মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ২০ মে ২০১৭ । ০৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৪
মানুষ মাত্রই মরণশীল, জন্মের পর থেকে অসুখ-বিসুখের সাথে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। আর দিন দিন অসুখ-বিসুখ যতো বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ মৃত্যুকেও জয় করার স্বপ্ন দেখছে। মৃত্যুকে পুরোপুরি জয় না করতে পারলেও মানুষ এটা বিশ্বাস করতে পারে সুচিকিৎসা দিতে বা নিতে পারলে, যে কোন অসুখ বিসুখ সেরে উঠবে।
মানি আর নাই মানি, এটাই সত্যি যে, সুচিকিৎসা দেয়ার মতো যথেষ্ট ডাক্তার, হাসপাতাল, বা সেবার মান, কোনটাই যথেষ্ট নেই আমাদের, আবার আমাদের ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারগুলোর উপর আস্হা হারানোয় সুচিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের লোকজন বিদেশে দৌড়ায়।
সেবা হলো পরম ধর্ম, আমাদের হতভাগা দেশে সেবার মানই সবচেয়ে খারাপ। তাই সামান্য অসুখেও এখন নিজের দেশে চিকিৎসা নিতে নারাজ, অধিকাংশ লোকজন মোটামুটি টাকা যোগাড় করতে পারলেই বিদেশে ছুটে, দিনে দিনে আমাদের সেবার মান কমতে কমতে এখন তা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। এমন খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে, যিনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে এখানে হয়রানির স্বীকার হননি।
ঢাকার বাইরে থেকে রাজধানী ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসা প্রত্যেকটা মানুষকে হাজারটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, প্রথমে প্রচন্ড ট্রাফিক যন্ত্রণা সহ্য করে ঢাকায় পৌঁছাতে গিয়ে রুগীর সাথে থাকা মানুষও রুগ্ন হয়ে পড়ে, তারপরে ডাক্তারের সিরিয়াল নেয়া সেটা তো রীতিমতো আরেক যুদ্ধ। ডাক্তার দেবেন একগাদা পরীক্ষা, আর সেগুলো করাতে হবে তাঁর পছন্দনীয় কোন ডায়গনোষ্টিক সেন্টারে; তারপর সেই রিপোর্ট আসে আবার ভুল। আর ভুল রিপোর্ট দিয়ে সঠিক চিকিৎসা অসম্ভব, তা ডাক্তার যতই অভিজ্ঞ আর নামকরা হোক না কেন।
তারপরে হাসপাতালের পরিবেশ, ডাক্তার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ঔষধের খরচ সব মিলিয়ে মোটামুটি কোন অসুস্হ মানুষসহ তার পরিবারের বারোটা বেজে যায় আমাদের দেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রত্যেকটা মানুষের।
আমার নিজের ছোট একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই, যাতে আশা করি সবাই বুঝতে পারবে কেন টাকা খরচ করে মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যায়, কেন আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার উপর আস্হা রাখতে পারে না লোকজন।
২০০৮ সালের কথা, আমার দ্বিতীয় বাচ্চাটা জন্মের পর পর ভীষণ অসুস্হ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মোটামুটি নামকরা হাসপাতালের নামকরা ডাক্তারদের অধীনেই ছিলাম আমরা, কিন্তু জন্মের পর পর অসুস্হ বাচ্চার রোগ সনাক্ত করতে সময় লেগেছিল ২৫ দিন। আর এরই মধ্যে ভুল পরীক্ষা নিরীক্ষা আর উল্টা পাল্টা চিকিৎসা দিয়ে নবজাতক শিশুর অবস্হা যতটা না খারাপ হবার কথা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি অসুস্হ হয়ে যায় বাচ্চটা। যখন সমস্যা ধরা পড়ে তখন সে প্রায় মৃত্যু পথের যাত্রী। কিছুদিন চিকিৎসা শেষে সে অবশ্য মারা যায়। কী ভয়াবহ ছিল হাসপাতালের সেইসব দিনগুলি, এখনো আমি ভয়ে, রাগে, কষ্টে ঐ হাসপাতালের প্রতি ঘৃণা দূর করতে পারি না! যদিও ঐ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে হাজারো মানুষ সুস্হ হয়ে ফিরছে। কিন্তু আমি আমার চারপাশের সবাইকে ঐ হাসপাতালে যেতে বারণ করি। আমার বিশ্বাস ঐ হাসপাতালে গেলে রোগী ভুল চিকিৎসার কারণেই মারা যাবে। আমি জানি এটা আমার আবেগী চিন্তা, কিন্তু এটাতো সত্যি যে, ওরা আমার আস্হা, বিশ্বাসের জায়গাটা নষ্ট করে দিয়েছে চিরতরে। আমি দেখেছি কি ভয়াবহভাবে কষ্ট দেয়ার, আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার জন্য দায়ী আমাদের ডাক্তার, হাসপাতালগুলো।
বিদেশীদের চিকিৎসা সেবার গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে ভারত। এক্ষেত্রে সবার উপরে আছে বাংলাদেশ। ভারতের সরকারী উপাত্ত বলছে, দেশটিতে চিকিৎসা সেবা নেয়া প্রতি তিন জনের একজন বাংলাদেশী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে আমাদের মানুষের আস্হার অভাব রয়েছে। অভিযোগ আছে অতিরিক্ত ব্যয়েরও। অন্যদিকে ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্হার দ্রুত উন্নতির পাশাপাশি বাংলাদেশীদের জন্য ভিসাপ্রাপ্তিও সহজ করেছে দেশটি। এসব কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ডিজিসিআইঅ্যান্ডএস) একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ভারতে চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারী বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলাদেশী। অর্থ বছরটিতে ভারতে চিকিৎসা নিয়েছে মোট ৪ লাখ ৬০ হাজার জন বিদেশী। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই গেছে ১ লাখ ৬৫ হাজার জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভারতে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। প্রথমত: যোগাযোগ ব্যবস্হা; উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় আসতে যত সময় লাগে, ভারত যেতে তার চেয়ে কম সময় লাগে।
তাছাড়া আমাদের কিছু জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। দক্ষতার অভাবের পাশাপাশি চিকিৎসকদের ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে রোগীবান্ধব নয়। রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে ডাক্তারদের। এসব কারণেই মূলত বেশি সংখ্যক রোগী ভাল চিকিৎসা নিতে ভারতে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া ভারতের তুলনায় রোগীপ্রতি ব্যয়েও বাংলাদেশ রয়েছে উপরে। এছাড়া যে কোন দূরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা আধুনিকায়নে আমরা পিছিয়ে। মূলত: বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার ওপর আস্হা হারানোয় এ প্রবণতা বাড়ছে।
মোট কথা, আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান দিন দিন উন্নতি হওয়ার জায়গায় অবনতি হচ্ছে। এহেন অবস্থায় এটা তো আমি বা আমরা আশা করতেই পারি এদেশের নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে, চিকিৎসা সেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার আরো মনোযোগী হোক। সকল নাগরিকের কল্যাণে সেবা খাতের উপর আরো গুরুত্ব দেয়া হোক, সরকারের পক্ষ থেকে। এতে সবদিক থেকে আমরা লাভবান হবো। দেশের টাকা চিকিৎসার নামে বিদেশে যাবে না, আবার আস্হা বিশ্বাস ফিরে আসবে, সর্বসাধারণের স্বাস্হ্য সেবা নিশ্চিত হবে।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম