মাস্টারি বিডি ডটকম ।। শেখ নজরুল
ঢাকা । ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ । ১০ পৌষ ১৪২৪

ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে ২৫ ডিসেম্বর খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন। ‘খ্রিস্টমাস ডে’ পালনে খ্রিস্টান সম্প্রদায় ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকে নববর্ষের প্রথম দিন অথ্যাৎ ১ জানুয়ারি পর্যন্ত নানান আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি পালন করে।
ঐতিহাসিকদের মতে, ‘খ্রিস্টমাস ডে’ ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে রোমে সর্ব প্রথম পালিত হয়। অনেকে ধারণা করেন, ‘হেরর্ড দি গ্রেট’ মৃত্যুবরণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৪ অব্দের এক বসন্তে। এবং যিশু জন্মগ্রহণ করেন তার মৃত্যুর ৪-৫ বছর পর। তবে অনেকে ধারণা করেন, এটি কোনভাবেই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন নিয়ে মতান্তর থাকলেও প্রথম থেকে বেশ কিছু বছর দিনটি নানান আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয়। তবে পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। কিছু গোষ্ঠি ৬ জানুয়ারি, ১৯ এপ্রিল, ২০ মে কিংবা ২৫ ডিসেম্বরও উতসবের মধ্যদিয়ে দিনটি উদযাপন অব্যহত রাখে। তবে ৫ শতক থেকে পশ্চিমা বিশ্বসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ২৫ ডিসেম্বরকে নির্দিষ্ট করে ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে ‘খ্রিস্টমাস ডে’ পালিত হচ্ছে।
যিশু খ্রিস্টের জন্মও বেশ তাৎপর্যময়। ধর্মমতে, কাঠুরিয়া জোসেফ মেরীকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কুমারী মেরীর সন্তান জন্মদানের সংবাদ মেনে নিতে পারেননি। কারণ তারা তখনও পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি। ফলে যোসেফ মেরীকে বিবাহ না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এই পরিস্থিতিতে এক রাতে ঈশ্বর প্রদত্ত স্বপ্নে যোসেফ জানতে পারেন যে, মেরীকে পুত্রের মাতা হিসাবে তিনিই নির্ধারণ করেছেন এবং এই অনাগত শিশু মানুষকে সত্য পথের সন্ধান দেবেন। তাই তাকে ভীত হবার কারণ নেই। অবশেষে যোসেফ মেরীকে বিয়ে করে অনাগত দেবশিশুকে লালনপালন করার সিদ্ধান্ত নেন।
তৎকালীন রোমান সম্রাট অগস্টাস রাজ্যের করদাতা চিহ্নিত করতে নবজাতকের নাম নিবন্ধনের আইন প্রণয়ন করেন। প্রকারন্তরে তিনি তার জন্য হুমকীস্বরুপ যিশুনামক শিশুকেই হত্যার পরিকল্পনা করেন। কুমারী মা হিসেবে মেরী সন্তানসম্ভবা হবার পর রাজা মেনে নেননি। ফলে তাদেরকে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে বের করে দেয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে যোসেফ রাজা ভেভিডের সহায়তা প্রাপ্তির জন্য বেথেলহামে যাবার সিদ্ধান্ত নেন।
এক রাতে দক্ষিণের পথ ধরে যোসেফ ও মা মেরী দুর্গম অতিক্রম করে বেথেলহামের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। একটানা পথ অতিক্রম করে রাতে মা মেরী কান্ত হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে শহরের দ্বারপ্রান্তে আস্তাবলের পতিত স্থানে একটি খেজুর গাছের নিচে তারা আশ্রয় নেন।
সেই রাতেই মা মেরী পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। শহরের চারপাশে পাহাড় আর অন্ধকার রাতের মধ্যে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে, ভেসে আসে একটি কণ্ঠস্বর,
‘ভীত হইও না, আমি ঈশ্বরের বার্তা নিয়ে এসেছি তোমার ও পৃথিবীর মানুষের জন্য। ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী বেথেলহামে তার পুত্র জন্মগ্রহণ করেছে।’
অগ্নিপূজক হিরুইসও যিশুর ভয়ে ভীত ছিলেন। ফলে তারা যিশুকে হত্যার জন্য হণ্যে হয়ে খুঁজছিল। মা মেরী রাতে এক স্বপ্নে এই হত্যার সত্যতা অনুধাবন করেন। স্বপ্নে তাঁকে শিশুযিশুসহ মিশরে যাবার নির্দেশ পান। ফলে মা মেরী শিশুযিশুকে নিয়ে মিশরে গমন করেন। এবং হিরুইসের মৃত্যু পর্যন্ত মিশরেই অবস্থান করেন। হিরুইসের মৃত্যুর পর তিনি নিজ অঞ্চল নাছেরায় ফিরে আসেন। যিশু বেড়ে ওঠার সাথে সাথে প্রখর জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ মেধাশক্তির পরিচয় ফুটে ওঠে।
মাত্র ১২ বছর বয়সেই দারুসালেমে জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের সাথে ধর্ম বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতে সক্ষম ছিলেন। তিনি ছিলেন বাকপটু এবং তত্ত্বজ্ঞানে ঋদ্ধ। ক্রমান্বয়ে যিশু আধ্যাত্মিক জ্ঞানেও পূর্ণতা লাভ করেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি নবিত্ব লাভ করেন ও ধর্মপ্রচার শুরু করেন। তিনি ইয়ারদন নদীর তীরবর্তী জনগণকে ধর্মোপদেশ দান অব্যহত রাখেন।

তিনি অন্ধমানুষের দৃষ্টিদান, বোবাদের বাকশক্তি দান, কুষ্ঠ রোগিকে আরোগ্য করা, পানির ওপর দিয়ে হেঁটেযাওয়া ইত্যাদি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি মানুষকে আলোর সঙ্গে তুলনা করতেন। নিজ আত্মাকে প্রজ্জ্বলিত করে অপরের জীবনের অন্ধকারকে দূর করতে বলতেন। ঈশ্বরমুখী পথ দুর্গম হলেও সেই পথেই মানবের সকল যাত্রা নির্দিষ্ট করে কথা বলেছেন।
তবে যিশুর ধর্মপ্রচারের বিরোধী ছিলেন অনেকেই। তিনি বক্তৃতায় ইয়াহুদী ধর্মগুরুদের কঠোর সমালোচনা করতেন। ফলে তাদের অনেকেই তার শত্রুতে পরিণত হন। বিদ্বেষপরায়ণ ইয়াহুদী পুরোহিতরা নানানভাবে তাকে দোষী করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। বিশেষভাবে তার বক্তৃতায় উল্লেখিত ‘আসমানী বাদশাহের’ বিষয়ে শত্রুরা অভিযোগ উত্থানের বেশি সুযোগ পায়। পরে তারা যিশুর প্রতি রাজদ্রোহীর অভিযোগ আনে। এবং ধরিয়ে দেবার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এই কাজে তারই আস্থাভাজন ‘হাওয়ারী দল’ গুপ্তচর বৃত্তিতে লিপ্ত হয়। ইয়াহুদ ছিল এই বিশ্বাস ঘাতকদের অন্যতম।
ইয়াহুদই সামান্য ঘুষ গ্রহণ করে রুমীয় সৈন্যদের হাতে যিশুকে ধরিয়ে দেয়। রাজবিচারে তাঁকে ত্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তবে এদিন উতসবের দিন থাকায় সন্ধ্যায় তাকে ক্রুশ থেকে নামানো হয়। এবং মৃত হিসেবে দাফনও করা হয়। কিন্তু ঈশ্বর তাকে পৃথিবী থেকে তুলে নেন। ধর্মমতে যিশু পুণরায় এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হবেন।
সংক্ষেপে এটিই যিশুখৃস্টের জীবনকাহিনী। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরা দিনটি ভাবগাম্ভিয্যময় নানান অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পালন করছেন। অন্যান্য ধর্মের অনুসরীরাও তাদের সঙ্গে ভাব ও শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। মানুষের মঙ্গল কামনায় বিশ্বমানব সকল ধর্মাচারে যেমন একাত্ম হয় এখানেও তার ব্যত্যয় নেই।
শুভ বড়দিন ।। শুভেচ্ছা সকলকে……….।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম