মাস্টারি সংবাদ | শিমুল আহসান
ঐতিহ্য | ১১ নভেম্বর ২০২৩ | ২৬ কার্তিক ১৪৩০

“আরে ভাই, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টাপুর ছড়াই তো আর লেখা হবে না পুকুর না থাকলে। নতুন ছেলেমেয়েরা বৃষ্টিকে কেবল ঝামেলা ভাববে। তাই কিছু পুকুর রাখা দরকার।”
মাত্র তিরিশটি পুকুর টিকে আছে এখন ঢাকায়।
‘৩০০টি পুকুর ছিল ঢাকায়। খাল ছিল ১০০টির বেশি। নদী ছিল চারটি – বৃদ্ধাগাঙ্গিনী বা বুড়িগঙ্গা, নড়াই, বালু নদী আর পাণ্ডুনদী। ৭৫০ সাল মানে পাল আমলে এগুলো সবই ছিল ঢাকায়। ৪১০ বছর ছিল বুদ্ধিস্ট আমল। তারপর সেনরা রাজত্ব করেছে ৬৯ বছর। তবে তারা কোনো পূর্তকাজ মানে উন্নয়ন কাজে সময় দিতে পারেনি। ক্ষমতা সংহত করতেই গেছে তাদের সময়।
তারপর শুরু হয় সুলতানি আমল, পাঠান যুগ হয়ে পৌঁছাই মোগল আমলে। ব্রিটিশ আমলেও কিন্তু পুকুর বা খাল ভরাট নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভীষণই কড়াকড়ি ছিল। কারণ আগুণ নেভানোর উৎস তো ছিল ওগুলোই।

এখনকার ঢাকাকে দেড়-দুইশ বছর আগে বসিয়ে দিন, পুকুর আর খালের ধারে উঁচুউঁচু সব ভবন, ভাবতেই অবাক লাগবে। দেখুন উন্নত দেশগুলোর লোকেরা ওয়াটারফ্রন্ট গড়ে শহরের ইতিউতি। কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, শহর রক্ষার জন্যও প্রয়োজন। আর আমরা পুকুর ভরে ইট-পাথরের জঙ্গল গড়েছি। ঢাকাই বসতির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। সুপেয় জলের সহজলভ্যতাই ছিল এর কারণ।
ঢাকার মাটিতে পানি বিশুদ্ধিকরণ রাসায়নিক যেমন পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামের প্রাচুর্য আছে। তাই ঢাকায় বসতি নেবে মানুষ- ভাবা কঠিন না। জানেন তো মসলিনের জন্য টলটলে সুন্দর পানি দরকার। অনেকের স্মৃতিচারণাতেই পাবেন, ধোয়ার পর মসলিন হয়ে গেল ধপধপে। এছাড়া দেখুন, ঢাবাকা থেকে ঢাকার নামকরণ (ঢাক, ডঙ্কা ইত্যাদি জনশ্রুতি)। ঢাকায় ছিল টিলা আর গজারি মানে শালের বন। ১০-১২ ফুট খুঁড়ে দেখুন ঠিকই পাল আমলের অজস্র স্মৃতিচিহ্ন পাবেন”, কথাগুলো বলছিলেন হাশেম সুফী।
রায়সাহেব বাজারের স্টার হোটেলে প্রতিদিন তিনবেলা খান হাশেম সুফী। বয়স তার পঁচাত্তর। তিনি পড়েছেন বিজ্ঞান, করেছেন প্রশাসনিক দপ্তরে চাকরি, নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র। তবে তার ধ্যানজ্ঞান ঢাকা। ঢাকার ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের তিনি প্রধান নির্বাহী। ১৯৯৩ সালে তার বইয়ের (হাকীম হাবিবুর রহমান-পাচাস বারাস পাহলে, টীকা ও মতামতসহ তর্জমা) ভূমিকা লিখেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। আব্দুর রাজ্জাক লেখেন, ‘তিনি (হাশেম সুফী) সত্যসন্ধানী। আপাত সাধারণ বিষয়েও তিনি মনোযোগী এবং সেগুলোর ভুল সংশোধনে আন্তরিক। আশা করি আগামীতেও তিনি এ ব্যাপারে ধারাবাহিক থাকবেন।’
হৃদযন্ত্রের কিছু গড়বড় ব্যতিরেকে পঁচাত্তর বছর বয়সেও সুফী সাহেব সক্রিয় আছেন। রোকনপুরের (লক্ষীবাজারের কাছে) এক নম্বর বাড়িটি তার। বাড়িতে একলাই থাকেন। দুয়েকবার চুরিও হয়েছে। একবার তো খোয়া গেছে অমূল্য সব পুরোনো মুদ্রা ও নথি। স্টার হোটেলে তার জন্য বাঁধা চেয়ার-টেবিল আছে, খাবার নির্দিষ্ট, সময়ও নির্ধারিত। বিল পরিশোধ করেন দিনেরটা দিনেই। বলছিলেন, ‘ঢাকার লোক নম্রতা পেয়েছে বৌদ্ধদের কাছ থেকে আর পাঠানদের কাছ থেকে পেয়েছে উগ্রতা।’

“মাত্রই তিরিশটি পুকুর টিকে আছে এখন ঢাকায়। বঙ্গভবনের ভিতরের পুকুরটাকেই কিন্তু বলা হয় মতিঝিল (মোতির পুকুর)। বেশ বড় পুকুর। এটি পুব-পশ্চিমে বর্গাকার। মুঘল আমলের পুকুর। ঢাকায় তিন মালিকানার পুকুর ছিল- ব্যক্তিগত, পঞ্চায়েত আর সরকারি। পঞ্চায়েত পুকুরগুলো ছিল জনকল্যাণের জন্য। এসব পুকুরের বেশিরভাগ মসজিদ সংলগ্ন হতো। এগুলোর কোনোটি গোসল করবার, কোনোটি আবার পানীয় জলের। পানীয় জলের পুকুরে লোকে ‘নাইতে’ পারত না। এজন্য তদারকী দল ছিল।
ব্যক্তিগত অনেক পুকুরও কিছু ওয়াকফ করা হয়েছিল। এরপর বলি, আকার ধরেও তিনরকম পুকুর- উত্তর দক্ষিণে বড়, বড় স্কয়ার, ছোট স্কয়ার। প্রথম ভাগেরগুলো বেশি তৈরি হয়েছিল বৌদ্ধ আমলে। গোল তালাবও কিন্তু উত্তর দক্ষিণে বড় ছিল, পরে গোল করা হয়েছে। রাজারবাগ পুকুরও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। বৌদ্ধ আমলের পুকুরগুলো বেশ বড় বড়। তবে নকশায় সেরা মোগলদের পুকুর। ওরা সবকিছুতেই সৌন্দর্য পছন্দ করত। ছোট স্কয়ার পুকুরগুলো মূলত ব্রিটিশ আমলের। সব পুকুরের ধারেই তাল আর নারকেল গাছ লাগানো জরুরী ছিল। কারণ এরা মাটি ধরে রাখে। রাজারবাগ পুকুরের ধারে নারকেল গাছ দেখবেন।
আরো কিছু পুকুর কিন্তু খাল বা নদী ব্লক করে তৈরি হয়েছে। রমনা আর ধানমন্ডি লেক তৈরি হয়েছে পাণ্ডু নদী ব্লক করে,” বলছিলেন হাশেম সুফী।
ছবি : ওয়েব
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম