ভূমিপুত্র
গুর্দাহলুই ডাকে তার হৃদয় নামক উৎসবে
শহুরে ত্রিভঙ্গ আমি, যাবো
জলপিপিদের বিপুল ভূ-ভাগে
সেই ছলাৎ জলের গন্ধে
ভাঁপাপিঠার মতো ফুলে ওঠা
ডেঁপের মমতায়!
গ্রামীণ হালটে এখনো বাকুল্লা ডাকে
ডাকে চিকনচাকন কাঁখাল রমণী;
ডাকে জয়গুন আর তার যত ব্ল্যাকহোল!
তারপিন তেল মেখে
বাপজান পালানে অর্ধশায়িত
বিকেলের রোদ তাকে ভয়াবহ আরাম এনে দেয়!
বিশাল চাটাই পেতে আমার মা
মেশতা পাটের গন্ধে ভাত খায় আলুনি!
আমাদের জন্মের এসব কেচ্ছাকাহিনী
আঁতুড় ঘর থেকেই পাওয়া!
গিমাশাকের আশ্চর্য লোভে যেতে হবে
যেখানে ছাগলনাদি লাল ও কালো সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে
গোলাপ জামের পেটের ভেতর পড়ে আছে
আমার পিতৃপরিচয়
নিষাদের পুত্র আমি
বেড়ে উঠেছি অস্ট্রিক চাষার জন্মের ভেতর!
এ সবকিছু বাবু-সা’বদের কেতাবে পড়ে
দীর্ঘদিন পর এলাম মৃত্তিকা-নগরে
শরীরের চামড়া খুলে মিলিয়ে নিচ্ছি
ঠাকুরকুঁড়ার আঁঠাল মাটিতে
পোয়াতি বিলের স্নানের গৌরব নিয়ে
একদিন আমার মা আমাকে জাগিয়েছে
কিষাণ-কন্যার হাতে পোয়াপিঠে খেয়ে
এই আমি যৌবন পেয়েছি
প্রযত্নে-ট্রযত্নে নয়, আমি সরাসরি ভূমিপুত্র!
গ্রামে ফেরা
আমার গ্রাম এখন চলে যাচ্ছে
অন্যদের গ্রামের ভেতর
যে গ্রাম নিয়ে একদিন গল্প হতো
গ্রীকদের সাথে-
এখন সেই গ্রামের ছায়ায়
ঘোরাফেরা করে ভিনদেশী নাগর!
নগর আমাকে অভিমানি করে রেখেছে
তারপরও মধ্যরাতে চিৎকার ছাড়ি;
‘গ্রাম গ্রাম’ বলতে বলতে
একটি নক্ষত্র খসে যায় !
চারদিকে ঘুরছে ধূর্তকাক
শরীরে তার শহুরে লেবাস,
গলা দিয়ে ঢুকছে অনবরত
দোয়েল ও দূর্বাদল!
আমাকে অসুস্থ বলে ঘোষণা দিয়েছে
এই শহর, তার চিকিৎসক
এখানকার বণিকেরা আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে
শপথে ডাকেনি
গ্রামীণ বিশ্বাসে তাদের কাগজকে ভেবেছি টাকা!
দীর্ঘদিন পর আমার গ্রাম ফিরছে
বাবুদের বাগানবাড়ি থেকে
শরীরে তার অন্নপূর্ণার ঘ্রাণ
মদনবাবুর শিশুতোষ হাতে
আমার গ্রাম যাচ্ছে পাঠশালায়!
সুলতানের স্বপ্নময় পেশি ছড়াচ্ছে
মাঠে মাঠে ধান
ছোট বোন শিকেয় তুলে রাখছে
আসন্ন বাংলাদেশ
যে বাংলাদেশ একদিন
মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো!
এইসব ভালোবাসা, ভালোলাগা
দেখতে দেখতে আমি সুস্থ হয়ে উঠছি
আমার বা-পাশে নিত্যবৃন্দাবন
ডান পাশে একলা নিতাই
সামনে মহুয়ার গড়
আরেকটু এগোলেই দেওয়ান-মদিনার ভিটা
সূর্য এখানে দীর্ঘ হচ্ছে
মেঘেরা বিশ্রাম নিচ্ছে বহু আরামে
রাধার স্তন দুটি গাইছে সমুদ্র-গান
আগামী দিনের ট্রেন
হুইসেল দিচ্ছে অস্তিত্বের গভীরে
আমি হেঁটে চলছি
ইনাই নদীর ধারে
‘এইতো সবুজ চাদরে ঢাকা আমার শৈশব
যেখানে মার্বেল খেলছে এক বালক’
জগতের গ্রামের পাশে
আজ দাঁড়িয়ে ডুবাইল গ্রাম
আমি নত হয়ে মাটি ছুঁইলাম,
বাংলাদেশ আমার বুকে স্থায়ী হলো
আমি হেঁটে চলছি
গ্রামের গভীর থেকে গভীরে!
কবি সমরেশ দেবনাথ :
জন্ম : ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৪। জন্মস্থান : ডুবাইল, গোপালপুর, টাঙ্গাইল। শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ : ভূমিপুত্র, শহর কোন মানচিত্র তৈরি করে না, বৃক্ষের সংসারে একা, হাতের কাহিনী ইত্যাদি। ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ : Vumiputra And Other Poems, Art Of Kissing. শ্রেষ্ঠ কবিতা : আমার গন্তব্য, ভূমিপুত্র, গ্রামে ফেরা, শহর কোন মানচিত্র তৈরি করে না, অচেনা পতঙ্গ, বালিকার মুদ্রাদোষ, গড়ানো পাথর, সুন্দরের জন্মরহস্য, স্তন, কবি, কবির অভিমান, গোলাপের অনুবাদ, এইসব বৃষ্টিপাত, সুতা ও শূন্যতা, বৃক্ষের সংসারে একা, জীবন সত্য, পরমাণু কবিতা, মুগ্ধ আয়না, কালো মহিষ, বিদ্যাসাগরের চরণছাপ ইত্যাদি। কাব্যবৈশিষ্ট্য : মৌল ধারার কবি। আজীবন কবিতায় মগ্ন। সমরেশ দেবনাথ কবিতায় সৌন্দর্য সৃষ্টিতে দক্ষ। তিনি শুরু থেকেই নিজস্ব শৈলীতে কবিতা লিখেছেন। মাটি, প্রকৃতি ও জীবন বিষয়ক তার কবিতাগুলো অনবদ্য। তিনি বহু নতুন শব্দের প্রয়োগ করেছেন। ভূমিপুত্র কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ‘মানবিক চেতনা পদক’ লাভ করেছেন। অতিসম্প্রতি পেয়েছেন ‘আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন স্বর্ণপদক’।
মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা/ ২৯ অক্টোবর ২০১৬/ ১৪ কার্তিক ১৪২৩
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম