Home / স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা / মাদারীপুরে আছমত আলী খান ফাউন্ডেশন পাল্টে দিলো যাদের জীবনের গল্প
thotkatachikitshambd

মাদারীপুরে আছমত আলী খান ফাউন্ডেশন পাল্টে দিলো যাদের জীবনের গল্প

মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ১৫ নভেম্বর ২০১৬ । ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

২৪ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর ২০১৬ পর্যন্ত ভারতের চেন্নাই শহরে অনুষ্ঠিত ঠোঁট কাটা তালু কাটা এবং ক্রোনিওফ্যাসিয়াল সার্জারির ওপর ১০তম বিশ্ব কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচদিনব্যাপী এই বিশ্ব কংগ্রেসে ৭০টিরও বেশি দেশের ২ হাজার সার্জনগণ অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্লাস্টিক সার্জন ও ম্যাক্রিলোফ্যাসিয়াল চিকিৎসকগণও সেখানে অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ওরাল প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টের হেড ডাঃ জালাল মাহমুদ বিশ্ব কংগ্রেসে তুলে ধরে ছিলেন বাংলাদেশের ঠোঁট কাটা তালু কাটা রোগীদের বর্তমান চিত্র। সারা বিশ্বের নাম করা সার্জনরা ডাঃ জালাল মাহমুদের উপস্থাপনায় জানতে পারেন বাংলাদেশের নাম। তার সঙ্গে জানতে পারে ছোট্ট একটি মফস্বল শহরের সফল ক্যাম্পের কথা। কেমন করে গত দশ বছর ধরে মাদারীপুরে আফ্রিকা ও আমেরিকা থেকে ২০-২৫ জন ডাক্তার এসে প্রতি বছর বিনামূল্যে অপারেশন করে শত শত রোগীর জীবনমান পাল্টে দেয়।
মাদারীপুরের এই বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির একান্ত পারিবারিক উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। কেমন করে এই ক্যাম্পের শুরু হলো-তা জানতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। গল্পটি এরকম-
২০০৬ সালের কথা, আমি তখন নাইরোবিতে Kenya Association of Muslim Medical Professionals (KAMMP)–এর একজন বোর্ড অব ডাইরেক্টর। কেনিয়ার মুসলিম ডাক্তারগণ বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির করে গরীব ও দুঃস্থ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলো। কোন এক বোর্ড মিটিং-এ আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম-আমি বাংলাদেশে ঠোঁট কাটা তালু কাটা রোগীদের জন্য একটা ক্যাম্প করবো – কেনিয়া থেকে নিয়ে যাবো স্বেচ্ছাসেবক, ডাক্তার ও নার্সদের। সেই বোর্ড মিটিং-এ আরও একজন সদস্য আগা খান ইউনিভার্সিটির সার্জারী বিভাগের হেড প্রফেসর তখন তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় তোলে। সেই সমালোচনার মুখে আমি ক্ষান্ত হইনি। ২০০৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের নদী বিধৌত ছোট্ট শহর মাদারীপুরে আবারও ক্যাম্প করার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। প্রথমে আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন বড় ভাই বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের নৌ-পরিবহন মন্ত্রী জনাব শাজাহান খানকে বিষয়টি জানাই। তিনি তখন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি আমাকে সামরিক শাসনের কারণে নিরুৎসাহিত করলেন। তিনি বললেন, সামরিক শাসনের আওতায় তুমি বড় ধরনের লোক সমাগম করতে পারবেনা, ব্যাপকভাবে প্রচারণাও করতে পারবে না, গরীব অসহায় দুঃস্থ রোগীরা যদি তোমার ক্যাম্প সম্পর্কে না জানে তাহলে তুমি ক্যাম্প সফল করতে পারবে না। আমি প্রথমে ভড়কে যাই- ভাবতে থাকি- কী করা যায়! তারপর আমি নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিলাম,  প্রথমতঃ ১৯৯৩-৯৪ সালে সোমালিয়াতে যখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জাতি সংঘের শান্তিবাহিনীতে কাজ করতো-তখন তাদের সঙ্গে আমি নাইরোবিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতাম। ওইসূত্রে আমার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় ছিলো, প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো। দ্বিতীয়তঃ আমি যেহেতু অসহায়, দুঃস্থ গরীব রোগীদের সেবা দিতে চাই মানবিক কারণে সামরিক বাহিনী আমার কাজে বাঁধা দেয়ার কথা নয়। এই দুই পরিকল্পনা মাথায় রেখে ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাদারীপুরে চারদিনব্যাপী বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা শিবির অনুষ্ঠিত হয়। আছমত আলী খান রিসার্স ফাউন্ডেশন সেই ক্যাম্পের আয়োজন করেছিলো। মাদারীপুরে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা শিবির সেই থেকে শুরু।
মাননীয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রী জনাব শাজাহান খান, এমপি-র পৃষ্ঠপোষকতায় ও তাঁর দিক-নির্দেশনায় গত দশ বছর ধরে কয়েক হাজার রোগীর সফল অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে কেনিয়ার ১৬ সদস্যের মেডিকেল টিম যখন বাংলাদেশ বিমান বন্দরে অবতরণ করে তখন আমাকে টেলিভিশন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো, তারা জানতে চেয়েছিলো আমাদের সফলতার গল্প। তারা জানতে চেয়েছিলো-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সোমালিয়ায় বিদেশীদের হত্যা করা হয়- সেখানে এতগুলো বিদেশী ডাক্তার নিয়ে আমি কেমন করে দেশে এলাম। তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম- আমি বাঙালি এটাই আমার বড় সাহস। দেশের গরীব অসহায় দুঃস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিবো- এটাই আমার বড় শক্তি। কারণ এই টিম নিয়ে আমি প্রায় দশটি দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি-তার মধ্যে সোমালিয়ার মতো গৃহযুদ্ধগ্রস্ত দেশেও কাজ করি। সোমালিয়ার যেসব আল-শাবাবের সদস্য আছে- যাদের সন্তান বা আত্মীয়রা অসুস্থ, তাদের চিকিৎসা দিতে হয় আমাদের। সুতরাং ওরা আমাদের কেন মারবে! মানুষের সেবা দেয়া এটাইতো বড় ধর্ম। আমি কখনো ডাক্তারী বিদ্যাকে পেট বাঁচানোর হাতিয়ার হিসেবে নেইনি। আমি ডাক্তার হয়েছি মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে। যার কারণে মাথা উঁচু করে বাঙালি হিসেবে গর্ব করে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়াই রোগীদের সেবা করার জন্য। স্কুলের ক্লাসরুমে, সেমিনার কক্ষে অথবা ছোট্ট ঘরে সূর্যের আলো দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের অপারেশন করেছি সফলভাবে, বিনামূল্যে।
একজন চিকিৎসকের অভিজ্ঞতার ভীষণ প্রয়োজন। তার জ্ঞান, সাহস, দক্ষতা দিয়ে অনেক কঠিন রোগের চিকিৎসা দেয়া যায়। আর জ্ঞানের অভাব হলে সেই চিকিৎসকের কাছে যখন রোগী আসে তখন তিনি অন্য অজুহাত দেখিয়ে কেমন করে চিকিৎসা না দিয়ে ওই রোগীকে ভাগানো যায় সেই ফন্দি করে। এতে করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।
মাদারীপুর ক্যাম্পের এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট। যেখানে হাসপাতালে কোন আধুনিক সরঞ্জামাদি নেই, এক্সরে, প্যাথলজি, আইসিইউ এমনকি ভালো অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত নেই- সেখানে দক্ষতা দিয়ে অনেক বড় বড় টিউমারের অপারেশন করা হয়েছে, অনেক জটিল রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
আগেই বলেছিলাম, গত দশ বছর যাবত একান্ত পারিবারিক উদ্যোগে আয়োজিত এই বিনামূল্যের আন্তর্জাতিক মেডিকেল মিশন পরিচালিত হচ্ছে। প্রশ্নহলো, কেন পারিবারিক উদ্যোগে এর আয়োজন করা হয়। এর উত্তর বড়ই স্পর্শকাতর। আমি যখন ভারতে কেরালা রাজ্যে চার্লস পিন্টু ক্লেফট সেন্টারে ট্রেনিং করছিলাম তখন চার্লস পিন্টুর ব্যক্তিগত জীবনী পড়ে জানতে পারি- দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তার নিজের সন্তান Bilateral Cleft Child হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। যার কারণে ডাঃ চার্লস পিন্টু সারাজীবন ভারতে ক্লেফট চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন। ঠিক তেমনি আমার আপন ছোটভাই ঠোঁট কাটা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আমি নিজে একজন ডাক্তার হিসেবে এবং একজন বড় ভাই হিসেবে তার ব্যথা, তার কষ্ট হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি। আর এই বাস্তব ঘটনার মধ্যদিয়ে আমার যা অর্জন হলো- এখন আমি যদি পৃথিবীর কোনো প্রান্তে ঠোঁটকাটা রোগী দেখি-আমি যেন দেখতে পাই আমাদের অত্যন্ত আদরের ছোট ভাইয়ের মুখখানা। তাইতো ঠোঁটকাটা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার জন্য আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই।
আর এখন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জেলা মাদারীপুরে আছমত আলী খানের সেই ঠোঁটকাটা সন্তান নিজেই গড়ে তুলেছেন বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মেডিকেল মিশন।
দশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা দিয়েছি এই ক্যাম্প থেকে। যার বহিঃপ্রকাশ গত অক্টোবরে চেন্নাইতে ১০ম বিশ্ব কংগ্রেসে স্থান করে নিয়েছে এর ফ্রি মেডিকেল মিশন। নিঃসন্দেহে এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বিরাট গর্বের বিষয়- মাদারীপুরবাসীর জন্যে আনন্দের খবর।
সর্বশেষে বলতে চাই, বিদেশ ভ্রমণ ও ঈদের শপিংয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড না গিয়ে সেই অর্থ গরীব মানুষের সেবার জন্য ব্যবহার করা যায়- আর এ ধরনের পরিকল্পনা থাকলে আমাদের দেশের অসহায় মানুষের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে।

-ডাঃ মাহাবুবুর রহমান খান (কাচ্চু খান)

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

4 25 1

শুক্রবার সকালের মধ্যেই বেগম জিয়াকে নেওয়া হবে লন্ডন : ডা. জাহিদ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ মাসস বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য …

Leave a Reply

Your email address will not be published.