Home / প্রচ্ছদ / লেবাননে শান্তিরক্ষায় বাংলার যুদ্ধজাহাজ : ভূমধ্যসাগরের তীরে বাংলার পতাকা উড্ডীন
bd+flag+mbd

লেবাননে শান্তিরক্ষায় বাংলার যুদ্ধজাহাজ : ভূমধ্যসাগরের তীরে বাংলার পতাকা উড্ডীন

মাস্টারি বিডি ডটকম ।
ঢাকা । ২২ ডিসেম্বর ২০১৭ । ০৮ পৌষ ১৪২৪

ভূমধ্যসাগর যেন লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে অনিন্দ্যসুন্দর এক মমতা আর ভালোবাসায় আগলে রেখেছে। পুরো শহরটি সাগরের কোলঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ বৈরুতকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘ইউরোপ’ বলা হয়ে থাকে। বৈরুত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের এলাকা নাখুরা। এখানেই আছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় নিয়োজিত মেরিটাইম টাস্কফোর্সের (এমটিএফ) প্রধান কার্যালয়। গত বুধবার এমটিএফের কার্যালয়ে ঢুকতেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ চোখে পড়ে। লাতিন ভাষায় তাতে লেখা ‘নাবিকদের শান্তিস্তম্ভ’। ভূমধ্যসাগরের তীরে নির্মিত এই শান্তিস্তম্ভে উড়ছে জাতিসংঘ, লেবাননসহ আটটি দেশের পতাকা। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের লাল-সবুজের জাতীয় পতাকাও। সাগরের স্বচ্ছ নীল জলরাশির ঢেউ ক্লান্তিহীনভাবে তাতে স্নিগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ার এমন দৃশ্য বাঙালিমাত্রই যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

বর্তমানে এমটিএফের আওতায় বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশ ভূমধ্যসাগরে যুদ্ধজাহাজে টহলের মাধ্যমে দেশটির জলসীমানা পাহারা দিয়ে আসছে। এ দেশগুলোর মধ্যে শুধু বাংলাদেশের দুটি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। একটি জাহাজ হলো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ (বানৌজা) ‘আলী হায়দার’ ও অন্যটি ‘নির্মূল’। দুটি জাহাজে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২৭০ কর্মকর্তা ও সদস্য নিরলসভাবে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। যুদ্ধজাহাজ ছাড়াও লেবাননে নৌ ও বিমানবাহিনীর আরও সাত সদস্য অন্যান্য দায়িত্বে আছেন। সব মিলিয়ে দেশটিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী রয়েছেন ২৭৭ জন।

‘আলী হায়দার’ ও ‘নির্মূল’ পরিদর্শন এবং ইউএন মেডেল প্যারেডে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে নৌবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে লেবানন সফরে রয়েছেন। নৌবাহিনীর প্রতিনিধি দলে আছেন কমডোর এম নাজমুল করিম কিছলু, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আহমেদ সাব্বির নায়হান ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এহসান আহমেদ। সরকারি আদেশে ওই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন চার সংবাদকর্মীও। তাদের ইনস্ট্রাকটর হিসেবে আছেন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এসএম বাদিউজ্জামান।

নৌবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১০ সালের মে মাসে যুদ্ধজাহাজ ওসমান ও মধুমতি প্রথমবারের মতো লেবাননে শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো হয়। ওই ঘটনা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। দুই জাহাজ ওসমান ও মধুমতি ২০১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে সাত হাজার নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ভূমধ্যসাগরের মাল্টিন্যাশনাল এমটিএফে যোগ দেয়। পরে এ জাহাজ দুটি দীর্ঘ চার বছর লেবাননের জলসীমানায় সফলভাবে দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফেরত যায়। তাদের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয় নৌবাহিনীর আরও দুই আধুনিক যুদ্ধজাহাজ আলী হায়দার ও নির্মূল। লেবাননে ইউনাইটেড ন্যাশনস ইন্টিরিম ফোর্স ইন লেবানন (ইউনিফিল) তত্ত্বাবধানে এমটিএফের অংশ নিয়ে অসামান্য অবদানের জন্য ওসমান ও আলী হায়দারকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। একইভাবে বর্তমানে যুদ্ধজাহাজ আলী হায়দার ও নির্মূল এমটিএফের আওতায় লেবাননের জলসীমানায় অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করছে। এ ছাড়া লেবানিজ জলসীমানায় অন্যান্য সন্দেহজনক জাহাজ ও এয়ারক্রাফটের ওপর নজরদারি রাখা ছাড়াও দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজকে উদ্ধারে অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি লেবানন নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

এদিকে, লেবানন সফররত নৌবাহিনীর প্রতিনিধি দলটি বুধবার বৈরুতে ইউনিফিলের ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার মেজর জেনারেল শিভারাম খারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সময় শিভারাম বলেন, লেবাননের জলসীমানায় বাংলাদেশের নৌবাহিনী অসামান্য অবদান রাখছে। এই অঞ্চলের শান্তিরক্ষায় তারা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নিজ দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নের পাশাপাশি তারা জাতিসংঘেরও সুনাম বৃদ্ধি করছে।

নৌবাহিনীর সংশ্নিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ভূমধ্যসাগরে লেবাননের জলসীমায় বাংলাদেশ ছাড়া আরও যে পাঁচটি দেশ এমটিএফের আওতায় কাজ করছে সেগুলো হলো- জার্মানি, গ্রিস, ব্রাজিল, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া। তবে ইউনিফিলের তত্ত্বাবধানে আরও ৩৫টি দেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে লেবাননে দায়িত্ব পালন করছে। তারা রয়েছে স্থলভাগে। সব মিলিয়ে লেবাননে বর্তমানে নিয়োজিত জাতিসংঘের ব্লুহেলমেটধারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা সাড়ে ১০ হাজার। লেবাননে স্থলভাগে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো- ভারত, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ঘানা, নেপাল, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, আর্মেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বেলারুশ, বেলজিয়াম, ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, কলম্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, এস্তোনিয়া, শ্রীলংকা, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, কেনিয়া, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া, কাতার ও সার্বিয়া।

সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে লেবাননে আক্রমণ করে বসে প্রতিবেশী দেশ ইসরায়েল। এরপর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ওই বছর লেবাননে ইউনিফিল নামে শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল, ইসরায়েলি ফোর্সকে লেবাননকে থেকে প্রত্যহার করা, এ অঞ্চলের শান্তিরক্ষা-সম্প্রীতি বজায় রাখা ও নিজেদের সীমানায় লেবাননের সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়তা করা। এর পরও কয়েকবার লেবাননের সঙ্গে নানা ইস্যুতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়ায় ইসরায়েল। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালে এই দু’দেশের মধ্যে সীমানা চিহ্নিত করে দেয় জাতিসংঘ। যা ‘ব্লু লাইন’ নামে পরিচিতি। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ভূমধ্যসাগরের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে জলসীমানা চিহ্নিত করার জন্য বসানো হয়েছে ‘লাইন অব বয়’। তবে এখন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা লেবাননের টেকসই ও দ্রুততর উন্নয়নে নানাভাবে সহায়তা করে যাচ্ছে। যার গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

এ প্রসঙ্গে কমডোর এম নাজমুল করিম কিছলু সমকালকে বলেন, লেবাননে সমুদ্রসীমায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা বিশ্বসভায় আমাদের ভাবমূূর্তি আরও উজ্জ্বল করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে।

বানৌজা আলী হায়দারের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন আফজালুল হক বলেন, বিদেশের মাটিতে দেশের সুনাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারা অত্যন্ত সৌভাগ্যের। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আলাদা সম্মান রয়েছে। লেবাননেও যা ব্যতিক্রম নয়। ভূমধ্যসাগরে বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

নৌবাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, দেশে-বিদেশে নৌবাহিনী সফলতার স্বাক্ষর রাখছে। গত নভেম্বরে প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক সমুদ্র মহড়ার আয়োজন করে এ বাহিনী। যেখানে দেশ-বিদেশের ৪১টি যুদ্ধজাহাজ অংশ নেয়। দেশের জলসীমাকে মুক্ত করার পাশাপাশি বিশ্ব শান্তিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ভূমিকা রাখছে। তবে লেবাননের আগে ১৯৯৩ সালে সর্বপ্রথম মোজাম্বিকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর মধ্য দিয়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নৌবাহিনীর পথচলা শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্বের সাতটি মিশনে নৌবাহিনীর ৫০৭ সদস্য পর্যবেক্ষক, স্টাফ অফিসার, কন্টিনজেন্ট সদস্য হিসেবে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত।

২৭০ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী পেলেন জাতিসংঘ শান্তিপদক :লেবাননে যুদ্ধজাহাজ ‘আলী হায়দার’ ও ‘নির্মূলে’ দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২৭০ সদস্য গতকাল বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ শান্তিপদক পেয়েছেন। শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশি কন্টিনজেন্ট ব্যানকন-৮-এর আওতায় তারা লেবাননে ইউনিফিলের তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন। লেবাননের স্থিতিশীলতা ও জলসীমানার নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় এই পদক দেওয়া হয়। এমটিএফ কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল সার্জিও ফার্নানডো বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পদক পরিয়ে দেন।

সৌজন্যে : সমকাল

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

14 4 2026 9090003

বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) তীব্র সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি …

Leave a Reply

Your email address will not be published.