মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ০৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ২১ পৌষ ১৪২৩
আমাদের পায়ের নিচেই, এই পৃথিবীর কেন্দ্রের তরল অংশে লুকিয়ে আছে লোহার তৈরি এক সাপ। প্রতি বছরে ৫০ কিলোমিটার ভ্রমণ করছে এই গলিত লোহার স্রোত। বর্তমানে উত্তর গোলার্ধে, আলাস্কা এবং সাইবেরিয়ার দিকে প্রবাহিত হচ্ছে সে। ছবিতে পৃথিবীর উত্তপ্ত কেন্দ্রের ভেতরে কালো তীরচিহ্নগুলো ওই স্রোতকে নির্দেশ করছে।
আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন (AGU) এর বার্ষিক সম্মেলনে জানানো হয়, এই লোহার স্রোত (আয়রন জেট স্ট্রিম) পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের দ্বারা পরিচালিত এবং প্রবাহিত হয়। বিবিসি নিউজকে ডক্টর ক্রিস ফিনলে জানান, এই স্রোত খুবই ঘন ধাতুতে তৈরি, আর একে প্রবাহিত করতে নিশ্চয়ই অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ডেনমার্কের এই গবেষক জানান, এই জেট স্ট্রিম সম্ভবত পৃথিবীর ভেতরে থাকা সবচাইতে দ্রুত বস্তু।
এই স্রোত প্রথম শনাক্ত করে তিনটি স্যাটেলাইট, যারা ছিল ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সোয়ার্ম প্রোগ্রামের একটি অংশ। তাদের কাজ হলো পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র তৈরি করা। এই স্রোত যে শুধু পৃথিবীর কেন্দ্রের লিকুইড আউটার কোরের আয়রন-নিকেল তরলের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাই নয়। নেচার জিওসায়েন্সের এই গবেষণার মতে, এই স্রোতের গতি বেড়ে চলেছে। এর চৌম্বকত্বের কারণেই ধরে নেওয়া হয় সে গলিত লোহায় তৈরি।

বর্তমানে এই স্রোত ৪২০ কিলোমিটার চওড়া এবং তা পৃথিবীর পরিধির অর্ধেক জুড়ে আছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মাঝে এর ঢেউগুলোর দৈর্ঘ্য অজানা কারণে বেড়ে যায় বছরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার। এটার চৌম্বকত্ব এতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে পৃথিবীর কেন্দ্রের ভেতরের অংশের ঘূর্ণনকেও সে প্রভাবিত করা শুরু করেছে।
এই আয়রন জেট স্ট্রিম সম্ভবত ট্যানজেন্ট সিলিন্ডার নামের এক সীমানাকে ঘিরে আছে। এই সীমানা হলো এমন একটি ভৌগোলিক কাঠামো যা এক মেরু থেকে আরেক মেরু পর্যন্ত প্রসারিত এবং তার ভেতরে অবস্থান করছে পৃথিবীর কেন্দ্রের একদম ভেতরের কঠিন অংশটি। একটি বার ম্যাগনেট যেভাবে ছোট ছোট চুম্বককে আকর্ষণ করে এবং নড়াচড়া করাতে পারে, পৃথিবীর কেন্দ্রের চৌম্বক শক্তির কারণে সম্ভবত সেভাবেই প্রবাহিত হচ্ছে এই লোহার স্রোত।
এই লৌহসর্প আবিষ্কার হবার আগেও গবেষকেরা জানতেন যে পৃথিবীর কেন্দ্রের বাইরের দিকের তরল অংশ খুবই গতিময় এবং পরিবর্তনশীল। এই অংশ ২.৩০০ কিলোমিটার পুরু এবং বিভিন্ন ধরণের গলিত ধাতুর স্রোতে পরিপূর্ণ। এর তাপমাত্রা উঠে যেতে পারে ৭,৭৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এই তাপ পৃথিবীর ম্যান্টলের যে স্রোত আছে সেটাকে প্রভাবিত করে, তা আবার টেকটোনিক প্লেটগুলোকে প্রভাবিত করে। বায়ুমন্ডলের ম্যাগনেটোস্ফিয়ার কার্যকরী রাখতেও এর ভূমিকা অসামান্য। ম্যাগনেটোস্ফিয়ার না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণ বলতেই কিছু থাকত না।
পৃথিবীর কেন্দ্রের ব্যাপারে যে আমরা এখনো অনেক অনেক অজ্ঞ, তা আরও ভালোভাবে বোঝা গেল এই গলিত লোহার স্রোত শনাক্ত হবার পর। এটা এমন একটা রহস্য, যা তৈরি করেছে অনেক নতুন প্রশ্ন, যার বেশিরভাগের উত্তরই এখনো জানে না বিজ্ঞান।
-সংগৃহীত
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম