Home / জাতীয় / চলে গেলেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার
29 6 25 1111

চলে গেলেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫আষাঢ় ১৪৩৩ | মাসস

বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষামূলক টেলিভিশন অনুষ্ঠান বলতে যে কয়েকটি নাম সবার আগে আসে, তার মধ্যে ‘সিসিমপুর’ অন্যতম। ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই অনুষ্ঠানটি শুধু শিশুদের বিনোদনের নতুন দিগন্তই খুলে দেয়নি, বরং আনন্দের মাধ্যমে শেখার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আর এই সাফল্যের পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের অন্যতম ছিলেন শিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার।

বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও পাপেট নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই (ইন্না…রাজিউন)। আজ সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তার মৃত্যুতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম এক শোকবার্তায় যথার্থই বলেছেন, মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রকলায় যেমন নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন, তেমনি পাপেটশিল্পের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের শিশুকিশোরদের মাঝে শিক্ষামূলক বিনোদনের আলো ছড়িয়েছেন।

তিনি আরও বলেন,‘বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ এদেশের গণমাধ্যমের সৃজনশীল বিকাশে তার অবদান অবিস্মরণীয়। সুদীর্ঘকাল ধরে দেশের সাংস্কৃতিক জগৎকে তিনি তার উদ্ভাবনময়তা, মেধা এবং শ্রমনিষ্ঠ সাধনায় ঋদ্ধ করে গেছেন।’

বিশ্বখ্যাত শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘সিস্যাম স্ট্রিট’-এর বাংলাদেশি সংস্করণ হিসেবে সিসিমপুর তৈরি হলেও, এটিকে নিছক বিদেশি অনুষ্ঠানের অনুকরণ হতে দেননি মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি চিফ ক্রিয়েটিভ অ্যাডভাইজার হিসেবে নিশ্চিত করেছিলেন, অনুষ্ঠানটির ভাষা, চরিত্র, পরিবেশ, গল্প ও সাংস্কৃতিক উপাদান যেন পুরোপুরি বাংলাদেশের শিশুদের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়।

মুস্তাফা মনোয়ারের দীর্ঘদিনের পাপেটচর্চা সিসিমপুরকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। তার সৃজনশীল ভাবনায় অনুষ্ঠানে যুক্ত হয় দেশীয় পুতুলনাট্যের নানা উপাদান। বিশেষ করে ‘ইকরির জগৎ’ অংশে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী পাপেটগুলোর নকশা ও নির্মাণে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এই অংশে বাংলাদেশের লোকজ পুতুলশিল্পের সৌন্দর্য ও কল্পনার জগতকে শিশুদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়।

মুস্তাফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন, শিশুদের শিক্ষা কখনও চাপিয়ে দেওয়া যায় না; শেখাতে হলে আনন্দের পরিবেশ তৈরি করতে হয়। সেই দর্শনই প্রতিফলিত হয়েছে সিসিমপুরে। হালুম, টুকটুকি, শিকু ও ইক্রি মিক্রির মতো চরিত্রের মাধ্যমে শিশুদের বর্ণমালা, সংখ্যা, স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পরিবেশ সচেতনতার মতো বিষয়গুলো সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন একটি অনুষ্ঠান, যা ছড়া, বর্ণমালা, সংখ্যা শেখানোর পাশাপাশি বিশেষ করে মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখে।

সিসিমপুর শুধু টেলিভিশনের পর্দাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এটি স্কুল, কমিউনিটি কার্যক্রম, বই, ডিজিটাল কনটেন্ট ও সামাজিক সচেতনতামূলক উদ্যোগে বিস্তৃত হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের কোটি কোটি শিশুর শৈশবের অংশ হয়ে আছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এর আবেদন অটুট রয়েছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই—তিনি বিশ্বমানের একটি শিক্ষামূলক ধারণাকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও শিশুদের বাস্তবতার সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে সিসিমপুর হয়ে ওঠে একেবারেই বাংলাদেশের নিজস্ব। তার সৃজনশীলতা প্রমাণ করেছে, একটি আন্তর্জাতিক ধারণাও স্থানীয় সংস্কৃতির স্পর্শে নতুন পরিচয় পেতে পারে। তাই সিসিমপুরের ইতিহাস লিখতে গেলে মুস্তাফা মনোয়ারের নাম উচ্চারিত হবে এর অন্যতম প্রধান নির্মাতা ও সৃজনশীল স্থপতি হিসেবে।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। চিত্রশিল্পী, পাপেট নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে তিনি দেশের শিল্পাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কর্মজীবনে বাংলাদেশ টেলিভিশন, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও এফডিসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

2 6 6 26 6666

বীরগঞ্জে দেশি পটল চাষে সফল কৃষক আব্দুর রহিম

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ | মাসস জেলার বীরগঞ্জ উপজেলায় কৃষি উদ্যোক্তা যুবক …