মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | মাসস
রাতের খাবারের প্লেটে ভাত, পুঁইশাক আর মুরগির তরকারি। কয়েক লোকমা খাওয়ার পর তরকারির মধ্যে হঠাৎ দেখা যায় একটি কেঁচো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী রাফি হাওলাদারের সেই অভিজ্ঞতা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ক্যানটিনের খাবারে কেঁচো, ব্লেড, তেলাপোকা, কাঁকড়া ও নানা ধরনের পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে নিম্নমানের খাদ্যব্যবস্থা, দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির সংকট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাবারের মান নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা। ক্যানটিন পরিচালনাকারীরা বাজারদরের ঊর্ধ্বগতিকে দায়ী করলেও শিক্ষার্থীরা বলছেন, মূল সংকট তদারকি ও জবাবদিহির অভাব। তাঁদের অভিযোগ, এসব খাবার খেয়ে তাঁরা অসুস্থ হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে অপুষ্টির ঝুঁকিতেও পড়ছেন।
আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও পুষ্টিনীতির অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
৫ জুলাই শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান ক্যানটিনের তরকারিতে ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী। অভিযোগের পর হল সংসদ ক্যানটিনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিলেও কয়েক দিন পর আবার চালু হয়। চালুর পর ওই ক্যানটিনের খাবারে ২৩ জুলাই তেলাপোকা ও ২৫ জুলাই কেঁচো পাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
খাবারে একের পর এক অখাদ্য বস্তু
২১ জুলাই রাফি হাওলাদার শেখ মুজিবুর রহমান হলের পুরোনো ভবনের ক্যানটিনে তরকারির মধ্যে কেঁচো দেখতে পান।
রাফি বলেন, পুঁইশাক ও মুরগির তরকারিতে একটি অদ্ভুত পোকা দেখতে পান। পরে অন্য শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত করেন, সেটি একটি কেঁচো।
ব্লেড পাওয়ার ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির ধারণা, বস্তার সুতা কাটতে ব্যবহৃত একটি ব্লেড অসাবধানতাবশত রান্নার সময় খাবারে চলে যায়। ঘটনার দায় স্বীকার করায় ক্যানটিন কর্তৃপক্ষকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এস এম আরিফ মাহমুদ, অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ, জসীমউদ্দীন হল
এর আগে ৫ জুলাই শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান ক্যানটিনের তরকারিতে ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী। অভিযোগের পর হল সংসদ ক্যানটিনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিলেও কয়েক দিন পর আবার চালু হয়। চালুর পর ওই ক্যানটিনের খাবারে ২৩ জুলাই তেলাপোকা ও ২৫ জুলাই কেঁচো পাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
জসীমউদ্দীন হলের ক্যানটিনের খাবারেও ১৬ জুলাই ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় হল প্রশাসন ক্যানটিন পরিচালনাকারীকে জরিমানা করে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে সতর্ক করে।
এরও আগে একই হলের ক্যানটিনের খাবারে জোঁক পাওয়ার ঘটনা ঘটে। ২০ জুলাই বিজয় একাত্তর হলের ক্যানটিনের খাবারেও পোকা পাওয়ার অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান ক্যানটিনে সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, রাতের খাবার রান্নার আয়োজন চলছে। চুলায় মাছের ডিম রান্না হচ্ছে, পাশেই রান্না করা মুরগি ও মাছ খোলা রাখা ছিল। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে বাবুর্চি রান্না করছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা ক্যানটিনের খাবারে সিগারেটের ফিল্টার, রাবার ব্যান্ড, ১০ টাকার নোট, কাঁকড়া ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। শুধু হলের ক্যানটিন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন খাবারের দোকানেও নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন এবং কার্যকর তদারকির অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
খাবারে ব্লেড গেল কীভাবে
জসীমউদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এস এম আরিফ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ব্লেড পাওয়ার ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তদন্ত করা হয়েছে।
হলের মুরগি ও সবজি খাওয়ার পর তিনি ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও এখন আর হলের খাবার খেতে চান না। কিন্তু বাইরের খাবারের উচ্চ মূল্যের কারণে প্রায়ই বাধ্য হয়ে ক্যানটিনের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়।
মামুন সরকার, আবাসিক শিক্ষার্থী, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল
এস এম আরিফ মাহমুদ বলেন, তদন্তে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, ক্যানটিন ম্যানেজার, বাবুর্চি ও হল সংসদের প্রতিনিধিদের বক্তব্য নেওয়া হয়। তদন্ত কমিটির ধারণা, বস্তার সুতা কাটতে ব্যবহৃত একটি ব্লেড অসাবধানতাবশত রান্নার সময় খাবারে চলে যায়।
হল প্রাধ্যক্ষ আরও বলেন, ঘটনার দায় স্বীকার করায় ক্যানটিন কর্তৃপক্ষকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অসুস্থ হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা
শুধু অখাদ্য বস্তু নয়, নিম্নমানের খাবার খেয়েও অসুস্থ হওয়ার অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মামুন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, হলের মুরগি ও সবজি খাওয়ার পর তিনি তীব্র পেটব্যথায় আক্রান্ত হন। পরে চিকিৎসক জানান, তিনি ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও এখন আর হলের খাবার খেতে চান না। কিন্তু বাইরের খাবারের উচ্চ মূল্যের কারণে প্রায়ই বাধ্য হয়ে ক্যানটিনের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়।
ডাকসু নির্বাচনের আগে বিজয়ী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ তাদের ইশতেহারে চিকিৎসাসুবিধা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিল। জোটটি পুষ্টিবিদের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের মেনু, তিন মাস পরপর খাদ্যমান পরীক্ষা, নতুন ক্যাফেটেরিয়া এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিল ভাউচার’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ছেলেদের আবাসিক হলের পাশাপাশি ছাত্রীদের পাঁচটি হলেও ক্যানটিনের খাবারে একই ধরনের সমস্যা রয়েছে।
শামসুন নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাইফা ইসলাম বলেন, হলের ক্যানটিনে প্রতিদিন প্রায় একই ধরনের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। এতে খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে।
অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রান্না
২৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল, সূর্য সেন হল, জিয়াউর রহমান হল ও কবি জসীমউদ্দীন হলের ক্যানটিন সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এসব ক্যানটিনে অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রান্না করা হচ্ছে।
একজন শিক্ষার্থীর দৈনিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ ক্যালরি প্রয়োজন। কিন্তু হলের খাবারে তা পাওয়া যায় না। শুধু ভাত খেয়ে এ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রোটিন, চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। অথচ এসবের পরিমাণ খুবই কম। ব্যবহৃত উপকরণও সাধারণত বাজারের সবচেয়ে নিম্নমানের।
আবু তোরাব মোহাম্মদ আবদুর রহিম, অধ্যাপক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান ক্যানটিনে সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, রাতের খাবার রান্নার আয়োজন চলছে। চুলায় মাছের ডিম রান্না হচ্ছে, পাশেই রান্না করা মুরগি ও মাছ খোলা রাখা ছিল। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে বাবুর্চি রান্না করছেন।
সূর্য সেন হলে দেখা গেছে, রান্নাঘরের অবস্থা খুব স্যাঁতসেঁতে। রাতের খাবারের জন্য নোংরা পরিবেশেই সবজি কাটছেন কয়েকজন কর্মচারী। প্রায়ই একই রকম চিত্র দেখা গেছে জিয়াউর রহমান হলেও। রান্নার জন্য বাবুর্চিদের আলাদা কোনো পোশাক নেই। স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কেও তাঁদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
দাম কম, খাবারের মানও কম
বিজয় একাত্তর হল ক্যানটিনের ব্যবস্থাপক মো. সাঈদ বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্য এবং অল্প টাকায় ভালো মানের খাবারের প্রত্যাশা—দুই-ই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। রান্নায় যে পরিমাণ মসলা ব্যবহার করা প্রয়োজন, ক্যানটিনগুলোতে সেই পরিমাণ মসলা ব্যবহার করা হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ক্যানটিন ব্যবস্থাপক বলেন, শিক্ষার্থীদের খাবারের দাম বাড়ানোর কথা বললে তাঁরা এক পয়সাও বাড়াতে চান না। অথচ তাঁরা হোটেলের মানের খাবার প্রত্যাশা করেন। বাজারদরের বিষয়টি শিক্ষার্থীরা বিবেচনায় নেন না।
জানা গেছে, আবাসিক হলগুলোতে যখন নতুন করে কাউকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন প্রায় এক লাখ টাকা জামানত হিসেবে রাখা হয়। তবে এই টাকা হলভেদে ভিন্ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন কবি জসিমউদ্দীন হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে প্রাধাক্ষ।
জসীমউদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ আরিফ মাহমুদ বলেন, ক্যানটিনে নতুন বাবুর্চি বা পরিচালনাকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে হল প্রশাসনের একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এই নীতিমালা সবার জন্য উন্মুক্ত এবং তা দেখা যাবে। বরাদ্দ পাওয়ার আগে আবেদনকারীদের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ডেকে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। যিনি দায়িত্ব পান, তাঁকে একটি জামানত ফি জমা দিতে হয়। এই জামানতের টাকা হল প্রশাসনের কাছে সংরক্ষিত থাকে।
বাজারে নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্য এবং অল্প টাকায় ভালো মানের খাবারের প্রত্যাশা—দুই-ই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। রান্নায় যে পরিমাণ মসলা ব্যবহার করা প্রয়োজন, ক্যানটিনগুলোতে সেই পরিমাণ মসলা ব্যবহার করা হয় না।
মো. সাঈদ বলেন, ক্যানটিন ব্যবস্থাপক, বিজয় একাত্তর হল
কয়েকটি হলের খাবারের মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভাত-মুরগি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ভাত-মাছ ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং সবজি ৫ থেকে ১০ টাকা। এ হিসাবে একজন শিক্ষার্থীর এক বেলার খাবারে খরচ পড়ে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। বেশির ভাগ ক্যানটিনেই খুব পাতলা ও নামমাত্র ডাল দেওয়া হয়। অন্যান্য খাবারের রান্নার মানও নিম্নমানের।
অন্যদিকে ক্যাম্পাস–সংলগ্ন হোটেলগুলোতে একই খাবারের দাম হলের খাবারের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি। এসব হোটেলে ভাত-মুরগি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ভাত-মাছ ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং সবজি ১০ থেকে ২০ টাকা হয়।
তবে দাম বেশি হলেও হোটেলের খাবারের মান ও পরিমাণ তুলনামূলক ভালো। কিন্তু উচ্চ মূল্যের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে নিয়মিত বাইরে খাওয়া সম্ভব হয় না।
পুষ্টির ঘাটতিতে শিক্ষার্থীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবু তোরাব মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, খাবারের নিম্নমানের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—দুই ধরনের কারণ আছে। অভ্যন্তরীণ কারণের মধ্যে আছে নিম্নমানের কাঁচামাল, মূল্যস্ফীতি, ক্যানটিন ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট। আর বাহ্যিক কারণ হলো শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দেওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার মতো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। খাবারের মান নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো ভর্তুকি নেই।
রাকিবুল হাসান, আবাসিক শিক্ষার্থী, বিজয় একাত্তর হল
অধ্যাপক আবদুর রহিম আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থীর দৈনিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ ক্যালরি প্রয়োজন। কিন্তু হলের খাবারে তা পাওয়া যায় না। শুধু ভাত খেয়ে এ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রোটিন, চর্বি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। অথচ এসবের পরিমাণ খুবই কম। ব্যবহৃত উপকরণও সাধারণত বাজারের সবচেয়ে নিম্নমানের।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের পক্ষে পুষ্টিকর খাবার কেনা সম্ভব নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বেশি দাম দিয়ে মানসম্মত খাবার কেনার প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়।
ভর্তুকির দাবি শিক্ষার্থীদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য মূলত দুটি ব্যবস্থা রয়েছে—ডাইনিং বা মেস এবং ক্যানটিন বা ক্যাফেটেরিয়া। হল প্রশাসনের নির্ধারিত স্থানে শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় ডাইনিং বা মেস। সেখানে শিক্ষার্থীরাই বাজার করেন এবং হিসাব রাখেন। অন্যদিকে ইজারাভিত্তিক ব্যবসায়ীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় ক্যানটিন। হল ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন খাবারের দোকানও এ ব্যবস্থার অংশ।
শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের দাম কমাতে টিসিবির মাধ্যমে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী স্বল্পমূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এক হাজার কোটি টাকার এন্ডোমেন্ট ফান্ড থেকে ক্যানটিনে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়েও প্রশাসন চিন্তাভাবনা করছে।
আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, অধ্যাপক ও সহ-উপাচার্য (প্রশাসন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম দামে ভালো খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু ক্যানটিনের খাবারের দাম বেশি হলেও মান ভালো নয়।
বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার মতো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। খাবারের মান নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো ভর্তুকি নেই।
জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ত্বোহা বলেন, ক্যানটিনে ভর্তুকি দেওয়া হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
ডাকসুর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কতটা
ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে চিকিৎসাসুবিধা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিল।
জোটটি পুষ্টিবিদের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের মেনু, তিন মাস পরপর খাদ্যমান পরীক্ষা, নতুন ক্যাফেটেরিয়া এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিল ভাউচার’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
নিয়মিত ক্যানটিন পরিদর্শন করা হচ্ছে। অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের অনুমতি ও অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এখনো পুষ্টিবিদ বা সরকারি খাদ্য পরীক্ষক দিয়ে খাবারের মান পরীক্ষা শুরু করা যায়নি। আর এক সপ্তাহের মধ্যে অগ্রগতি না হলে ডাকসু কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে।
এস এম ফরহাদ, সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু
ডাকসু নির্বাচনের ১০ মাস পেরিয়ে গেছে। প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ প্রথম আলোকে বলেন, নিয়মিত ক্যানটিন পরিদর্শন করা হচ্ছে। অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের অনুমতি ও অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এখনো পুষ্টিবিদ বা সরকারি খাদ্য পরীক্ষক দিয়ে খাবারের মান পরীক্ষা শুরু করা যায়নি।
ডাকসুর জিএস আরও বলেন, আর এক সপ্তাহের মধ্যে অগ্রগতি না হলে ডাকসু কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।
আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, কেঁচো, ব্লেড, তেলাপোকা ও কাঁকড়া পাওয়ার অভিযোগের পর সব প্রভোস্টকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাউস টিউটরদেরও নিয়মিত তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া হলগুলোতে তদন্ত চলছে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সহ-উপাচার্য আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের দাম কমাতে টিসিবির মাধ্যমে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী স্বল্পমূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এক হাজার কোটি টাকার এন্ডোমেন্ট ফান্ড থেকে ক্যানটিনে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়েও প্রশাসন চিন্তাভাবনা করছে।
সূত্র : প্রথম আলো
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম