Home / উৎসব ও সংস্কৃতি / সবুজের বুকে নবান্নের সুবাস
5 9 2026 11

সবুজের বুকে নবান্নের সুবাস

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ । মাসস

মেঘ ছুঁয়ে থাকা সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে সোনালি রোদের খেলা। বাতাসে দোল খাচ্ছে পাকা ধানের সোনালি শিষ, আর তার সঙ্গেই ভেসে আসছে পাহাড়ি জুমচাষিদের ঘামভেজা তৃপ্তির ঘ্রাণ। কোথাও ধান কাটার ধুম, কোথাও ফসল পাহারা দিতে জুমঘরে নির্ঘুম রাত, আবার কোথাও সাথি ফসল তোলার প্রাণবন্ত ব্যস্ততা। বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে বোনা স্বপ্নগুলো ভাদ্রের রোদে সোনা হয়ে ঝরে পড়ছে। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি ঢালে জুমচাষিদের ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দ।

বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের রোয়াংছড়ি উপজেলার যামিনী পাড়া। পাহাড়ি ঢালে দলবেঁধে জুমের পাকা ধান কাটছিলেন ৫৭ বছর বয়সী রিং লট ম্রো। সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও আটজন নারী শ্রমিক। দীর্ঘ ২৫ বছর বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করে গত জুনে অবসরে গেছেন তিনি। অবসরের পর ঘরে বসে না থেকে ফিরে গেছেন বাপ-দাদার রক্তে মিশে থাকা জুমের মাঠে। তিন ‘আড়ি’ (প্রতি আড়িতে প্রায় ১০ কেজি) বীজ দিয়ে প্রায় তিন একর জমিতে জুম বুনেছিলেন তিনি। ফলন নিয়ে আশাবাদী রিং লট ম্রো বলেন, ‘আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ফলন নিয়ে আমি আশাবাদী।’

ম্রো আশা করছেন, তিন একর থেকে ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান ঘরে উঠবে; অনুকূল আবহাওয়া থাকলে তা আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত হতে পারত। জুমের বৈচিত্র্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি (এক ধরনের শুঁটকি) কিনলেই চলে। জুম যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো, প্রয়োজনীয় অনেক সবজি এখান থেকেই পাওয়া যায়।’

 

একই জমিতে ধান কাটছিলেন ১৯ বছর বয়সী তরুণী সংডং ম্রো। কপালে ঘামের বিন্দু মুছে তিনি বলেন, ‘জুম না করলে আমরা কী খাব? জুম করতেই হবে। প্রতিবছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।’ জুমের সাথি ফসল তাদের পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে স্থানীয় বাজারেও কিছু বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করে দেয়।

জুমের এই জীবনচক্র যেন প্রকৃতির সঙ্গেই বাঁধা। নভেম্বর-ডিসেম্বরে জঙ্গল নির্বাচন, জানুয়ারিতে ঝোপঝাড় কাটা, মার্চ-এপ্রিলে ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে পোড়ানো এবং বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে বীজ বোনা। এরপর আগস্টের শেষ থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর পালা। অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ অবধি প্রতিটি পাড়ায় বাজে নতুন চালের নবান্ন উৎসবের সুর।

বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়েছে এবং চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চলতি বছর বান্দরবানে প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে।’ ফলন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়।’ তিনি আরও জানান, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং ফলন বাড়াতে ‘স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদনে জুমচাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

পাহাড়ের আদি বাসিন্দাদের কাছে জুম স্রেফ এক টুকরো জমি বা ফসল নয়Ñ এ তাদের অস্তিত্ব, বেঁচে থাকার অবলম্বন আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা সংস্কৃতির অমলিন ধারা।

সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

31 8 2026 66

নেপালে নিহত বেড়ে ৯০৩, দুই শতাধিক শিক্ষার্থীসহ নিখোঁজ ৪২০০ জনের বেশি

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ । মাসস নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে …