Home / জাতীয় / আড়াই মাস পর এলো ৫ প্রবাসীর মরদেহ, স্বজনের কান্না
31102611

আড়াই মাস পর এলো ৫ প্রবাসীর মরদেহ, স্বজনের কান্না

৩১ অক্টোবর ২০২৬ বাসস

সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে ফিরেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে মরদেহগুলো পৌঁছায় তাঁদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে। এরপর স্বজনদের কান্না আর আহাজারির মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় জানাজা ও দাফন। প্রিয়জনের নিথর দেহ ফিরে পেলেও স্বজনদের চোখে-মুখে ছিল না স্বস্তি, ছিল শুধু হারানোর বেদনা।

আজসকাল সাড়ে ৮টার দিকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচজনসহ সাত বাংলাদেশির মরদেহ বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে নওগাঁ ও নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল ৩টার দিকে লাশবাহী গাড়িগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।

সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হওয়ার দুই মাস ২২ দিন পর তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরল। আগুনে পুড়ে মরদেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লাগে।

গত ৯ আগস্ট ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছিল। বাকি সাতজনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর শনিবার তাঁদের মরদেহ দেশে আনা হয়।

ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজন হলেন- নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার মো. শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী। নিহত অপর দু’জন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেন।

ঋণের বোঝা, একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা মা

নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকায় বিকেল ৩টার দিকে পৌঁছায় শাহিনের মরদেহ। বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মরদেহ নামানোর অপেক্ষায় ছিলেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বারান্দায় বসে বিলাপ করছিলেন বৃদ্ধ মা নার্গিস বেগম। অন্যদিকে ঘরের ভেতর আহাজারি করছিলেন শাহিনের স্ত্রী মীম বানু। স্বজনেরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় চলতি বছরের এপ্রিলে সমিতি থেকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন শাহিন। সেখানে কাজও পেয়েছিলেন। কিন্তু দেশ ছাড়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় কারখানার আগুন কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ। দুই সন্তানের বাবা শাহিনের মৃত্যুতে পরিবারটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নার্গিস বেগম বলেন, ‘হামার ছাওয়াল অনেক আশা করে, সমিতত থ্যাকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছিল। বিদেশ যাইয়ে কামও পাইছিল। সর্বনাশা আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেল। বুকের ধনটা হামাক র‍্যাখে চলে গ্যালো। কিসের আশায়, ক্যামন করে হামরা বাঁচমু।’

শাহিনের স্ত্রী মীম বানুর জীবনেও এখন নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে কীভাবে দিন কাটবে, সেই চিন্তাই তাঁকে তাড়া করছে। আট মাসের মেয়ে আয়রা এখনো ঠিকমতো বাবাকে চেনার বয়সে পৌঁছায়নি। আর সাত বছরের ছেলে হামিম বুঝতে শুরু করেছে, তার বাবা আর কখনো ফিরবেন না।

সংসারের খরচ জোগাতে এখন অন্যের বাসায় কাজ করতে হচ্ছে মীমকে। একদিকে দুই সন্তানের খাবার, ছেলের লেখাপড়া ও বাড়িভাড়া, অন্যদিকে স্বামীর রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে দিশাহারা তিনি। যে স্বামীর হাত ধরে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর এখন দুই সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে নামতে হয়েছে তাঁকে।

পরে পার-নওগাঁর মরছুলা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে আসরের নামাজের পর শাহিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পার-নওগাঁ মধ্যপাড়া গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়।

ছেলেকে হারিয়ে ঋণ পরিশোধের চিন্তায় বাবা

একই দুর্ঘটনায় নিহত মিনহাজ প্রামাণিকের মরদেহ বিকেল ৪টার দিকে আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ছেলের এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না বাবা আক্কাস প্রামাণিক।

আক্কাস প্রামাণিক জানান, এক বছর আগে সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। দালালচক্রের মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়ার পর এক বছরেও মিনহাজের আকামা হয়নি। মৃত্যুর চার মাস আগে রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় কাজ পান তিনি। সেখান থেকে কিছু টাকা বাড়িতেও পাঠিয়েছিলেন। কাজ করে ঋণ পরিশোধের পর দেশে ফিরে ঘরবাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন ছিল মিনহাজের।

ছেলেকে হারিয়ে এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আক্কাস প্রামাণিক। মাগরিবের নামাজের পর মধ্যবোয়ালিয়া মসজিদ প্রাঙ্গণে মিনহাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

নিহতদের স্বজনেরা জানান, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব ও সাধনগর গ্রামের সাগর আলীর মরদেহও নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য আপাতত পরিবারপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনা খরচে মরদেহগুলো নিহতদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

13 5 26 8

কৃষক কার্ডের মাধ্যমে জানতে পারবেন আগামীকাল বৃষ্টি হবে কি না: প্রধানমন্ত্রী

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ । মাসস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ৪০ লাখ কৃষকের কাছে …