মাস্টারি বিডি ডটকম । শেখ নজরুল
ঢাকা । ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩
একটি গাছের সঙ্গে নিঃসঙ্গ লতার
এবং ঝর্ণার সঙ্গে হলো হরিণীর
ফুল-অলি, ফল আর পাখির হয়েছে
কী আশ্চর্য! আমাদেরই বাকি
তোমার আমার শুধু কাবিনের লেখাজোখা
বিবাহ হলো না আমাদের …।
(বৃক্ষমঙ্গল : ৪)
এই সে কবি, নাসির আহমেদ। যাপিত জীবন, স্বপ্ন এবং অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাসে তাঁর কবিতা এক অন্যরকম ব্যঞ্জনায় সম্বৃদ্ধ। কবি আমাদের বোধের গভীরে প্রতিনিয়ত শব্দ কর্ষণ করে চলেছেন। রূপকল্প, শব্দ, ঐতিহ্য-চেতনা তাঁর কবিতাকে উর্বর করেছে, আর ফসল ফলেছে আমাদের ঘরে। সমাজ, স্বদেশ, নিঃসর্গ তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে ছন্দের গভীর ব্যঞ্জনায়। বৃক্ষমঙ্গল গ্রন্থটি প্রকৃতির প্রেমে তাঁর চেতনায় প্রবাহিত হয়েছে। কবির বক্তব্যে তা আরও স্পষ্ট- কবিতার প্রাণশক্তির জন্যে চাই মননের যে অক্সিজেন, তা এক বৃক্ষের নয়, অতীত থেকে বর্তমানে বিস্তৃত অসংখ্য কাব্যবৃক্ষ থেকেই নিঃসৃত।
স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার বারবার ধ্বনিত হয়েছে তাঁর প্রথম গ্রন্থ-’আকুলতা শুভ্রতার জন্যে’র প্রতিটি কবিতায়। অথচ তাঁর বক্তব্য হতাশা ছুঁয়েও শেষ পর্যন্ত জীবনের স্বপ্নকেই সমর্থন করেছে। আর এ জন্যই তিনি দখল করে আছেন বাংলা কবিতার চারণ ক্ষেত্রের অনেকটা-ই।
আজন্ম শব্দের কোলাহলে বসবাস
তবু কেন নৈঃশব্দই এত প্রিয় হলো
জনস্রোতে দিনমান ভাসমান তুই
মানুষ দেখলি না তবু জগৎ সংসারে …।
(তার জন্য শোকগাথা/আকুলতা শুভ্রতার জন্যে)
’আকুলতা শুভ্রতার জন্যে’ কাব্যে কবি প্রেম, ঘৃণা, ভালোবাসা, আলো-অন্ধকার সমানভাবে গ্রথিত করেছেন। একইভাবে মৃত্যুচিন্তার ছায়াপাতও ঘটেছে গভীরভাবে। প্লাটফর্মে মুখোমুখি, স্বপ্নের হালখাতা, অনন্তের ট্রেন, মানুষের জলছবি- এরকম অনেক কবিতাই এই বক্তব্যকে সমর্থন করে।
কবি নাসির আহমেদ জীবনের নেতিবাচক দিক বা যুগের হতাশার মধ্যে আশাবাদ উচ্চারণ করেছেন অনেকটা নির্মোহ দৃষ্টিতে। মানুষ তার অস্তিত্ব থেকে কখনও কখনও অস্তিত্বহীনতার দিকে ধাবিত হয় আর তাই এই নিয়তি তিনি মেনে নিয়েছেন অবলীলায়।
নাসির আহমেদের কবিতা অভিজ্ঞতালব্ধ, তিনি কল্পনাবিলাসী নন তবে যন্ত্রণাদগ্ধ। তাঁর সেই জীবন-যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবিই যেন সমস্ত কবিতার পটভূমি।
পাথরের নির্জনতা ভেঙে দেয়া উজ্জ্বল ঝর্ণার
নিবিড় ছন্দের কাছে বাধা আছে আমার জীবন
সময়ের প্রতিটি উত্থানে থাকি মানুষের গভীর সান্নিধ্যে …।
(ঠিকানা/আকুলতা শুভ্রতার জন্যে)
কবি নাসির আহমেদ ক্লাসিক কবি, তাঁর কবিতায় নতুন বোধ আর ভাবনার সমন্বয় লক্ষণীয়। ভাষা ব্যবহারে তাঁর জন্য প্রত্যয়নযোগ্য অনাগত সমস্ত আবেগ।
আমাকে যেতেই হবে প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যাবো
একটি গন্তব্য খুঁজে জীবনের যাবতীয় ঠিকানা হারাবো।
ইতিমধ্যে হারিয়েছি সামাজিক প্রতিপত্তি প্রথম যৌবন
উপেক্ষার ঠোঁটে তাই বার বার দিতে চাই অস্থির চুম্বন …,
(বাউলের অহংকার)
কবি নাসির আহমেদ যন্ত্রণাক্লিষ্ট কবি। তিনি আর্তস্মরে চিৎকার করে ওঠেন কিন্তু কারণ ব্যাখ্যা করেন না, করার প্রয়োজনও পড়ে না কারণ কবিতার ভাষা পাঠককে কখনোই প্রতারিত করে না। তাই তিনি শিল্পসাধ্য ও তাৎপর্যবোধে ব্যক্তির মধ্যে সমষ্টির স্বপ্ন দেখতে চান।
নাসির আহমেদের সাফল্য ও ব্যঞ্জনা পাঠকচিত্তে সর্বদাই সঞ্চারিত। তাঁর কবিতার ছন্দ ও বাক্যরীতি শাশ্বত দর্শনধর্মী।
কথা দিয়ে কথা রাখে না সবাই এখানে
নীলিমার কাছে কিছু বাকি থাক, নদীও
কিছুটা তৃষ্ণা বয়ে নিয়ে যাক সাগরে
কিছু থাক সেই মেয়েটির কাছে, একদিন
ভালো লেগেছিলো যার পুষ্পিত বাম হাত।
(স্বপ্নের হালখাতা)
কবি প্রেমে উন্মুখ। প্রেমের সমগ্র অস্তিত্বে তার তীব্র ঝংকার। বেদনা মর্মস্পর্শী জিজ্ঞাসা হয়ে ওঠে তার কবিতায়। নাসির আহমেদের চেতনার শুদ্ধতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কবি কিংবা প্রেমিকের তৃষ্ণা কিংবা যন্ত্রণা শিল্পিত রূপে দেশের বুক হয়ে তাঁর চেতনায় প্রতিভাত।
শুভ্রতা মানেই যত অতীত ব্যর্থতা পার হয়ে
আগামী দিনের দিকে মার্চপাস্ট করে যাওয়া স্বপ্নের মিছিল,
শুভ্রতা মানেই এক ব্যাখ্যাতীত সুন্দরের মতো সেই তুমি
স্পর্শাতীত সুন্দরের মোহন প্রতিমা তুমি প্রিয় জন্মভূমি …।
(কবি ও প্রেমিক/আকুলতা শুভ্রতার জন্যে)
কবি নাসির আহমেদের কবিতা রহস্যময় জীবনের অতীন্দ্রিয়লোকে গমনক্ষম। অনুভূতির রাজ্যে টোকা দেবার আঙুলটি তাঁর দৃঢ়। আর অন্তরে প্রবেশের অনুমতি নিয়েই তিনি যে জন্মগ্রহণ করেছেন সে কথা অস্বীকার করার জো নেই।
সবাই আশা ছেড়ে চলে গেছে বলে
ভাবছো আমিও যাবো?
ফেরাবে আমাকে চাতুর্যের ছলে। তা হবে না।
নিশ্চিত জেনেছি আজ হোক কাল হোক শেষতক তুমিই আমার।
তাই তো এই বিরান বাস্তবের আড়ালেই দেখি-
আগামীর গেরস্থালির সবুজ খামার …।
(চিরসবুজ আঙ্গুর তুমি)
কবি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত। একদিকে স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার অন্যদিকে স্বদেশের কান্নারাঙা মুখ তাকে ব্যথিত করে। তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং ভাষা আন্দোলন উঠে এসেছে অত্যন্ত সাবলীলভাবে।
ছিঁড়ছে চাঁদা তারা মার্কা বাতিল পতাকা শক্রর শিবিরে
সূর্যসেনের উত্তরাধিকারী আমি সালাম ও বরকতের বংশধর
আমি যুদ্ধজয়ী বীরের সন্তান
দাঁড়াও আমার পক্ষে হে স্বদেশ, বিনষ্ট শহর।
এসো হত্যাকারী সর্বগ্রাসী এই অন্ধকার …।
(বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে)
নাসির আহমেদের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য-ব্যাকরণবোধ। সঠিক শব্দ আর নানা মাত্রিক ছন্দ তাঁর কবিতাকে উচ্চ মাত্রা দান করেছে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির দেশদ্রোহিতার বাস্তবচিত্র প্রতিবাদে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। গ্রাম থেকে উঠে আসা কবি নাসির আহমেদ নাগরিক জীবনের নানা জটিলতায়ও নিজেকে অনন্ত শান্তির সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন প্রথম থেকেই। নাসির আহমেদের কবিতা তাঁর সামাজিক দর্শনের সরাসরি প্রকাশ।
জীবনকে তিনি ভালোবাসার আয়নায় দেখতে ভালোবাসেন। জীবনকে অনুসন্ধান করেন ঐতিহ্যের আলোয়। তাঁর কবিতায় প্রেমাভাস, উৎকণ্ঠা, আবেগ স্পষ্টত লক্ষণীয়।
এ কারণে তিনি সমসাময়িক কবিদের চেয়ে বাকরীতি ও বিষয় বিশ্লেষণে একটু আলাদা।
সময় এখন শুধু ভালোবাসার শব্দ ছাড়া কাক্ষিত নেই
খ্যাতির মোহ ত্যাগ করেছি, এখন কোমল অনুভূতির
শব্দ দিয়ে গাঁথবো মালা, ক্রুদ্ধ দিনের দিকে এখন ফুল ছুড়বো ফুল …।
(এইটুকু চাই)
মধ্যবিত্ত জীবনের ট্রাজেডিও তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে সুনিপুণভাবে। এই মধ্যবিত্তের জীবন অন্য কারো জীবনের ট্রাজেডির অংশ নয়। নিঃসম্বল ব্যর্থ জীবনের দায় তার একার। কবি বিষাদ থেকে তাকে উত্তীর্ণ করতে চেয়েছেন।
লালনের মরমী গানের মতো কেঁদে ওঠে সেই কবেকার
পাখির ছানা খোঁজা ভর দুপুরের বুনো ছন্দ …
(সূর্যাস্তের গল্প)
প্রেমের কবিতায় কবি নাসির আহমেদ আরও বেশি দূরগামী। প্রেম তাঁকে পোড়ায় বারবার। কিন্তু সেই দহন থেকে তিনি দূরে থাকতে চান না। কষ্ট নিয়েই তিনি বাঁচতে চান আজীবন। কবি নাসির আহমেদ ঐতিহ্যসচেতন হলেও পাশাপাশি তিনি যুগসচেতন কবি। এই প্রতিভা তাঁর ছন্দ দক্ষতায়, তাঁর বিচিত্র চিত্রকল্পে এবং বাক্যের গতিময়তায়।
তৃষ্ণার কাছে চেয়েছিল স্তব্ধতা
সামান্য গতি-পৌঁছাতে দু’জন
অভিন্ন এক লক্ষ্যে;
চাঁদ বলেছিল রাত্রিকে ডেকে-রাত্রি!
কতটা বিরহে ডুবে থাকো তুমি
তোমার কৃষ্ণপক্ষে?
(অনন্ত মৌনতা/নির্বাচিত প্রেমের কবিতা)
অন্তর্জগৎ নাসির আহমেদের কবিতার প্রধান আকর্ষণ। তাঁকে অন্তর এবং বাহির এই দুটো তলের মধ্যে সমন্বয় সাধনে অত্যন্ত সফল। নাসির আহমেদের কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে রাত্রি, জোছনা, ঝর্ণা প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়েছে সফলভাবে এবং এগুলো তাঁর বোধ এবং আত্মা ছুঁয়ে প্রতিবিম্বিত হয়েছে আমাদের সবার হৃদয়ে। তিনি তাঁর কবিতায় জীবনের কথা বলেন, স্বপ্নের কথা বলেন। নাসির আহমেদ কখনো বাউল, কখনো প্রেমিক কখনো অভিমানী। কিন্তু মৃত্যুর অমোঘ হাতছানির কাছে তাঁর বিষণ্নতা আমাদেরকে কষ্ট দেয়। কবি মৃত্যুকে ভয় পান এটি ভাবতেই কষ্ট হয় যখন তিনিই দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন-
মাটি আমি, ধুলো হই কর্ষণে কর্ষণে …!
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম