বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | মাসস
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন মানেই একসময় ছিল তারকাদের মিলনমেলা। সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে লড়তেন দেশের জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকারা, এফডিসি পরিণত হতো চলচ্চিত্রাঙ্গনের সবচেয়ে বড় উৎসবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এবারের নির্বাচনে নেই তেমন কোনো ‘হেভিওয়েট’ তারকা প্রার্থী। তারপরও নির্বাচনী আমেজে সরগরম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)।
আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২৬-২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। নির্বাচনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একটি প্যানেলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন আরমান ও রুমানা ইসলাম মুক্তি। অন্য প্যানেলে একই পদে নির্বাচন করছেন শিবা সানু ও জয় চৌধুরী।
আরমান-মুক্তি পরিষদে সহসভাপতি পদে লড়ছেন চিত্রনায়িকা নূতন ও খলনায়ক ইলিয়াছ কোবরা। সহসাধারণ সম্পাদক পদে রিনা খান, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে চুন্নু, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে এম এ পারভেজ চৌধুরী আবীর, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে রাসেল মিয়া, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে মারুফ আকিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খল অভিনেতা কামরুজ্জামান কমল।
এই প্যানেলের কার্যনির্বাহী সদস্য প্রার্থীরা হলেন—মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, দুলারী, রাকা, শারমিন আক্তার, লতিফ (চিতা), নাসরিন, সুশান্ত, শাহীন কমেডি, বাদল শেখ, আরমান খান ও শামীম খান (চিকন আলী)।
শিবা সানু-জয় চৌধুরী পরিষদের সদস্যরা হলেন—সহসভাপতি ডি এ তায়েব ও রোজিনা। সহসাধারণ সম্পাদক পদে সুব্রত, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সনি রহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে পলি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুশফিকুর রহমান কাকন, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে জ্যাকি আলমগীর এবং কোষাধ্যক্ষ পদে লড়ছেন জাদু আজাদ।
এই প্যানেলের কার্যকরী পরিষদের সদস্য প্রার্থীরা হলেন—আলীরাজ, ফরহাদ, শিপন মিত্র, ফিরোজ শাহী, ইয়ামীন হক ববি, হাসান জাহাঙ্গীর, শিরিন শিলা, ফাল্গুনী রহমান জলি, কায়েস আরজু ও কাবিলা।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—দুই প্যানেলেই নেই দেশের বর্তমান সময়ের বড় কোনো তারকা শিল্পী। একসময় যে নির্বাচনে শাকিব খান, মৌসুমী, রিয়াজ, ফেরদৌস কিংবা মিশা সওদাগরের মতো আলোচিত মুখের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হতো, সেখানে এবার প্রার্থীদের তালিকায় সেই তারকাখ্যাতির ঝলক অনেকটাই অনুপস্থিত।
এ কারণেই চলচ্চিত্রাঙ্গনের অনেকের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, শিল্পী সমিতির নির্বাচন কি এখন আর আগের মতো গুরুত্ব বহন করে? কেউ কেউ বলছেন, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট এসব সংগঠন সিনেমা শিল্পের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবার অনেকে মনে করেন, যেসব শিল্পীর কাজ কমে গেছে বা যারা বর্তমানে খুব বেশি ব্যস্ত নন, তারাই মূলত নির্বাচনে সক্রিয় হচ্ছেন। এমনকি বর্তমান সময়ের অনেক জনপ্রিয় তারকা এখনও চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যপদও নেননি।
তারকাদের উপস্থিতি কম হলেও নির্বাচনী পরিবেশে উৎসবের আমেজের কোনো ঘাটতি নেই। এফডিসিতে প্রতিদিনই জমে উঠছে প্রচারণা। প্রার্থীদের পাশাপাশি সেখানে দেখা মিলছে প্রবীণ শিল্পী আলীরাজ, নূতন, রোজিনা, নাসরিন, জ্যাকি আলমগীর, ইলিয়াস কোবরাসহ অনেক পরিচিত মুখের।
এ ছাড়া বর্তমান সভাপতি মিশা সওদাগর, চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ ও ওমর সানীকেও দেখা গেছে নির্বাচনী মাঠে। কেউ অংশ নিচ্ছেন প্রচারণায়, কেউ আবার নাচ-গান কিংবা আড্ডায় যোগ দিয়ে প্রাণবন্ত করে তুলছেন পুরো এফডিসি।
নির্বাচন ঘিরে সংবাদকর্মী ও ইউটিউবারদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। কোনো শিল্পীকে দেখলেই তাকে ঘিরে ধরছেন তারা। কে কী বলছেন, কার সমর্থনে কথা বলছেন, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন—এসব নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা। পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও যোগ করছে নতুন মাত্রা।
এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে এফডিসিতে যেন ছোটখাটো একটি মেলার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু শিল্পীরাই নন, দর্শনার্থী, গণমাধ্যমকর্মী ও সমর্থকদের ভিড়ে মুখর পুরো প্রাঙ্গণ। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এফডিসির ক্যান্টিনেও।
ক্যান্টিন কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যেখানে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি হতো, সেখানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে।
তাদের ভাষায়, ‘এবারের চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তেমন কোনো গ্ল্যামার মুখ দেখতে পেলাম না। তবে আমরা আশা করি, শিল্পীরা এমন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন, যারা সত্যিকার অর্থে কাজ করতে পারবেন। চলচ্চিত্রের মানুষের সঙ্গে যাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে, তারা নির্বাচিত হলে শিল্পেরই উপকার হবে।’
সব মিলিয়ে এবারের শিল্পী সমিতির নির্বাচন এক ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তারকাখচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলেও নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আবহ, আলোচনা-সমালোচনা এবং চলচ্চিত্র পরিবারের মিলনমেলা এখনও এফডিসির অন্যতম আকর্ষণ। এখন দেখার বিষয়, গ্ল্যামারের চেয়ে কাজকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পীরা কাদের হাতে তুলে দেন আগামী দুই বছরের নেতৃত্ব।
আগামীকাল সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার কামাল মো. কিবরিয়া লিপু। ৫৭৩ ভোটার দুটি প্যানেল থেকে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেবেন। কিবরিয়া লিপু ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খোরশেদ আলম খসরু ও বি এইচ নিশান।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম