মাস্টারি বিডি । আতাতুর্ক কামাল পাশা
ঢাকা । ২৫ জুন ২০১৮ । ১১ আষাঢ় ১৪২৫
শেখ নজরুল জনপ্রিয় রোমান্টিক কবি হিসেবে আমাদের কাছে বহুল পঠিত। ফুলশুমারি-তে তিনি রোমান্টিকতার flavor দিয়েই তাঁর কাব্যভুবনকে রঙিন করেছেন। তবে এবার শেখ নজরুল হয়েছেন অনেক উন্মুক্ত, আরও প্রগতিশীল, অনেক খোলামেলা, সহজপাঠ্য, অনেক নিবিড়, বেশ নিবেদিতপ্রাণ। এক কথায়, এবার শেখ নজরুল আরো বেশি স্পষ্টবাদী ।
সৃজনশীল শিল্পকর্ম যদি সমাজের অপ্রকাশিত বা অবহেলিত দিকটির আয়না হয়, তাহলে বলতে হয় এ পোস্টমডার্নিজম দ্বান্দ্বিকতার কালবেলায় “ফুলশুমারি” একটি multi-level weaving । যার প্রতি স্তরে রয়েছে বক্তব্যের বৈচিত্র্য, বিচিত্র চিত্রকল্প, দশদিকে গমন বা পরিভ্রমণ, স্বাদেশিকতার সাথে রয়েছে internationalism, Sufism, dialectal materialism। সৃজনশীল বাংলাসাহিত্যে “ফুলশুমারি” নিঃসন্দেহে একটি নতুন নাম। আদমশুমারী, ভোটারশুমারী, অক্ষরজ্ঞানশুমারীর নাম আমরা জানি।কী গণনা হয়- তাও জানা! তবে ‘ফুলশুমারি’ নামটি আমাদের সাহিত্যে একটি পোস্টমডার্নিজম কাজ বলা চলে। ঐতিহ্যের পাল্কিতে চড়ে হাজার বছরের বাংলা এ ধরনের একটি নাম পাবে- এ আমাদের এক নতুন অভিজ্ঞা।
কলাম লেখক, গল্প লেখক শেখ নজরুল আমাদের কাছে কবিতা লেখক কবি হিসেবেই মূলতঃ পরিচিত। আশির দশকের কবি শেখ নজরুল ইতিমধ্যে বাংলা সাহিত্যে বেশ কয়েকটি কাব্য উপহার দিয়ে আমাদের কাছে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ের আত্মবিতর্কিত কবি হিসেবে নিজেকে উন্মোচিত করেন। আত্মবিতর্কিত বলতে তাঁর একই দৃশ্যকল্পে সকালে এক দৃশ্য দুপুরে আর এক দৃশ্য, সাঁঝে অন্য এক বা, নিশীথে আর এক দৃশ্য গোচর হলেও কবি সব দৃশ্যকল্পকেই সমানভাবে সত্য বলে বিবেচিত করছেন। সেই কিশোরীকে তিনি শাহরীক ভিড়ে কখনো দেখেন…
‘বানভাসী শহরে
তুমিও বিজ্ঞাপিত পণ্যে
বহু বহু নামে-দামে. .
(ভিজে যায় বৃষ্টি/১৩)
কখনো দেখেন লোকজ আদিমতায়
‘তোমার অনেক পড়ার ছিলো
দুইটি জোনাক, একটি ঝিঁ-ঝিঁ
তারায়-তারায় খোঁজার ছিলো . .
(শিখেছিলাম, বর্ণমালা/২০)
কখনো আবার দেখেন
‘আমিও সুযোগ বুঝে
তুলতুলে তোর
বুকটা খুঁজে
নেবোই আলো
(তোর কাছে/২২)।
কবি নজরুলের কাছে সভ্যতা এই ব্যস্ত জীবনে এমনই
‘সভ্যতা
পটাস কইরা খুইল্যা দে
বুক দুইডা তোর
উলটাইয়া
পাল্টাইয়া
কামড়াইয়া
কামড়াইয়া
হইবার চাই আধুনিক’
(হরপ্পার পরান/৭৩)
ঠিক একইভাবে শেখ নজরুল তাঁর এক একটি কবিতায় একই দৃশ্যকল্পকে, চিত্রকল্পকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করেন, এটি বুঝতে অবশ্য কবিকে গভীর বোধন-পঠন প্রয়োজন। তিনশ’ কুড়ি পৃষ্ঠার এ বিশাল কাব্যগ্রন্থে তিনি বুনেছেন ২৩৯টি কবিতা। এতো বিশাল কাব্য সংযোজন বেশ সাহসের বিষয় বলতে হয়। বিশাল এ কাব্যকাননে শহর আছে, আছে গ্রাম। আছে উচ্চতম অট্টালিকা, আছে লোকালয়। আছে মৌলিক শস্যবতীর কথা যেমন, ঠিক সেরকমই পোস্টপেইড আন্দোলনের কথা। আছে কৈতরের নিটোল সরল জল, আছে সাইবার ক্যাফে রগরগা সেক্সসাইড, আছে বিশ্বের ভিআইপি বহর।
বরাবরই শেখ নজরুল জনপ্রিয় রোমান্টিক কবি হিসেবে আমাদের কাছে বহুল পঠিত। ফুলশুমারি-তে তিনি রোমান্টিকতার flavor দিয়েই তাঁর কাব্যভুবনকে রঙিন করেছেন। তবে এবার শেখ নজরুল হয়েছেন অনেক উন্মুক্ত, আরও প্রগতিশীল, অনেক খোলামেলা, সহজপাঠ্য, অনেক নিবিড়, বেশ নিবেদিতপ্রাণ। এক কথায়, এবার শেখ নজরুল আরো বেশি স্পষ্টবাদী ।
ফুলশুমারি কাব্যগ্রন্থের ২৩৯টি কবিতার ভাষায় বেশ দেশজ, তরুণ কবিরা যেটিকে post modernism-এর অন্যতম একটি criteria বলে মনে করেন, সেইসব শব্দমালা রয়েছে। সাথে, ঢাকার আঞ্চলিক কথ্য ভাষাও যোগ হয়েছে। রয়েছে দেশজ, গাঁও-গ্রামের শব্দকুঞ্জ। এ ফোঁড় ও ফোঁড়, চকখড়ি, আজব বিরিক্ষে, বগি বগা, লাউ ডগা, হদ্দমগা, ধান ভানা, কুচ-ক্যাচ-ওঠা নামা, জনম কানা, চক্ষু বানা, পাখিয়াল, জংধরা, হূল, তালি (জোড়া দেয়া অর্থে), ভাদর (বাংলা ভাদ্র মাস অর্থে), গণ্ডা-কড়া, পাখনা, ডাকবা, (মাছ পানিতে) খলপায়, আনচান, বানভাসি, ওইডা, পুইড়া, কও তো দেহি, জমিনখানা, ফাও (বিনে পয়সায়), ম্যাও ম্যাও (বিড়ালের ডাক), ধুক-পুক, দরাম (হঠাৎ নিচে পড়ে যাবার শব্দ), হইছো, কেমুন, দাবড়াবে (গ্রামীণ শব্দকে চলতিভাবে ব্যবহার), পরান, ফকফকা (নিটোল, পরিচ্ছন্ন শুভ্র), উলাউলু (অগোছালো), জব্বর, আন্ধার, ধান্ধা (মতলববাজি অর্থে), টিইপ্যা-টুইপ্যা, চুইষ্যা, ওইড়াম (ওই রকম), কাজ-কম্ম (কাজ-কর্ম), খলবলাইয়া, মধ্যিখানে, কেডায়, কোত্তে (কোথা থেকে), গতর, পাংখা, ধবধইব্যা (নিটোল, পরিচ্ছন্ন শুভ্র), রাইত (রাত), পাখাল (দাপাদাপি, ছটফট), ফান্দে (ফাঁদে), কান্দে, কৈতর (কবুতর), কিরপিন (কৃপণ), বিলাইতেছি (বিতরণ), খায়ামু, হট হট (গরু তাড়ানোর শব্দ), লাহান (মতো), ঢকাস-ঢকাস, পাংসে (পানসে, বিবর্ণ), টলটলা, ইত্যাদি শব্দ বেশ প্রাঞ্জলভাবে, কাব্য-প্রবহমানতাকে অক্ষুন্ন রেখে, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্তকে সম্মান দেখিয়ে নিপুণ হাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেই শেখ নজরুলের সার্থকতা। ইদানিং আমাদের তরুণ কবিরা, বিশেষ করে নব্বই পরবর্তী কবিরা কবিতায় নতুন কিছু দেবার জন্য কখনো কখনো এমনসব শব্দ ব্যবহার করেন বা, এমনভাবে ব্যবহার করেন যা বেশ অসংলগ্ন বলে বিবেচিত হয়। অনেক বোদ্ধার মুখে শোনা যায়, যে কোন পরিবর্তন আনতে হলে পূর্বসুরীদের অপভ্রাংশ বা পরিবর্তিত রূপকে সুচিন্তিত এবং universal ও general, এমনকি vulgar -মানুষ-বোধগম্য করে প্রয়োগ করতে হয়। এসব বিভূতিভূষণ থেকে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ করে গেছেন। প্রবীণ কবিরাও করছেন।
এরই সাথে আসে শেখ নজরুলের কিছু সহজ শব্দের নতুন আঙ্গিকে প্রয়োগ, যেমন- হৃৎপোড়া, আতুরলিপি, শব্দকোষিক, হাঁসডাকা (সাঁঝে), হোমমেড, উলাউলু, দুঃখবতী, গোয়ার-বেহিসেবি, পৌরাণিক আঙুলগুলো, জন্মনাম, ঝর্নার বিহঙ্গ, প্রেমতান্ত্রিক, ঠোঁটসমগ্র, পরিবেশবান্ধবী, শৃঙ্গারসিক্ত, ঠোঁটপলিশ, স্বপ্নের কঙ্কাল, কাকভোর, পাপড়িপিরান, ভূমিকম্প, আকাশকম্প, ইতিহাসের কঙ্কন, বৃষ্টিচুম্বন, সন্দেশমন, রোদবোনা, লম্বাছুট ইত্যাদি। সব শেষে অবশ্যই ‘ফুলশুমারি’। এখানে বলা যায়, যারা কবিতার মনযোগি পাঠক, তাদের কাছে এটি সহজ বিবেচ্য যে, বাংলা ভাষাকে যে কেউ যে কোনভাবে নতুন উদ্ভাবনী ধাঁচে খুঁজে (discover) পেতে পারে এবং এসব পাঠকের চোখে তা invent হবেই। কিন্তু নজরুল এখানে যা করেছেন, তাকে সাবলীল, সার্বজনীন বলা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে সম্মান করেই এগিয়ে আসা বলে মেনে নেয়া যায়। আদমশুমারি শব্দটি আমরা বহু আগে থেকে শুনে এসেছি সেখানে ফুলশুমারি শব্দকে অদ্ভুত বলে প্রথমে মনে হলেও ব্যাকরণগতভাবে এটি ব্যবহৃত নয়।
শেখ নজরুলের ত্রিশতম এ সংহিতায় দীর্ঘপথ পরিক্রমনে নজরুল হয়েছেন কিছুটা ঋদ্ধ – যদি বলা যায়, তাহলে বেশ স্বাচ্ছন্দ লাগবে আমার। কারণ আজকের নবীন কবিদের কবিতা যারাই মনযোগ দিয়ে পড়ছেন, তাদেরই মনে হচ্ছে, কবিতা লেখকরা ইচ্ছেমতো উপমান, উপমিত বা, রূপক বা, একরকম জোর করেই চিত্রকল্পগুলো নিজেরা তৈরি করছেন নিজেদের কবিতায়। এগুলো সার্বজনীন বা ধারাবাহিকতার খোলনলচে দিয়ে সহজে যাতায়াত করতে পারে কি না তা তাঁরা যাচাই করার সময়ও বোধকরি পাচ্ছে না। শেখ নজরুল কিন্তু এগুলো পরখ করে দেখার সময় নিয়েছেন, হয়তো যত্নবান হয়েছেন বা, অভিজ্ঞতায় হয়েছেন ঋদ্ধ।
ফুলশুমারিতে কবি হয়েছেন আরো দক্ষ, সুনিপুণ চিত্রকল্পের চিত্রকর। একই কথাকে নতুনভাবে বলবার স্নিগ্ধ সকাল পেয়েছেন।
দেশ মানে তো, দাঁড়িয়ে থাকা
বসার কথা না বলা (দেশ),
লিপজেলে চমকায়
নগরের ঠোঁট (ভিজে যায় বৃষ্টি),
স্রোতস্বিনী নদী দোহনের যুদ্ধ (মানুষে পোষায় না এখন),
বর্গির দিন নেই
তবু, থামেনি ভাগাভাগি
টুকরো-টুকরো কাঁচাসোনা
ঝুলছে কারো গলায়
দুলছে কারো কানে
জমা হচ্ছে ব্যাংকের লকারে
(টুকরো, টুকরো কাঁচাসোনা)
অসুখটার নাম কি
রোদ্দুর
নাকি,
পাখিয়াল সন্ধ্যা . . .
অসুখটার নাম কি
মেঠো চাঁদ
নাকি
জোছনামাখা বুনোফুল
(অসুখটার নাম কি),
কোনটিতে চাই,
শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার
সন্ত্রাস নাকি
বৈশ্বিক কার্বন
(প্রণোদনা)
কলজের ভিতর উইড়া বেড়ায়
জালালি কইতর
পাংখার শব্দে কাঁইপ্যা ওঠে
বুকের আসমান
পাইরবা কি বুঝবার!
(সেইরাম একখান জব্বর গিঁট),
অনাঘ্রাতা বালিকার অপেক্ষায়
শুকাচ্ছে নীলনদ
(তুমি চাইলে কি না হয়),
একাটুকু আজও ঠিকঠাক রঙে
একান্তে একা হলো না
(টান),
পরিপাটি ভাঁজ নেই
চারু-কারুকাজ নেই
পরশুতে আজ নেই
(আমাদের চাওয়াগুলো),
মীমাংসা হোক
অমীমাংসিত করোটির
(দরজা না থাকলে বাড়ি বলা যাবে না, এমন তো নয়),
ঠোঁটপালিশের মতো গৃহপালিত
এমন স্বপ্ন সবাই দেখুক, . . .
অভিজ্ঞ বৃক্ষের বাকল (গৃহপালিত)
আমি কি সত্যিই ফুরিয়ে যাচ্ছি
তোমার ব্যাগে বোতলবন্দি ঘুমে (জলবিনিময়),
যে তুমি, কঙ্কাবতীর মতো
পায়ে পরেছো
ইতিহাসের কঙ্কন
(আমার স্বীকৃতি),
নগরে বারোমাস
নাম পেয়েছি, নাগরিক . . .
কাব্যকুলের পিতার দৈর্ঘ্য
অজানা!
(নাগরিক)।
শেখ নজরুলের কবিতা আমাদের গালে চট্টাস চট্টাস করে নান্দনিকতার থাপ্পর কষে দেন নিজস্ব লালিত্য নিয়ে – পড়লে, অনেকেরই কবিতা পড়তে ভাল লাগবে বৈকি।
আমাদের বোদ্ধাদের সব সময়ই শিল্পের মাঝে একটি জীবনবোধ ও সমাজ সচেতনতা খুঁজে ফেরার প্রবণতা থাকে। এটি কাব্যেই হোক বা, শিল্পের অন্য যে কোন মাধ্যমেই হোক। ‘ফুলশুমারি’ সে দিক দিয়ে আমাদের চারপাশের সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীক জীবনব্যবস্থা, দেশজ বন্ধ্যা শপিংমলসজ্জিত প্রাগৈতিহাসিক আমলাতন্ত্রের বারিধারা বিশ্ববুর্জোয়া সভায় নাগরিক নৃত্যে যে গোলাপজল ছিটাচ্ছে – তার বিরুদ্ধে এক lucid spring বৈকি। এদিক দিয়ে কবি শেখ নজরুল সমসাময়িক।
ফুলশুমারি : শেখ নজরুল/ প্রকাশক : শওকত হোসেন লিটু, পারিজাত প্রকাশনী, ঢাকা/ প্রকাশকাল : বইমেলা, ২০১২,/ মূল্য : ৪০০ টাকা/ পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৩২০ ।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম