Home / জাতীয় / বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য যাত্রাপালা হারিয়ে যেতে বসেছে
image-14269-1517735241

বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য যাত্রাপালা হারিয়ে যেতে বসেছে

মাস্টারি সংবাদ | প্রতিবেদক
ঐতিহ্য | ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৬ মাঘ ১৪৩০

বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাঙালির এককালের বিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গ যাত্রাপালা। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, হাতের মুঠোয় বিনোদনের সহজলভ্যতা, অশ্লীল নৃত্য আর জুয়ার আবর্তে পড়ে বাঙালির লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য এই যাত্রাপালা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। একই কারণে উঠে যাচ্ছে সার্কাস-পুতুল নাচ। গ্রামীণ মেলাগুলো তেমন আর জমছে না। এখন আর সন্ধ্যা নামলেই মেলা থেকে লাউড স্পিকারে আর ভেসে আসে না- ‘হৈ হৈ কান্ড, রৈ রৈ ব্যাপার…অদ্য রজনীর বিশেষ আকর্ষণ…’।

বাংলাদেশ যাত্রা শিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দে এবং বাংলাদেশের ‘যাত্রাসম্রাজ্ঞী’ বলে খ্যাত জ্যোত্স্না বিশ্বাস বলেন, যাত্রা শিল্পের অবক্ষয় এবং বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়ার মূল কারণ অসাধু যাত্রাপালা ব্যবসায়ীদের ‘প্রিন্সেস’ আমদানি আর জুয়া-হাউজি চালু । তারা বলেন, এই শব্দগুলো আগে যাত্রা দলে ছিল না। ১৯৭৮-৭৯ সালের পর এই অশ্লীলতার সূচনা হয়েছিল মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। তাদের কাছেই চিরায়ত যাত্রাপালার মৃত্যু ঘটে।

দেশ অপেরা’র মালিক মিলন কান্তি দে বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। দেশে যেখানে ৩০০-এর বেশি যাত্রা দল ছিল, এখন ৩০টি দলও সংগঠিত হচ্ছে না। প্রায় তিন বছর ধরে যাত্রাপালা বন্ধ। যাত্রার মতোই সার্কাস এবং পুতুল নাচও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কারণ সবখানেই অশ­ীলতার প্রকোপ। তিনি বলেন, যাত্রাপালার সোনালী সময় ছিল ৬০-৭০-৮০ দশকে। ১৯৮৭-৮৮ যাত্রাদলের সংখ্যা বেড়ে তিন শতাধিক হয়। শিল্পকলা একাডেমিতে ১১১ টি দল নিবন্ধন করেছে। তবে টিকে আছে ৩০ টির মতো। গত বছরও ৫৭ টি দল ছিল। প্রতি বছর কমছে।

জানা যায়, বাংলাদেশে আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত সাত মাস যাত্রার ভরা মৌসুম। যাত্রার মৌসুম শুরু হয় দুর্গা পূজায় আর শেষ পয়লা বৈশাখে। এ বছর কোনো যাত্রাপালা হয়নি। শুধু সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের আয়োজনে কয়েকটি পালা হয়েছে। গত বছরও ছিল একই অবস্থা।

যাত্রাশিল্পের নেতারা জানান, ১৯৭৫ সালের পর থেকেই যাত্রাপালা আয়োজনের ওপর বিধিনিষেধ আসতে থাকে। মাঝের ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল ব্যতিক্রম। এই সময় অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভালো। তারপর থেকে আবার বিধিনিষেধ বাড়তে থাকে।

মিলন কান্তি জানান, যাত্রাশিল্পের সঙ্গে বহু লোকের জীবিকাও জড়িত। প্রতিটি দলে শিল্পী, কলাকুশলী মিলিয়ে অর্ধ শতাধিক লোক থাকে। এ হিসাবে তিন শতাধিক যাত্রা দল অন্তত ১২ থেকে ১৫ হাজার লোকের জীবিকার সংস্থান ছিল। পালা মঞ্চস্থ না হওয়ায় এসব মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। অনেকেই চলে গেছেন অন্য পেশায়। অনেক দক্ষ অভিনেতা—অভিনেত্রী, গায়ক বাদক, পালাকার চলে গেছেন দল ছেড়ে।

জানা যায়, যাত্রাপালার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। যাত্রা’র সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব কয়েক হাজার বছর আগে। তখন মানুষ দেব-দেবীদের বন্দনা করতো। তখন দল বেঁধে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ‘যাত্রা’ করার থেকে এর নাম ’যাত্রা’। ১৫০৯ সালে যাত্রার সাথে শ্রী চৈতন্য দেবের সময়ে যাত্রায় অভিনয় যুক্ত হয়। ‘রুক্ষ্মীনি হরন’ প্রথম যাত্রা পালা। অষ্টম ও নবম শতকেও এদেশে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেও রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পু্ল্র, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, শ্রীহট্টসহ সমগ্র ভূখণ্ডে পালাগান ও কাহিনিকাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল। ধর্মীয় বা কোনো উত্সবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যে রীতি সেখান থেকেই যাত্রা শব্দটি এসেছে। এদেশে শিবের গাজন, রামযাত্রা, কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, রাধার বারোমাসী প্রচলিত ছিল। অষ্টাদশ শতকে যাত্রা বাংলা ভূখণ্ডের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস ছিলেন যাত্রার জগতে প্রসিদ্ধ। উনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক যাত্রা খুব জনপ্রিয়তা পায়। উনবিংশ শতকের শেষে এবং বিশশতকের শুরুর দিকে যাত্রায় দেশপ্রেমমূলক কাহিনির অভিনয় শুরু হয়। বিখ্যাত সাহিত্যিক মীরমোশাররফ হোসেনও পালা লিখেছেন। তিনি বেহুলা নিয়ে যাত্রাপালা লেখেন। সে সময় গ্রামে গঞ্জে বিষাদসিন্ধুর কাহিনি নিয়েও যাত্রা অভিনয় হতো। কারবালার কাহিনি নিয়ে যাত্রা পালা লেখা হতো।

যাত্রাপালা সংশি­ষ্ঠরা জানান, এখন টিকে আছে এমন নামকরা যাত্রাদলগুলো হলো: যশোরের আনন্দ অপেরা, চ্যালেঞ্জার অপেরা, অগ্রগামী নাট্টসংস্থা, মাগুরার চৈতালি অপেরা, নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সমপ্রদায়, কোহিনূর অপেরা, গাজীপুরের দিশারী অপেরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস যাত্রা ইউনিট, খুলনার স্বদেশ অপেরা, রাজমহল অপেরা, রঙমহল অপেরা দেশ অপেরা, নাটোরের পদ্মযাত্রা ইউনিট, বাগেরহাটের সুন্দরবন অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট ইত্যাদি।

উলে­খযোগ্য যাত্রা পালার মধ্যে রয়েছে: রূপবান-রহিম বাদশাহ, মালকা বানু, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল, গুনাইবিবি, দুর্গামনি, কমলা রানীর বনবাস, কাজল রেখা, মলুয়া, ভেলুয়া সুন্দরী, সোনাভান, বীরাঙ্গনা সখিনা, গাজী কালু চম্পাবতী, বনবিবি ইত্যাদি। জনপ্রিয়তা পায়: মাইকেল মধুসূদন, দেবদাস, রক্তাক্ত বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বিজয় এনেছি, মা মাটি মানুষ, সোনার বাংলা, সোজন বাদিয়ার ঘাট, লালন ফকির, ঈশাঁখা, রক্তাত্ত প্রান্তর, একযে ছিলেন মহারানী, দাতা হাতেম তাই, এই দেশ এই মাটি, বিদ্রোহী বুড়িগঙ্গা, বর্গী এলো দেশে, বাংলার মহানায়ক ইত্যাদি পালা।

দেশে পুতুলনাচের অবস্থাও বিপন্ন। ‘রয়েলবীণা পুতুলনাচ’ আর ‘বাণীবীণা পুতুলনাচ’ নামে দুটি দল মোটামুটি টিকে আছে।

সূত্র : ইত্তেফাক

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

31 9 11

বহুদলীয় গণতন্ত্রই নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রও বিএনপির হাত ধরে এসেছে: প্রধানমন্ত্রী

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ । মাসস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি শুধু …