শেখ নজরুল। মাস্টারি বিডি ডটকম
৩০ নভেম্বর ২০১৬ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

মহান নেতার আদর্শ গুণাবলী সঙ্গে করেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন এমনকি রাজনৈতিক জীবনও ছিল বর্ণিল। কণ্ঠে ছিলো অপূর্ব মায়াজাল। সেই মায়াজলে মোহবিষ্ট করে তিনি ঘুমন্ত বাঙালিকে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্নে এক করতে পেরেছিলেন। তার ফলাফল এই স্বাধীন বাংলাদেশ।
বাঙালি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয় বহু আগে। কিন্তু ফলাফল ছিলো শূন্য। রাজা শশাঙ্ক থেকে পাল রাজারাও রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হননি। গৌড়ের সুলতান বাঙালি জাতির একটি রূপ দিতে কিছুটা সক্ষম হলেও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। মোগল সম্রাটরা বাঙালির ওপর ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যা বাঙালিরা কখনও মানেনি। জাতি হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পূর্ণতা পায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নের্তৃত্বে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। তাই দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থাকার পরও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নং সাদামাটা বাসভবনে, এবং এখানেই থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি নিজের জন্য কখনো ভাবতেন না। তাঁর সকল ভাবনাই ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে তিনি মানুষকে যেমন বিশ্বাস করতেন তেমনি প্রাণ দিয়ে ভালও বাসতেন। তিনি ছিলেন শোষিত-বঞ্চিত বাঙালিদের হৃৎস্পন্দন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক কোমল ও মহৎ তাঁর ভাবনা দর্শনে ছিল একটি মাত্র চিন্তা কি করে বাঙালিদের গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্ত করা। বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট একবার বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন‘ হোয়াট ইজ ইউর কোয়ালিফিকেশন?’ বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিলেন,‘আই লাভ মাই পিপল।’ তারপর ফ্রস্ট আবার প্রশ্ন কেরেছিলেন,‘হোয়াট ইজ ইউর ডিসকোয়ালিফিকেশন?’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,‘আই লাভ দেম টুমাচ’।
অসীম সাহসিকতার জন্য ব্রিটিশ রাজকবি টেড হিউজ বঙ্গবন্ধুকে টাইগার অব বেঙ্গল বলে অভিহিত করেছেন। বিখ্যাত লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ আঁন্দ্রে মার্লোবঙ্গবন্ধুকে বাঘের বাচ্চার সাথে তুলনা করেছিলেন। আমেরিকার প্রথাবিরোধী কবি এ্যালেন গীনসবার্গ বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতির একজন প্রকৃত নেতা মনে করতেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধী পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছেন,‘শেখ মুজিবুর রহমান সন্মোহনী বাগ্মী ছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক কৌশল আধিপত্য নিয়ে ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোনো বাঙালি নেতা তার সমকক্ষ বা তাকে অতিক্রম করতে পারেননি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহজ সরল জীবন যাপনের মাধ্যমে তিনি নিজকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাঙালিয়ানার প্রবাদপুরুষ হিসেবে। কথাবার্তা, চলনে-বলনে, পোশাক-আসাকে তিনি ছিলেন একজন স্বার্থক বাঙালি। বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে দেশপ্রেম, নিজের ভাষা-সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি প্রবল ভালবাসার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো নেতার চরিত্রে ঘটেনি।
শিল্প-সাহিত্যানুরগী বঙ্গবন্ধু ছিলেন এর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের প্রতি ছিল তাঁর ভালোবাসা ও সু-দৃষ্টি। রবীন্দ্র প্রিয় বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্র সঙ্গীতকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানকে তিনি রণসঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। শুধু তা ই নয় অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এনে ভাতা ও বাসভবন প্রদান করেছেন। কবির নামানুসারে ঢাকার একটি সড়কের নামকরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ। স্বাধীনতার পর কবি র্ফরুখ আহমদকে অনুদান, শিল্পী কমল দাশগুপ্তকে রেডিওতে চাকুরী, কবি জসিমউদ্দীনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদান, অসুস্থ কবি হুমায়ুন কাদির, আবুল হাসান, মহাদেব সাহাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে প্রেরণ করেছিলেন। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লেখার কারণে কবি দাউদ হায়দারকে নিরাপত্তা দিয়ে কলকাতায় প্রেরণ। জেলখানা থেকে মুক্তি দিয়ে কবি আল মাহমুদকে চাকুরীর ব্যবস্থা। নাটকের ওপর থেকে প্রমোদ কর ও সেন্সর প্রথা সহজতর করে দেশে সাংস্কৃতি বিকাশের নতুন দ্বার উন্মোচন করেন।
তাঁর কাছে, অর্থ, সম্পদ, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন ও ঐশ্বর্য সবই ছিল তুচ্ছ। মানুষকে ভালবাসতেন বলেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু থেকে গেছেন মানুষের কাতারেই। এই ভালবাসা মানুষের প্রতি বিশ্বাসই একদিন কাল হলো। মানবিকতা ও মনুষ্যত্বেও ধারক বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিল কোনো বাঙালি কোন দিন তাকে হত্যা করতে পারে না। তিনি সবার কাছে বলতেন সবাই আমার সন্তান তাই কে আমাতে মারতে আসবে। অথচ সব বিশ্বাসকে মিথ্যা প্রমানিত করে ঘাতকরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো।

শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা। জননেত্রী, দেশরত্ন, ভাষাকন্যা ইত্যাদি নানা বিশেষণ তাকে ভূষিত করা হয়। পুরনো দিনের মানুষরা একান্ত নিজের মতো করে বলেন, ‘শেখের বেটি’। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার জন্যে কত প্রকার চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। অনেকের মনে থাকার কথা ১/১১ সরকারের সময় ঢাকা শহরের ২৫ লক্ষ মানুষ শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে স্বাক্ষর দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সততা ও দেশপ্রেমের জন্যে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার কাছে কাজটাই বড়। দেশের সকল জনের কাজ, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে কাজ। আমজনতা নিশ্চিত করে বলতে পারে শেখ হাসিনা আমাদের, শেখ হাসিনার কাজ আমাদের কাজ। শেখ হাসিনার বাংলাদেশের দিকে উন্নত দেশের নেতারা অবাক হয়ে বলেন, মাননীয় শেখ হাসিনা, আপনি তো উন্নয়ন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন। যে মৌল প্রত্যয়গুলো নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন তা কোনোদিনই পরিবর্তিত হয়নি। কয়েকটি মূলসূত্রে এই প্রত্যয়গুলো বিদ্ধৃত। সূত্রগুলো এই মানবতায় বিশ্বাস, শান্তি, প্রীতি, ঐক্য ও সংহতিতে সমাজ-আদর্শের সন্ধান, সর্ববিধ নিপীড়ন, সংকীর্ণতর বিরোধিতা। যে পথ সহজ সরল, যে পথ কেন্দ্র থেকে বহুমুখী সে পথকে একমাত্র পথ হিসেবে গণ্য করা।
বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় ‘ফাউন্ডিং ফাদার অব দ্য ন্যাশন’। আর শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আদর্শের সফল বাস্তবায়ক। এখানে শেখ হাসিনা অনন্য ও অসাধারণ। হাফিংটন পোস্টের ব্লগে শেখ হাসিনা লিখেছেন, জনগণকে রক্ষায় কারও দিকে তাকিয়ে নেই বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্যাটার্নেও সাদৃশ্য খুব বেশি। ত্যাগ, প্রজ্ঞা, ঐক্যচেষ্টা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, ভাবাদর্শেও যুগোপযোগী সমন্বয় ইত্যাদি সবকিছুর দিক দিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পিতা-কন্যার মধ্যে দারুণ সাদৃশ্য মিল। পার্থক্য শুধু প্রেক্ষাপটগত। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেও বিকাশ ঘটেছিল বিজাতীয় পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, আর শেখ হাসিনাকে লড়তে হয়েছে ১৯৭৫-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশি প্রতিবিপ্লবের বেনিফিসিয়ারিদের বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার সর্বাত্মক অপচেষ্টার বিরুদ্ধে।
তবে তাঁদের সবচেয়ে বেশী মিল সরলতায়। বঙ্গবন্ধু যেমন-সরল ছিলেন তেমনি শেখ হাসিনাও সহজ। শক্রকেও তাঁরা সহজে ক্ষমা করে দেন। বঙ্গবন্ধু যেমন বলতেন-আমার সন্তানরা আমারে মারবে না। সেই বিশ্বাস রক্তাক্ত হয়েছিলো ষড়যন্ত্রে।
শেখ হাসিনার বিশ্বাসও কি তাই পিতার মতো? তিনিও কি বিশ্বাস করেন-শত্ররা সব বাইরে, ভেতরে বিশ্বাস। করলে বড় ভুল হবে। ষড়যন্ত্র ছিলো, আছে এবং থাকবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সেই ভয়ের বিষয়টি নতুনকরে উঠে এসেছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। নতুন কোনো ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ, তো আর কাঁদতে পারবে না।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম