Home / এই দিন / সুলতান জন্মধন্য বাংলাদেশ
S+M+Sultan+artist+mbd

সুলতান জন্মধন্য বাংলাদেশ

বিশ্বমানের এ বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছে। তাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।….

smsultanmbd-1-1

মাস্টারি বিডি ।  মাহবুব আহসান শিমুল
ঢাকা । ০৯ আগস্ট ২০১৮ । ২৫ শ্রাবণ ১৪২৫

বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান। বাংলার কৃষক-শ্রমজীবী মানুষ তাঁর ছবিতে অবয়ব পেয়েছে নতুন রূপে, অনন্য আকার-গড়নে।

বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী আগামিকাল শুক্রবার (১০ আগস্ট)। এ গুণী শিল্পী ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মেছের আলী, মা মাজু বিবি। রাজমিস্ত্রী পিতা মেছের আলীর নান্দনিক সৃষ্টির ঘঁষামাজার মধ্য দিয়ে ছোট বেলার লাল মিঞার (সুলতান) চিত্রাংকনে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হয়।

sm+sultan+mbd-6

রাজমিস্ত্রী বাবার সংসারে দারিদ্র্যের মাঝেও ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন এসএম সুলতান। স্কুলের অবসরে বাবার রাজমিন্ত্রী কাজে সহযোগিতা করার ফাঁকে ছবি আঁকতে শুরু করেন। এ সময় তার আঁকা ছবি স্থানীয় জমিদারদের দৃষ্টি আর্কষণ করে। রাজনীতিক ও জমিদার শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালে নড়াইলের জমিদার ব্যারিস্টার ধীরেন রায়ের আমন্ত্রণে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল পরিদর্শনে আসলে তার একটি পোট্রেট আঁকেন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র এসএম সুলতান। মুগ্ধ হন শ্যামাপ্রাসাদসহ অন্যরা। লেখাপড়া ছেড়ে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় গিয়ে ছবি আঁকা ও জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন সুলতান। সে সময় চিত্র সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তার পরিচয় হয়। সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান এসএম সুলতান। ১৯৪৪ সালে আর্ট স্কুল ত্যাগ করে ঘুরে বেড়ান এখানে-সেখানে।

sm+sultan+mbd-7

এ সময় কাশ্মীরের পাহাড়ে উপজাতীয়দের সাথে বসবাস শুরু করেন এবং তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে চিত্রাংকন শুরু করেন। ১৯৪৫-৪৬ সালে ভারতের সিমলায় তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে লাহোরে সুলতানের চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।

smsultanmbd-1১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের জন্য তিনি আমেরিকা যান। এরপর ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের একক ও যৌথ চিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। পাবলো পিকাসো, সালভেদর দালি, পল ক্লী প্রমুখ খ্যাতিমান শিল্পীদের ছবির পাশে সুলতানই এশিয়ার একমাত্র শিল্পী যার ছবি এসব প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হবার সুযোগ লাভ করে।

১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে আসেন সুলতান। শিশু-কিশোরদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চারুকলা শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই নড়াইলে ‘দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৭ সালে স্থপন করেন ‘শিশুস্বর্গ’। এদিকে, সুলতান তার সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ১৯৯২ সালে ৯ লাখ মতান্তরে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট দ্বিতলা নৌকা (ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ) নির্মাণ করেন।

sm+sultan+mbd-9

বিশ্বমানের এ বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছে। তাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

যে কারণে সুলতানের শিল্পকর্ম ছিল বাংলার কৃষক, কৃষাণী, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, মাঠ, নদী, হাওড়, বাওড়, জঙ্গল, সবুজ প্রান্তর ইত্যাদি। চিত্রাংকনের পাশাপাশি বাঁশি বাজাতে পারতেন তিনি।

SMSultan

তাঁর ছবির বলিষ্ঠতার কারণ হিসেবে সুলতান’র বক্তব্য হলো:
আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা…। আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা- মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি যে- আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। …আর এই যত জমিদার রাজা মহারাজা আমাদের দেশের কম কেউ না। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রু্গ্ন কেন?- যারা আমাদের অন্ন যোগায়- ফসল ফলায়।

sm+sultan+mbd-10

তাঁর ছবিতে গ্রামীণ রমণীদের দেখা যায় সুডৌল ও সুঠাম গড়নে। নারীর মধ্যে উপস্থিত চিরাচরিত রূপলাবণ্যের সাথে তিনি শক্তির সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। একই সাথে তাঁর এ ছবিগুলোতে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণী-দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কিছু ক্রুর বাস্তবতা উঠে এসেছে। তাঁর এরকম দুটি বিখ্যাত ছবি হচ্ছে: হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এবং চরদখল(১৯৮৮)।

sm+sultan+mbd-11

তিনি পুষতেন সাপ, বেজি, বানর, খরগোস, মদনটাক, ভলুক, ময়না, গিনিপিগ, মুনিয়া, ষাঁড়সহ বিভিন্ন পশু-পাখি। চিত্রাপাড়ের লালমিয়া শিল্পের মূল্যায়ন হিসেবে পেয়েছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার। এছাড়া ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা পান। সুলতানের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য শিল্পীর মৃত্যুর পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিল্পীর বাসভবন সংলগ্ন ২একর ৫৭ শতক জমির ওপর নির্মিত হয়েছে এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা।

sm+sultan+mbd-3

দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলের কুড়িগ্রামের নিজ বাড়ির আঙিনায় তাকে শায়িত করা হয়।

sm+sultan+mbd-8শিল্পী এসএম সুলতানের বাল্যবয়সের চরিত্র-গঠন সম্পর্কে সাহিত্যিক আহমদ ছফা লিখেছেন:
কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বাভাবিক আকুতি। …শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের বরে অভিশপ্তও।

কিংবদন্তী শিল্পী এসএম সুলতানের ব্যাপারে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন:
তাঁর কাছে অবয়বধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি; তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো ‘আধুনিকতা’, অর্থাৎ তিনি ইউরো-কেন্দ্রিক, নগর নির্ভর, যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্মবিশ্বকে।

sm+sultan+mbd-5

সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সুলতান সংগ্রহশালা চত্বরে আগামিকাল শুক্রবার সকাল ৬ টায় কোরআনখানি, ৭ টায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাড়ে ৮ টায় শিল্পীর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ৮.৪৫ মিনিটে শিশুস্বর্গ মিলনায়তনে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, শিল্পীর ৯৪তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

12 4 2026 66

৯২ তে থামলেন আশা ভোসলে

ঢাকা, রবিবার ১২ এপ্রিল ২০২৬ মাসস প্রয়াত বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলে। বয়স হয়েছিল ৯২। শনিবার সন্ধ্যাবেলা হঠাৎই …

Leave a Reply

Your email address will not be published.