মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | মাসস
থাইল্যান্ডে প্রতি ৩ জনে একটি মোটরসাইকেল বা স্কুটার, আর আমাদের দেশে প্রতি ৩৪ জনে একটি। আমরা চাই বা না চাই, আমাদের ভবিষ্যৎও দুই চাকার। কিন্তু ইউরোপের ‘ভিশন জিরো’ নীতি কিংবা দুই চাকার জন্য আলাদা লেনের মতো টেকসই ব্যবস্থা না করে আমরা কি শুধু কোটি কোটি মানুষের হাতে চাবি ধরিয়ে দিচ্ছি? বাহন সস্তা করতে গিয়ে জীবনের মূল্য যেন সস্তা না হয়ে যায়।
থাইল্যান্ডের সড়কচিত্র আর আমাদের সড়কচিত্র পাশাপাশি রাখলে একটি দারুণ সত্য বেরিয়ে আসে। থাইল্যান্ডে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল-স্কুটার প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ, মোটামুটি প্রতি তিনজনে একটি। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার চিত্রও কাছাকাছি। পক্ষান্তরে আমাদের ১৭ কোটি মানুষের দেশে বিআরটিএর সর্বশেষ হিসাবে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল প্রায় ৫০ লাখ, প্রতি চৌত্রিশ জনে একটি। সত্যটা হলো, আমাদের ভবিষ্যৎও দুই চাকার; আমরা চাই বা না চাই। পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা বলে, আগে বাড়ে মোটরসাইকেল, পরে জনপ্রিয় হয় স্কুটার। আমরা এখন ঠিক সেই দ্বিতীয় ধাপের দরজায় দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাই, দরজাটা আমরা প্রস্তুত হয়ে খুলব, না হুড়মুড় করে?
স্কুটারের পক্ষে যুক্তিগুলো বেশ জোরালো। আমাদের শহরে ভদ্রস্থ গণপরিবহন এখনো সোনার হরিণ। ঠাসাঠাসি বাসে ঝুলে যে মানুষটি রোজ অফিসে যান, তার মনে প্রতিদিন সকালে একটা অসহায়ত্ব জাগে, এই শহরে তার নিজের বলে কোনো বাহন নেই। পক্ষান্তরে স্কুটারে ক্লাচ নেই, গিয়ার বদলানোর কসরত নেই, ওজনে হালকা। স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত যে-কেউ কয়েক দিনের চেষ্টায় অনায়াসে চালাতে পারবেন। বিশেষ করে নারীদের জন্য এই সহজতা চলাচলের দরজা খুলে দিচ্ছে, আর যে নারী নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারেন, কাজের জগৎও তার জন্য খোলে। জায়গার হিসাবেও স্কুটার যুতসই বাহন, একটা প্রাইভেট কার চলতে ও পার্ক করতে যে জায়গা নেয়, তাতে পাঁচ-ছয়টা স্কুটার অনায়াসে ধরে যায়, অথচ দুটোই হয়তো বহন করছে একজন কিংবা দুজন করে মানুষ।
অর্থনীতির হিসাবটাও মন্দ নয়। সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় স্কুটার আমদানি করলে শুল্ক-করের ভার প্রায় ১৫৩ শতাংশ; দেশে এনে সংযোজন করলে ৮৯; আর চেসিস-যন্ত্রাংশ দেশে বানালে ৩০ থেকে ৪২। অর্থাৎ যত বেশি কাজ দেশে, দাম তত নাগালে। পথটা মোটরসাইকেল শিল্প দেখিয়েই দিয়েছে, ৭-৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজারের ৯৫ শতাংশ যান এখন দেশের কারখানায় তৈরি বা সংযোজিত হয়, রুটিরুজি জুটছে প্রায় দুই লাখ মানুষের, সরকার রাজস্ব পাচ্ছে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। উপরি পাওনা, নতুন বাজেটে ১৫০ সিসির ওপরে টিআইএন বাধ্যতামূলক হলেও স্কুটারের প্রায় পুরো বহরই ৫০ থেকে ১২৫ সিসির ঘরে। হালকা কর, কম ঝক্কি।
কিন্তু এই সুখের হিসাবের পাশে আরেকটা খাতা আছে, যেটা আমরা খুলে দেখতে চাই না। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গত বছর সড়কে প্রাণ গেছে ৯ হাজার ১১১ জনের, যার ৩৮ শতাংশের বেশি, প্রায় ৩ হাজার প্রাণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। নিহতদের চার ভাগের তিন ভাগের বয়স ১৪ থেকে ৪৫; অর্থাৎ সংসারগুলো হারাচ্ছে তাদের উপার্জনের হাতটাই। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের এক অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সেখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের ৬৫ শতাংশই মোটরসাইকেলের, চালক অথবা আরোহী।
কেন এমন হয়, তার একটা সূত্র বিআরটিএর নিজের খাতাতেই আছে। কয়েক বছর আগে তাদের হিসাবে দেখা গিয়েছিল, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল যখন ৩১ লাখ, বৈধ লাইসেন্সধারী চালক তখন মোটে সাড়ে ১৭ লাখ। বাকিরা চালাচ্ছেন শিখে নয়, সাহসে। উন্নত দেশগুলো আগে চালাতে শেখায়, তারপর হাতে চাবি দেয়। আমরা আগে চাবি ধরিয়ে দিই, শেখাটা ছেড়ে দিই ভাগ্যের হাতে। এরপরও আমরা নিরাপদ সড়ক চাই। এটা কখনোই সম্ভব নয়।
অথচ পৃথিবী এই সমস্যার সমাধান বহু আগেই ভেবে রেখেছে। সুইডেন ১৯৯৭ সালে সংসদে ‘ভিশন জিরো’ নীতি নিয়েছিল, যার মূলকথা, সড়কে একটি মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়, আর দুর্ঘটনা মানুষের পাপ নয়, বরঞ্চ নকশার এবং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। নেদারল্যান্ডস নব্বইয়ের দশকে এগিয়েছে ‘টেকসই নিরাপত্তা’র পথে, দ্রুতগতির ভারী যান আর ধীরগতির হালকা যানকে এক পথে মিশতে না দেওয়াই যার প্রথম শর্ত। এসব থেকে জন্ম নিয়েছে ‘সেফ সিস্টেম’ নামের পুরো একটি চিন্তাধারা। সেসবের কোনো ছোঁয়া আমাদের সড়কে লাগেনি। আমাদের দেশে কেউ যদি বলে, শহরের বড় সড়কে দুই চাকার জন্য আলাদা লেন চাই, সেটা শোনায় প্রায় আবদারের মতো। কেউ যদি বলে, সত্তর হাজার টাকার স্কুটারেও ভালো ব্রেক বাধ্যতামূলক হোক, উত্তর আসে, দাম বেড়ে যাবে। প্রাণের দামটা যে অনেক সস্তা!
তাই স্কুটারকে স্বাগত জানানোর আগে কয়েকটি আয়োজন সেরে রাখা জরুরি। প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স নয়, আর লাইসেন্স হোক ধাপে ধাপে, ছোট বাহনে দক্ষতা প্রমাণের আগে বড় বাইকের অনুমতি নয়। হেলমেট চালক ও আরোহী দুজনের জন্যই, কাগজে নয়, রাস্তায়। সস্তা স্কুটারেও মানসম্মত ব্রেক ও আলো হোক বাধ্যতামূলক, নিরাপত্তা যেন শুধু দামি বাইকের জন্য সীমাবদ্ধ না থেকে সবার জন্য সমান ভাবে নিশ্চিত হয়। শহরের বড় করিডরে দুই চাকার আলাদা লেন আর ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোর নতুন নকশাও এই আয়োজনেরই অংশ। শিল্পের জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি স্থির শুল্কনীতি, ১৫৩ থেকে ৮৯, ৮৯ থেকে ৩০-৪২ শতাংশের সিঁড়ি বেয়ে স্থানীয় উৎপাদনের দিকে; সঙ্গে বৈদ্যুতিক স্কুটারে বাড়তি উৎসাহ আর ডেলিভারি রাইডার ও নারী উদ্যোক্তার জন্য সহজ কিস্তির ঋণ। আর কোথায়, কখন, কেন দুর্ঘটনা ঘটছে, এই তিন প্রশ্নের জবাব রাখার মতো একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার ছাড়া এসবের কোনোটাই ঠিকঠাক হবে না।
সর্বশেষে বলতে চাই, সত্য হলো আমরা হয়তো বাহনকে সহজলভ্য করতে পেরেছি, কিন্তু পথকে নিরাপদ করতে পারিনি। বাহন সস্তা করতে গিয়ে যেন জীবনের মূল্যই কমিয়ে ফেলছি। এখন সময় এসেছে, স্কুটারের চাকার সঙ্গে যেন নিরাপত্তাও সমানভাবে ঘোরে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি।
সূত্র : বিডি নিউজ ২৪
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম