বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ । মাসস
গান হবে, শিল্পীরা মঞ্চে উঠবেন, দর্শক-শ্রোতা উপভোগ করবেন–এটাই ছিল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্বাভাবিক চিত্র। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে সেই স্বাভাবিকতার জায়গা দখল করে নিচ্ছে অনিশ্চয়তা। অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে ভাবতে হচ্ছে কেউ আপত্তি তুলবে কিনা, কোনো পক্ষ বিক্ষোভ করবে কিনা, শেষ মুহূর্তে প্রশাসন অনুমতি বাতিল করবে কিনা।
বিশেষ করে ‘তৌহিদী জনতা’, ‘ইমাম-ওলামা পরিষদ’ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন আয়োজন বন্ধের দাবি জানানোর ঘটনা সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোথাও কনসার্ট বাতিল হচ্ছে, কোথাও বাউলগানের আসর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে শিল্পী ও আয়োজকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের আতঙ্ক।
গত ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও গায়ক নোবেলের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্নের কথাও বলা হয়েছে। এর ঠিক আগের দিন, ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এবার কোনো বেসরকারি আয়োজক নয়, পুলিশের নিজস্ব আয়োজনই নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে।
বাউল গান থেকে নৌকাবাইচ নিয়ে আপত্তি
কনসার্টের বাইরেও গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই নানা চাপের মুখে। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা তার বড় উদাহরণ। বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও চেয়ার ভাঙচুরের পর পণ্ড হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী সেই আয়োজন। নেত্রকোনার মদনেও বাউলগানের একটি আয়োজন বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
দেশের জাতীয় এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মাসে শুধু ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধার তথ্য রয়েছে। ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে বাধার মুখে পড়েছে আরও ৩৬টি আয়োজন।
এই বাধার মুখে পড়ার ধারাবাহিকতায় এবার নৌকাবাইচ নিয়েও আপত্তি উঠেছে। সিলেটের বিয়ানীবাজারে ২৮ আগস্টের নির্ধারিত নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একটি পক্ষ। আয়োজনে জুয়া ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে দুই বছর বন্ধ থাকার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকাবাইচ শর্তসাপেক্ষে চালু করার অনুমতি দিয়েছে প্রশাসন। তবে বাইচ আয়োজনে উস্কানিমূলক কোনো কিছু করা যাবে না। বাইচ উপভোগকারীরা তাদের নৌকায় সাউন্ড সিস্টেম চালাতে পারবে না। বাদ্যযন্ত্র চালিয়ে নাচানাচিও করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে প্রশাসন।
আপত্তি উঠলেই কেন সব বন্ধ করা হচ্ছে?
কনসার্ট, মঞ্চনাটক, বাউল গানের আয়োজন কিংবা নৌকাবাইচ–সবই কেন আপত্তি ওঠামাত্রই স্থগিত করে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন শিল্পীরা।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, সংস্কৃতি অঙ্গনের কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকলে অনুষ্ঠান বন্ধ না করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। যে কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি উঠলেই বন্ধ করতে হবে কেন। আমাদের সংস্কৃতিচর্চা তো আবহমানকাল ধরেই চলে আসছে। সেটি কেন এখন বাধার মুখে পড়বে। সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হলে তো দেশের যুবসমাজ বিপথে যাবে। দেশও পিছিয়ে পড়বে।
বরেণ্য নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেন, সংস্কৃতিচর্চায় বাধা আমরা কোনো সময়ই কামনা করি না। এসব বাধা আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। আমরা চাই, সবাই যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজ নিজ সংস্কৃতিচর্চা করতে পারে, সে সুযোগ যেন অবারিত থাকে।
গেল বছর নানা বাধার মুখে মহানগর নাট্যোৎসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সামনে এনে ডিরেক্টরস গিল্ডের সাবেক সভাপতি নির্মাতা অনন্ত হীরা বলেন, আমরা মুক্ত পরিবেশে থিয়েটার করতে অভ্যস্ত। গেল বছর বাধার মুখে আমরা মহানগর নাট্যোৎসব বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। সে সময় সরকারের সাহায্য চেয়েও পাইনি। এ রকম ঘটনা সারাদেশেই ঘটছে। যেখানে কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানে একটি গোষ্ঠী সংস্কৃতিচর্চাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে; যা আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। আশা করি, বর্তমান সরকার এর একটা সুন্দর সমাধান দেবে।
ব্যান্ডশিল্পী হামিন আহমেদ মনে করেন, কোনো গোষ্ঠী আপত্তি করলেই প্রশাসনের দায়িত্ব অনুষ্ঠান বাতিল করা নয়; বরং শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করাই প্রশাসনের কাজ।
আসিফ আকবর সরকারের কাছে বিষয়টি দ্রুত পরিষ্কার করার দাবি জানিয়ে বলেন, দেশে গান-বাজনা হবে কিনা, তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। সংবিধানে নিষেধ থাকলে শিল্পীরা বিদেশ চলে যাবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘যে সরকারই থাকুক, আমার মুখ কখনও বন্ধ হবে না।’
ভয় থেকে আত্মসংকোচন
সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় হামলা দিয়ে আসে না। অনেক সময় হামলার ভয়ই যথেষ্ট। একজন আয়োজক ভাবেন, অনুষ্ঠান করলে সমস্যা হতে পারে। শিল্পী ভাবেন, দূরের জেলায় গিয়ে মঞ্চে ওঠা নিরাপদ তো? হলমালিক ভাবেন, অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতির দায় কে নেবে? প্রশাসনও কখনও সংঘাতের আশঙ্কায় পিছু হটে। এভাবেই আত্মসংকোচনের পথে হাঁটছে সংস্কৃতি অঙ্গন। আগামীতে তাই মঞ্চ না ভাঙলেও, পোস্টার না ছিঁড়লেও অজানা এক আতঙ্কে ক্রমাগত সংকোচন হচ্ছে সংস্কৃতিবিষয়ক আয়োজন।
সংস্কৃতি কারও একার নয়
বাংলাদেশের সংস্কৃতি কোনো একক ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পত্তি নয়। এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বহু শতাব্দীর সামাজিক মেলবন্ধনে। বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, মুর্শিদি, মারফতি, কীর্তন, গম্ভীরা, যাত্রা, পালাগান, কবিগান–সব মিলিয়েই বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়।
ইউনেস্কো ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বাউলগানকে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ সেই বাউলগানের আসরেই যদি শিল্পীকে ভয় নিয়ে গান গাইতে হয়, সেটি শুধু একজন শিল্পীর সংকট নয়– বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট।
একইভাবে একটি সিনেমা ভালো না লাগলে সেটি না দেখার অধিকার যেমন একজন দর্শকের আছে, তেমনি অন্য একজনের সেই সিনেমা দেখার অধিকারও রয়েছে। কোনো গান পছন্দ না হলে তা না শোনার স্বাধীনতা যেমন আছে, তেমনি অন্যের গান শোনার স্বাধীনতাও থাকতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আসকও বলেছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিন্নমত বা সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু ভয়ভীতি, জবরদস্তি, প্রচারণা কিংবা বেআইনি চাপ প্রয়োগ করে কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সব ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন অক্ষুণ্ন রাখা।
মতপার্থক্য থাকতেই পারে। আপত্তিও থাকতে পারে। কিন্তু আইন ভাঙলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া–দুটি এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত আইন মেনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম