Home / সাহিত্য / কবিতা / একগুচ্ছ সাম্প্রতিক কবিতা
mastary-poem

একগুচ্ছ সাম্প্রতিক কবিতা

সৈয়দ শামসুল হক
যতদূর পাঠযোগ্য

খুব টেনে ধরতে হবে— দেখে নাও তবে যদি থাকে!
এক আর দুই তার যোগফল? তবু যে শূন্যই!
শূন্যতাও টানে খুব, উড়ে যেতে পরামর্শ দেয়।
খুব টেনে ধরা গেছে! তাই দ্যাখো থেকে যায়— থাকে!

যখন বেড়াল পড়ে যায় তার নিজস্ব বিপাকে,
যখন রাতের থালা থেকে ওড়ে নক্ষত্রের খই—
তখন পৃথিবী থেকে ঝরে পড়ে যা কিছু অন্যায়!
তারপর শুধু ছাই— ছাইমাখা দেখি কবিতাকে।

যতদূর পাঠযোগ্য ততদূর হয় ধাবমান
আমাদের নিজস্বতা বলে যদি কিছু থেকে থাকে—
অন্ধকার রাতে ওঠে শিকারীর হল্লা আর হৈ—
মশাল জ্বালিয়ে ছোটে মানবের বামন সন্তান।

কিছু নেই! কিচ্ছুতে কিছুই আর নয় ততোধিক—
তবুও অঙ্কের তুমি— পথ হাঁটো তুমুল পথিক!
———–

রবিউল হুসাইন
দুঃখকষ্টই সার ও প্রোটিন

এইযে মানুষ চলছে সুখে নিশ্চিত এক নির্বিবাদে
সামনে সেতুর আধেক জালে নিমজ্জিত
ভেতর থেকে বাইরে তার অপরূপ সাজে সজ্জিত সে
দুঃস্থ-দুঃখী বেহিসেবি অসীম আশার এই সুবাদে
ফেলছে পা সামনের দিকে মুখের হাসি এক ঝলকে
আলোতি মধ্য রাতের লজ্জাবতী তারার সাথী
একনাগাড়ে হাতড়ে নিয়ে পকেট ভরায় অমরাবতী
মনের পুকুর শূন্য জলে কলসি ডোবায় এক পলকে
পাখির সঙ্গে মেঘের ভিতর কী কথা হয় সংগোপনে
মানুষ কোথায় এই ভাদরে শূন্য শ্মশান পড়ে আছ
কেউ মরেনি কেউ করেনি প্রতিবাদের সামনে পিছে
মরণপণের ভূমি দখল অষ্টপ্রহর শুনে শুনে
গ্রামের নদী শুকিয়ে গিয়ে শহরপানে চলে গেছে
নিশীথ রাতে চন্দ্র বাজায় কী করে ওই দুঃখবাদ্য
দুঃখের মতো দুঃখী যে নেই সুখের সুখী অনেক আছে
দুঃখকষ্টই কবির জন্য সার ও প্রোটিন সুষম খাদ্য
———-

মোহাম্মদ সাদিক
জনৈক সাহিত্য সম্পাদক সমীপেষু

একটা মানুষ আর কতটা ঘামের গন্ধে শব্দ সাজলে
কবিতার পাখি শিস দিয়ে ওঠে, আমাকে বলুন
কতটা আগুন পুষে আগুনের সিনায়
কতটা রক্তের দাগ জীবনের ক্ষত
মিশে মিশে একাকার হলে
কবিতার কোমল বাগানে তবে ফুল ফোটে, আমাকে বলুন
আমি প্রতিদিন তিল তিল করে নিজেকে নিংড়ে আনি
লেবুর কোষের মতো প্রাণের কোঠায়
চাপ দিয়ে দেখি
জীবনের রোয়াগুলো কী ভীষণ বেদনায় কাঁদে
তারা কি কবিতা নয়।
হৃদপিণ্ড গভীর ছুরির যন্ত্রণা ঢেলে আমি তাকে
নিষ্ঠুরের মতো কুচি কুচি করে কাটি আর
কবিতার খাতায় খুলে সারি সারি সেসব সাজাই
তারা কি কবিতা নয়?
নদীতে জোয়ার আসে, নিঃসীম প্লাবনে জাগে প্রহরা,
ঢেউ ওঠে, ছন্দে ছন্দে দুলে ওঠা হাওড়ের সুবিশাল বুক
অথবা উজ্জ্বল চোখ জ্বলে দুর্বিনীত সাহসে আবার
মাথা তোলে সাবলীল সূপ্ত শব্দমালা
আমি তার শব্দ শুনি, আমি তার হাতে হাতে রেখে
তরুণ তাঁতির মতো বুনে যাই হৃদয়ের মুগ্ধ মসলিন
তারা কি কবিতা নয়?
কতটা আহত হলে, কত বিষ ঢেলে নিলে বুকের খাঁচায়
রোদের উত্তাপে পোড়া অভুক্ত দুপুর কতটা কঠিন হলে
করাঘাতে কবিতা দোর খোলে, আমাকে বলুন
কবিতায়, শুধু কবিতায় আমি যদি জীবনের সব কথা
খুলে বলি
যদি যোৗবনের সলতে দিয়ে জ্বেলে দিই—
কালের প্রদীপ
যদি বিনিদ্র রাতের চোখ খোলা রাখি
নীরব মতো মৃত্তিকার মতো কিংবা উদ্ভিদের মতো
যদি ছবি আঁকি, জীবনের যন্ত্রণার, উদ্ভব
যদি মহাপ্লাবনের মতো ছুটে-আসা মানুষের মুখোমুখি
একাকী দাঁড়াই, বলি :
হে মানুষ শোনো, রক্ত ও হিংসার দেশ শোনো
যদি তারা শোনে না কখনো, যদি তারা
আমার মৃত্যুর হোলিখেলা শেষে ঘরে ফিরে যায় আর
বিনিময়ে শান্তি নামে
অন্ত সাম্যের মতো শান্তি
তবে কি কবিতা হবে?
তবে কবিতা হবে?
একটা মানুষ আর কতটা ঘামের গন্ধে শব্দ সাজলে
কবিতার পাখি শিস দিয়ে ওঠে, আমাকে বলুন
তপস্যায় তপোবন কতটা সবুজ হলে ইতিহাস ডানা মেলে
আমাকে বলুন।
——–

শেখ নজরুল
হাত ভাড়া করে নিজেকে থাপ্পড়

বলেছিলাম, তোমাকে নিয়ে লিখবো, অবসরে
তোমাকে ছুঁয়েও দেখবো, অবসরে
সবাই তোমাকে যে নামে ডাকে
বলেছিলাম, সেটিও পাল্টে দেবো, একটু অবসরে
পরীক্ষায় সামান্য পাশের জন্য
রাত জেগে-জেগে কত প্রবন্ধ-নিবন্ধ মুখস্থ করেছি
কত যে ভাবসম্প্রসারণের মহড়া দিয়েছি
আর সংকুচিত করেছি নিজেকে, ভাবতে অবাক লাগে!

মনে হয়, হাত ভাড়া করে নিজেকে থাপ্পড় দিই
পুলিশ ভ্যান থেকে সশস্ত্র একজনকে তুলে নিয়ে
পুরস্কার ঘোষিত কোনো সন্ত্রাসীর ঠিকানা দিয়ে বলি—
মহাত্মন, আমার নামে চাঁদ অপহরণের মামলা ঠুকে দিন
আমার জানতে খুব ইচ্ছে হয়
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে
পূর্ণিমার চাঁদ তার কেমন লাগতে পারে!

বলেছিলাম, তোমাকে নিয়ে লিখবো, গভীর রাতে
তোমাকে গোপন সিন্দুকের চাবিটাও হস্তান্তর করবো-
একটি নদীর আত্মকাহিণী মুখস্থ করতে-করতে
সবাই তোমাকে যেভাবে টানাটানি করে
ভেবেছিলাম আমার টানটা হবে, অন্যরকম
কী করবো বলো? এখন তো
ছিন্ন-বিচ্ছিন্নতার গল্প মুখস্থ করতেই, জীবন চলে যাচ্ছে!
———-

কামাল বারি
তুমি নদীমাতৃক

এত আগাছা তোমার সোনার জমিনে!
কঠিন কৃষক,— হাল ছেড়ো না তবুও;
তোমার আছে পলি মৃত্তিকার ঐতিহ্য;
ভয় কী হে! শক্ত হাতে ভাদাল, দুধাল
তুলে ফেলো; প্রকৃত শস্যে ভরবে মাঠ;
বৃষ্টির গুণ ঠিক জানা আছে তোমার;
জানা আছে, এই ব-দ্বীপ জলের ভাষা;
ষড়ঋতুু, খরা-মারি-বন্যা বোঝো তুমি;
বন্য শূকর তাড়াতেও অধিক পটু;
প্রীতির পালে হাওয়া দেখে চিরকাল
বিরুদ্ধ স্রোতও নত হয়— হার মানে;
তুমি প্রতিকূলে দাঁড় বাও, গুন টানো;
তুমি নদীমাতৃক নৌকার হাল ধরো;
তুমি বীজ বোনো— নিজ শস্য তোলো ঘরে।
——————

মাস্টারি বিডি ডটকম
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ । ২৯ ভাদ্র ১৪২৩

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

RABBI

তোমার কাছে ভালো হবো কিরাম করে এবং অতঃপর

মাস্টারি বিডি | শান্তা ইসলাম ফিচার | ১৯ আগস্ট ২০২৩ | ৪ ভাদ্র ১৪৩০ HM Voice (হেড মাস্টার ভয়েস) এ সবশেষ প্রকাশিত গান …

Leave a Reply

Your email address will not be published.