ইচ্ছে করে ডেকে বলি… / ওগো কাশের মেয়ে, / আজকে আমার চোখ জুড়ালো / তোমার দেখা পেয়ে…। -নির্মলেন্দু গুণ
মাস্টারি বিডি ডটকম
শান্তা ইসলাম । ঢাকা । ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ । ২৫ ভাদ্র ১৪২৪

‘আজি নীল আকাশে কে ভাসাল সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই লুকোচুরির খেলা’— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত এই গানের মধ্য দিয়েই বোঝা যায় ষড়ঋতুর এই দেশে শরতের আবেদন সত্যিই অনন্য। এই সময়টায় প্রকৃতি সাজে নতুন রঙে রূপে। প্রচণ্ড খরতাপে থেমে থেমে শান্তির শীতল বাতাস ছড়িয়ে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে এক পসলা বৃষ্টি। প্রকৃতির এই বিচিত্র খেলায় জীবনকে আরও আনন্দময় ও সতেজ করতে রূপ সচেতনদের পোশাকেও আনতে হবে ভিন্নতা। আবার মনের মতো সাজের পর বাইরে বেরিয়ে হঠাত্ বৃষ্টির ঝাপটায় যেন পুরোটাই ম্লান না হয়ে যায়- সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। শরতের সাজের ভিন্নতা নিয়ে কিছু কথা…

এখন শরত্কাল হলেও প্রকৃতিতে বইছে গরম হাওয়া। একটু বাইরে বেরোলেই রোদের প্রকোপে এখনও শরীরে ঘাম জমে। শুধু ভোরবেলাটা শিশিরের স্নিগ্ধতা আর শীতের আভাস লাগা শিউলি ফুলের সুবাস মাখা বাতাসে কেমন যেন মায়াময় মনে হয়। একটু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তপ্ত ছোঁয়ায় শরীরে কেমন জ্বালা ধরিয়ে দেয়। শরতের এই দিনগুলোয় সাজতে হবে হালকা সাজে। আর এ জন্য প্রথমেই বেছে নিন হালকা রঙগুলো। যেমন ফিকে নীল শাড়িতে জরিপাড় দেওয়া, চাঁপাফুল রং, ধানি রং, সাদা জমিনে বুটি তোলা জামদানি শাড়ি এবং এর সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। ব্লাউজের ছাটকাটগুলো যেন শালীনতাপূর্ণ হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন।
যারা সালোয়ার-কামিজ পরেন তারাও এ রকম হালকা রঙগুলোই বেছে নেবেন। তবে সালোয়ার-কামিজ যথাসম্ভব সুতি হওয়াই ভালো হবে। সাজসজ্জার অন্যতম অনুষঙ্গই হলো চুল বাঁধা। আর চুল বাঁধার সময় আপনার চুলের ধরন এবং বয়সের দিকটা অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। আপনার বয়স যদি বাইশের নিচে হয় তাহলে লম্বা বেণী বাঁধুন। এ ছাড়া ফ্রেঞ্চ রোল, উঁচু চূড়া খোঁপা কিংবা এম খোঁপা বাঁধতে পারেন। আর বাইশের ওপরে যাদের বয়স তারা বাঁধুন এলো খোঁপা, গোল খোপা কিংবা বিড়া খোঁপা। মনে রাখবেন, হালকা সাজ ও পোশাকের সঙ্গে ভুলেও জমকালোভাবে চুল বাঁধবেন না। কারণ এতে বেমানান দেখাবে। খোঁপায় মালা কিংবা চিরুনি না পরে বরং একটা কি দুটো ফুল কিংবা ফুলের কুঁড়ি গুঁজে দেবেন। গোলাপের কলি কিংবা রজনীগন্ধার একটা কি দু’টা ফুল গুঁজে দিলে আরও চমত্কার দেখাবে। আবারও বলছি, হালকা সাজের সঙ্গে কড়া প্রসাধন আপনাকে করে তুলবে সৌন্দর্যহীন। তাই সাজে শুধু স্নো, পাউডার, হালকা লিপস্টিক এবং আইব্রো পেন্সিলের ব্যবহারই যথেষ্ট। আপনি যদি কপালে টিপ পরতে ভালোবাসেন তবে তা অবশ্যই পরবেন। এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলা দরকার। যেমন আপনার কপাল যদি ছোট হয়, তাহলে টিপ না পরলেও চলে। আর যদি পরেনও তাহলে ছোট টিপ বেছে নেবেন। আর আপনার কপাল যদি বড় হয় তাহলে বড় টিপ অপরিহার্য। টিপটি অবশ্যই শাড়ি বা সালোয়ার কামিজের রঙের সঙ্গে ম্যাচিং করেই পরবেন। ম্যাচিং টিপ না পাওয়া গেলে লাল অথবা মেরুন অথবা কালচে লাল টিপ পরবেন।
সাজগোজের পরিবর্তন হয় ঋতুভেদে। এখন যেহেতু বাইরে রোদ বৃষ্টির খেলা, তাই সাজের ক্ষেত্রে উপকরণটি অবশ্যই যেন পানিরোধক হয়। এ সময়ে দিনের বেলা আপনার গাঢ় সাজ যেমন গরমে মানানসই নয়, তেমনি অন্যদের চোখেও তা দৃষ্টিকটু লাগে। এই সময়ে সাজে সব মিলিয়ে স্নিগ্ধ ভাব থাকা চাই। হালকা মেকআপই তাই ভালো। দিনের বেলায় ফাউন্ডেশন না লাগিয়ে হালকা কোনো ফেস পাউডার লাগিয়ে দেখতে পারেন। এতে ত্বক অনেক বেশি মসৃণ ও সুন্দর দেখাবে। আবার যদি আপনি ফাউন্ডেশন ব্যবহার করতেই চান, ম্যাটিফায়িং ফাউন্ডেশন লাগান। এতে ত্বক কম ঘামবে ও কম তৈলাক্ত হবে। এর ওপরে প্রয়োজনে পাউডার ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে মুখের যেখানে সাধারণত বেশি ঘাম হয়। এবার পোশাকের সঙ্গে মেকআপে মিল রেখে লাইট-ব্রাউন কালারের আইশ্যাডো লাগিয়ে নিলে অনেক বেশি ন্যাচারাল দেখাবে। তবে রাতের বেলায় একটু গাঢ় করেই চোখটা সাজাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মেরুন, কফি, সবুজ, নীলচে শ্যাডগুলো ব্যবহার করতে পারেন। এ সময় অবশ্যই ওয়াটারপ্রুফ মাশকারা এবং পেন্সিল আইলাইনার ব্যবহার করুন।

দিনের সাজে চোখের নিচের পাতায় আইলাইনার অথবা মাশকারা না লাগানোই ভালো। পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নিতে পারেন রঙিন কাজল। নীল, সবুজ, গোলাপি, লাল কাজলের রেখা টেনে নিতে পারেন চোখের কোণে। যারা রঙটা একটু বেশিই পছন্দ করেন, তারা পোশাকের রঙের বিপরীত রঙটিও বেছে নিতে পারেন। এটি চোখের কাজল, শ্যাডো, লিপস্টিক—সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দিনের বেলা ব্লাশ-অন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কপালে টিপ দিতে পারেন। শরতের হালকা সাজ প্রসাধনের সঙ্গে গহনা হিসেবে বেছে নিন হালকা কোনো গহনা। সোনা, রুপা, মুক্তা, অক্সিডাইজ, মেটাল, কাচ, মাটি, পুঁতি, কাঠ কিংবা যেকোনো রকমেরই হোক না কেন হাতে প্লেন বালা, গলায় লকেট, কানে দুটো হালকা গহনা কিংবা পাথর বসানো টব কিংবা মুক্তা বসানো দুল পরলেই সুন্দর লাগবে দেখতে। উচ্চতা যাদের বেশি তারা পরবেন নিচু স্যান্ডেল বা স্লিপার। আর উচ্চতা কম হলে অবশ্যই হিলওয়ালা জুতো পরবেন। জুতোর বেলায়ও লক্ষ্য রাখবেন তা যেন জমকালো পুঁতি অথবা জরি বসানো না হয়। সাজ-পোশাকে জমকালো ভাব বর্জন করে রুচিসম্মত পোশাক পরলেই আপনি হয়ে উঠবেন আকর্ষণীয়।

* শরতে পোশাকের রং বাছাইয়ে হালকা রং ও মেকাপের ক্ষেত্রে হালকা মেকাপ বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
* শরৎ মৌসুমে পোশাকের সঙ্গে রূপার গয়না বেশি ভালো লাগবে।
* পুরুষেরা টি-শার্ট, শার্ট, ফতুয়া বা ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি পরতে পারেন শরৎ ঋতুতে।
শরতের সাজসজ্জা নিয়ে রূপবিশেষজ্ঞগণ বলেন, শরৎ মানে ফুরফুরে বাতাস আর স্নিগ্ধ আবহাওয়া। গ্রীষ্মের বিদায় আর শীতের আগমনী এই সময়টায় আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। তবে রোদের তেজ আর গরমের তীব্রতা পুরোপুরি কমেনি, তাই পোশাকের রং বাছাই ও মেকাপের ক্ষেত্রে হালকা মেইকআপ বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। মেকাপের বেইস যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা উচিত। কারণ এতে দেখতে ভালো ও স্নিগ্ধ লাগবে। চোখে সাদা আইশ্যাডো ব্যবহারে চেহারায় উজ্জ্বলভাব ফুটে ওঠে। তাছাড়া সাদা বাদে রূপালি, হালকা গোলাপি, বেইজ বা ঘিয়া, হালকা বাদামি ইত্যাদি রঙও ভালো মানাবে। এই সময় আকাশের রংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে চোখে নীল কাজল বা আইলাইনার বেশ মানিয়ে যায়। আর গালে ব্লাশন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেছে নিতে হবে হালকা গোলাপি বা কমলা রংয়ের ব্লাশন।
ত্বকের যত্ন : দিনের যেকোনো সময় আর রাতে ঘুমানোর আগে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুতে হবে। যত নরম সাবানই হোক, তাতে ত্বকের জন্য ক্ষতিকর নানা উপাদান থাকে। নিয়মিত সাবান ব্যবহারে মুখের ত্বকে বলিরেখা পড়তে পারে। মুখের ত্বকে তাই সাবান ব্যবহার না করাই ভালো।
সপ্তাহে এক দিন যেকোনো স্ক্রাব দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে হবে। ত্বকে যাতে তেল না জমে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। নইলে তেল আর ময়লা জমে ব্রন হতে পারে। ত্বকের তেলতেলে ভাব কাটাতে কমপ্যাক্ট পাউডার ব্যবহার করতে পারেন। বরফ দিয়ে ম্যাসেজ করলেও উপকার পাবেন। রাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে ঘুমালে অবশ্যই ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। যে প্রসাধনীই ব্যবহার করবেন, খেয়াল রাখবেন, তা যেন মানসম্মত হয়।

চুলের যত্ন : এ সময় প্রতিদিন চুল ধুতে হবে। যারা বাইরে বেশি কাজ করেন, তারা সম্ভব হলে প্রতিদিনই চুল শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে কন্ডিশনার লাগান। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন গরম তেল ম্যাসাজ করুন। নারকেল তেলই চুলের জন্য সবচেয়ে ভালো। সারা রাত লাগিয়ে রেখে পরদিন শ্যাম্পু করুন। এতে ঘুমও ভালো হবে। তেলের সঙ্গে যেকোনো প্রোটিনসমৃদ্ধ প্যাকও লাগাতে পারেন। ডিম, আমলা, টকদই—এসব দিয়ে তৈরি প্যাক লাগাতে পারেন। রাতে ঘুমানোর আগে চুল ভালো করে আঁচড়ে নিন। লম্বা চুল হলে পাতলা স্কার্ফ দিয়ে মুড়িয়ে ঘুমাতে পারেন। এতে চুলের ডগা ফেটে যাওয়ার ভয় থাকবে না। দিনে চলাফেরার সময় চুল বেঁধে রাখলে কম ময়লা হবে। খুশকি থেকে বাঁচতে চুল সবসময় পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। চুল ধুয়ে ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে নিন।

উজ্জ্বল নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, আর মাঠভর্তি শাদা কাশফুলের সমারহ। গ্রীষ্মের দাবদাহ, আর বর্ষার ঝুম বৃষ্টির পর শরত-প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে এখন নিজেকেই একটু নতুনভাবে সাজিয়ে নিন বন্ধুরা।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম