিজ নিজ এলাকার অভিযোগ যাচাই করতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রত্যেক ইউটিলিটি আলাদাভাবে বিষয়গুলো দেখছে। অধিকাংশ অভিযোগ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যেভাবে অনেক বেশি বা অতিরিক্ত বিল করার কথা বলা হচ্ছে, তেমন পাওয়া যায়নি।”
দেড় হাজার টাকার পর সাত হাজার
গফরগাঁওয়ের ওই গ্রাহকের ছেলে ঢাকায় চাকরি করেন। তার পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকে। পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের বাড়িতে নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র বসানো হয়নি। বিল হাতে পাওয়ার পর মিটারের বর্তমান রিডিং ভিডিও করে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে দেখান তিনি।
তার ভাষ্য, সেখান থেকে বলা হয়, বিলের সঙ্গে মিটারের রিডিংয়ের মিল রয়েছে।
এরপর বাড়ির সব বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করে মিটার পরীক্ষা করেন ওই গ্রাহক।
তিনি বলেন, সব লোড বন্ধ থাকার সময় ইউনিট বাড়েনি। পরে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করে আট ইউনিট ব্যবহারের হিসাব পান।
তিনি বলছিলেন, “দৈনিক ১০ ইউনিট ধরলেও ৩০ দিনে ৩০০ ইউনিটের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমার বিলে প্রায় ৬০০ ইউনিট দেখানো হয়েছে।”
চলতি মাসেও মিটারে ৫০০ ইউনিটের বেশি উঠেছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় অফিস থেকে তাকে আগের বিল পরিশোধ করে মিটার পরিবর্তনের আবেদন করতে বলা হয়েছে।
“সবাই মিলে বিলটা দেওয়া যায়, কিন্তু এটা তো সমাধান নয়। আবার এমন বিল এলে কী হবে?”, বলেন তিনি।
ত্রুটি পাওয়া যায়নি, ইউনিট তবু বাড়ছে
ঢাকার সেগুনবাগিচার একটি বহুতল ভবনের এক বাসিন্দাও মিটারে দ্রুত ইউনিট বাড়ার অভিযোগ করেছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিস মিটার পরীক্ষা করলেও কোনো ত্রুটি পায়নি। কিন্তু মিটারে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত ইউনিট বাড়ছে।
ওই ভবনে একটি মূল মিটারের অধীনে একাধিক সাবমিটার রয়েছে। তার ভাষ্য, ভবনের মোট ব্যবহারের হিসাব ঠিক থাকলেও কোনো কোনো সাবমিটারে ইউনিট বেড়েছে, আবার কোনো কোনো মিটারে কমেছে।
সমস্যাটি ভবনের অভ্যন্তরীণ সংযোগে নাকি বিতরণ ব্যবস্থায়, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
বিল পরিশোধের শেষ সময় চলে আসায় তাকে টাকা দিয়ে দিতে হয়েছে। পরে সমস্যার সমাধান হলে টাকা সমন্বয় করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
নেসকোর এলাকায় স্মারকলিপি, কর্তৃপক্ষ বলছে অভিযোগ ব্যাপক নয়
অতিরিক্ত বিল প্রত্যাহার, ভুল বিল সংশোধন এবং গ্রাহক হয়রানি বন্ধের দাবিতে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এতে বিল পুনঃযাচাইসহ সাত দফা দাবি জানানো হয়। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি-নেসকো।
কোম্পানিটির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মো. মখলেসুর রহমান বলেছেন, নেসকোর আওতায় ব্যাপকভাবে অস্বাভাবিক বিল আসার তথ্য তাদের কাছে নেই।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি থাকতে পারে। আমরা সেগুলো দেখছি। কিন্তু ব্যাপকভাবে বিল বাড়ানো হয়েছে, এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই।”
নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় কিছু গ্রাহকের বিল বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যবহৃত ইউনিট কয়েক গুণ বাড়ানোর মতো বিস্তৃত অভিযোগের তথ্য তিনি পাননি।
মিটার রিডিংয়ে ভুল হতে পারে মন্তব্য করে মখলেসুর রহমান বলেন, নির্দিষ্ট গ্রাহকের নাম, মিটার নম্বর ও বিলের তথ্য পাওয়া গেলে তা পরীক্ষা করা সম্ভব।
জুন ও জুলাইয়ে মোট কতটি বিলসংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সেই তথ্য নিতে হবে।
ধর্মপাশায় ১০৫ থেকে ১৭০ ইউনিট
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার একজন গ্রাহক জানান, এপ্রিল ও মে মাসে তার বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল ৯০ ইউনিট করে। জুনে তা বেড়ে হয় ১০৫ ইউনিট, আর জুলাইয়ে দেখানো হয়েছে ১৭০ ইউনিট। তার অভিযোগ, স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের মিটার রিডাররা নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে রিডিং নেন না। অনেক ক্ষেত্রে অনুমানের ভিত্তিতে বিল তৈরি করা হয়।
বিদ্যুৎ সংযোগ বা বিলের সমস্যা নিয়ে অফিসে গেলে গ্রাহকরা যথাযথ সেবা পান না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জে গ্রাহক সমাবেশ, অভিযোগ হাজার ছাড়ানোর দাবি
নারায়ণগঞ্জে জুনের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে ২১ জুলাই নগরীর কিল্লারপুরে ডিপিডিসি কার্যালয়ের সামনে ‘গ্রাহক সমাবেশ’ হয়।
‘নাগরিক অধিকার ফোরামের’ ব্যানারে হওয়া এ সমাবেশে অভিযোগ করা হয়, মে মাসের কয়েক দিনের ব্যবহার জুনের সঙ্গে যোগ হওয়ায় মোট ইউনিট বেড়েছে এবং অনেকে উচ্চতর ট্যারিফ ধাপে চলে গেছেন।
ফোরামের আহ্বায়ক আইনজীবী মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ওই সমাবেশে কয়েক হাজার গ্রাহক অংশ নেন। পরে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বিদ্যুতের দাম যে হারে বাড়ানো হয়েছে, অনেক গ্রাহকের বিল তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে।
তিনি বলছেন, “গ্রাহকদের আগের ও বর্তমান বিলের কপি মিলিয়ে আমরা দেখেছি, কারও বিল ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলো ডিপিডিসির কাছে পাঠানো হয়েছে।”
মাহবুবুর রহমান বলেন, সাধারণত তার বাসায় মাসে এক হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা বিল আসে। সর্বশেষ বিল এসেছে সাড়ে ৪ হাজার টাকার মতো।
তার ভাষ্য, অভিযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে যাওয়া কিছু গ্রাহকের বিল কমানো হয়েছে। তবে কোন নিয়মে কত টাকা কমানো হচ্ছে, তা গ্রাহকদের জানানো হয়নি।
ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জ দক্ষিণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. কামাল হোসেন বলেছেন, জুন ও জুলাইয়ের বিল নিয়ে সমস্যা এড়াতে তার আওতাধীন এলাকায় বিল জারির আগেই অস্বাভাবিক মনে হওয়া বিলের তালিকা করা হয়েছিল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “যেসব বিলে ব্যবহার বা টাকার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি মনে হয়েছে, সেগুলো আমাদের কর্মকর্তারা যাচাই করেছেন। নিশ্চিত হওয়ার পর বিল জারি করা হয়েছে। আমার এলাকায় অভিযোগ খুব বেশি আসেনি।”
নিজের বাসার বিলও আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি এসেছিল জানিয়ে কামাল হোসেন বলেন, মে মাসে তার বিল ছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা, জুনে তা বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকা হয়।
তিনি বলেন, “আমার পরিবারও প্রথমে বিল নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। আমি নিজে মিটার পরীক্ষা করেছি। মিটার ঠিক ছিল। পরে দেখি, জুনে গরম বেশি ছিল এবং বাসায় বিদ্যুতের ব্যবহারও বেড়েছিল।”
অভিযোগের পর গ্রাহকদের বিল সমন্বয় করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো গ্রাহক বর্তমান মিটার রিডিংয়ের ছবি বা অন্য প্রমাণ নিয়ে এলে তা বিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
তার ভাষ্য, রিডিং বা বিল তৈরিতে ভুল পাওয়া গেলে সংশোধন করা হয়। তবে প্রকৃত ব্যবহারের কারণে বিল বাড়লে তা কমানোর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “মিটারের রিডিং গ্রাহকের ব্যবহারের প্রমাণ। সেটি বিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। ভুল থাকলে সংশোধন করা হবে। আর ব্যবহার বেশি হওয়ার কারণে বিল বাড়লে সেটিও গ্রাহককে বুঝিয়ে বলা হয়।”
রায়পুরে বিল সংশোধনে আঞ্চলিক কার্যালয়ে ভিড়
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পুনঃযাচাই ও সংশোধনের দাবিতে ২৬ জুলাই পল্লী বিদ্যুতের আঞ্চলিক কার্যালয়ে যান শতাধিক গ্রাহক।
তাদের অভিযোগ ছিল, আগের মাসের তুলনায় জুনের বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কোনো কোনো গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিটও আগের মাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দেখানো হয়েছে।
তবে লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রায়পুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মোশারেফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার কার্যালয়ে ২০ থেকে ২৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের বাড়িতে কর্মী পাঠিয়ে মিটার ও রিডিং পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলছেন, “যারা অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, তাদের সবার বাসায় লোক পাঠিয়েছি। মিটারের বর্তমান রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের রিডিং মিলিয়ে দেখা হয়েছে।”
তার দাবি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের মিল পাওয়া গেছে। একজন গ্রাহকের মিটারে সমস্যা থাকার অভিযোগ পাওয়ায় সেটি পরিবর্তন করে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ফেইসবুকে দুই-তিনগুণ বিলের অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জুনের বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফেইসবুকে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এম এইচ কবির লিখেছেন, মে মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৩ হাজার ১১৯ টাকা। জুনে তা বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৪ টাকা।
সাজিদ রায়হান নামে একজন লিখেছেন, তার বাসায় সাধারণত ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে বিল আসে। এবার এসেছে ১০ হাজার টাকা।
গাজী মিরাজের ভাষ্য, সাধারণত তার বিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকে। জুনে তাকে ৭ হাজার ৭৭৯ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে।
দেওয়ান রুমি নামে আরেক গ্রাহক লিখেছেন, তার সাধারণত সাড়ে ৬ হাজার টাকার মতো বিল আসে। জুনে এসেছে সাড়ে ১২ হাজার টাকা।
কোথাও মে মাসের ‘রিডিং’ নেওয়া হয় আগেই!
পরিচয় প্রকাশ না করে একটি বিতরণ সংস্থার মিটার রিডিং ও বিলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঈদের ছুটির কারণে তার কর্ম এলাকার মে মাসের রিডিং স্বাভাবিক সময়ের কয়েক দিন আগে নেওয়া হয়েছিল।
সাধারণত মাসের শেষ দিকে রিডিং নেওয়া হলেও সেবার ২৫ ও ২৬ মের মধ্যে রিডিং নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, পরের রিডিং স্বাভাবিক সময়ে নেওয়ায় জুনের বিলে প্রায় পাঁচ দিনের অতিরিক্ত ব্যবহার যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে জুন থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় বিল আরও বেড়েছে।
নতুন ট্যারিফে কতটা বাড়ে
জুন থেকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সংশোধিত আদেশে গৃহস্থালি গ্রাহকের প্রথম দুটি ধাপের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিটের মূল্য প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের মূল্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা রাখা হয়েছে। পরের ধাপগুলোর দাম বাড়ানো হয়েছে।
পুরনো ও নতুন মূল্যহার ধরে শুধু এনার্জি চার্জ হিসাব করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম দেখেছে, ২০০ ইউনিট ব্যবহারে বিল ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪৫৭ টাকা হয়। বৃদ্ধির হার প্রায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশ।
৪০০ ইউনিটে ২ হাজার ৮৫৫ টাকা ৫০ পয়সার বিল বেড়ে হয় ৩ হাজার ৩২৯ টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ৬০০ ইউনিটে ৫ হাজার ৩৮৯ টাকা ৫০ পয়সার বিল বেড়ে হয় ৬ হাজার ৩৩১ টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই হিসাবে ভ্যাট, মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ বা বকেয়া ধরা হয়নি।
জুনে গরম ও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছিল
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাসিক পর্যালোচনায় মে মাসে দেশের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল। জুনে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি বেশি ছিল। মে মাসে দেশের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, জুনে ছিল ৩৮ দশমিক ৬।
পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেছিলেন, জুনে তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছিল।
তিনি বলেন, “আগে যেখানে সিস্টেমের লোড সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো ছিল, এবার তা সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠেছে। এই বিদ্যুৎ গ্রাহকরাই ব্যবহার করেছেন। ফলে বিলও বাড়বে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা ডেসকোর তিন থেকে চারটি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বাসায় গিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানান পিডিবি চেয়ারম্যান।
মিটার, ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যাচাইয়ের পর বিলের সঙ্গে প্রকৃত ব্যবহারের মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
সিলেট অঞ্চলের তিন থেকে চারটি অভিযোগও সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রকৌশলীকে দিয়ে তদন্ত করিয়েছেন বলে জানান পিডিবি চেয়ারম্যান। সেগুলোতেও অতিরিক্ত বিল করার প্রমাণ মেলেনি বলে তার ভাষ্য।
বিল যাচাইয়ের নিয়ম কী বলে
পিডিবির বাণিজ্যিক পরিচালন পদ্ধতিতে কম্পিউটার সেন্টারে বিল তৈরির পর তা চূড়ান্ত করার আগে ‘বিলিং এক্সেপশন’ বিবরণী প্রস্তুতের কথা বলা হয়েছে। অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী বিলের তালিকা সংশ্লিষ্ট বিক্রয় ও বিতরণ দপ্তরে পাঠিয়ে পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশনা রয়েছে।
বিল ছাপিয়ে দপ্তরে পৌঁছানোর পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তত ১০ শতাংশ বিল পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে। অসংগতি পাওয়া গেলে কম্পিউটার সেন্টারের মাধ্যমে তা সংশোধন করতে হবে। এক মাসে মিটার রিডিং নেওয়া সম্ভব না হলে আগের ছয় মাসের গড় ব্যবহারের ভিত্তিতে আনুমানিক বিল করা যাবে। তবে টানা দুই মাসের বেশি এভাবে বিল দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ বিধিমালা ২০২০ অনুযায়ী, কোনো বিলে আপত্তি থাকলে দাবিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দিয়ে লিখিত অভিযোগ করা যায়।
স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করার কথা। সংশোধিত বিলকে নতুন বিল হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং তাতে বিলম্ব মাশুল বা সারচার্জ নেওয়া যাবে না।
কেন্দ্রীয় কমিটি হয়নি
জুনের বিল নিয়ে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর ২৯ জুন বিদ্যুৎ বিভাগ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে। ২ জুলাই বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক ও বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের নিয়ে পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে করণিক বা কারিগরি ভুল দ্রুত সংশোধন এবং অসদুপায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, “কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কমিটি হয়নি। প্রতিটি সংস্থা অভিযোগ পেলে আলাদাভাবে যাচাই করছে।”
বিদ্যুৎ বিভাগের ১৬৯৯৯ নম্বরের সমন্বিত গ্রাহকসেবার সঙ্গে ছয় বিতরণ সংস্থার অভিযোগ ব্যবস্থাপনা যুক্ত রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের বিবরণ কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে জুন ও জুলাইয়ে মোট কতটি বিলসংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে, কতটি বিল সংশোধন করা হয়েছে এবং সংশোধনের পর মোট কত টাকা কমেছে, তার সমন্বিত হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
পিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, “একটি বিলে কমবেশি থাকতে পারে। কিন্তু গণহারে অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে, এমন তথ্য আমরা পাইনি।”
সূত্র: bdnews24
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম




