প্রবন্ধ
পদ্মা নদীর মাঝির কপিলা
মুর্তজা বশীর

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি কালজয়ী উপন্যাস। এর পটভূমি বাংলাদেশের বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চল। এই উপন্যাসের দেবীগঞ্জ ও আমিনবাড়ি পদ্মার তীরবর্তী গ্রাম। উপন্যাসটি কলকাতা থেকে সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা মাসিক পত্রিকায় জৈষ্ঠ্য ১৩৪১ থেকে শ্রাবণ ১৩৪২ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে নয় কিস্তি ছাপার পর প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর পর ১৯৩৬-এর মে মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। পূর্বাশা পত্রিকায় ছাপার সময় দেবীগঞ্জ ও আমিনবাড়ির এই দুটি স্থানের নাম ছিল যথাক্রমে গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী।
হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কৃত প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে যথাক্রমে পদ্মা নদীর মাঝির সুইডিশ ও চেক ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়। তা ছাড়া হাঙ্গেরী, জার্মান ও ডাচ ভাষায়ও উপন্যাসটির অনুবাদ হয়। বাংলাদেশে দুবার পদ্মা নদীর মাঝির চলচ্চিত্র রূপ দেওয়া হয়। ঢাকায় নতুন প্রতিষ্ঠিত এফডিসি প্রাথমিক পর্যায়ে উর্দু ভাষায় নির্মিতব্য যে ছবি করার অনুমতি দেয় তা ছিল এ জে কারদার পরিচালিত জাগো হুয়া সাভেরা (ডে শ্যাল ডন)।

এই চলচ্চিত্রটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝিকে অবলম্বন করে নির্মিত হয় ১৯৫৮ সালে। কিন্তু লেখক যেহেতু হিন্দু ও ভারতীয়, তাই লেখকের নাম ব্যবহৃত হয়নি। কাহিনিকার হিসেবে বিশিষ্ট উর্দু ভাষার কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের নাম উল্লেখ করা হয়। এ জন্য ফয়েজ আহমদ ফয়েজকে প্রচুর সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি অবশ্য গান ও সংলাপ বলার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে গৌতম ঘোষ ১৯৯২ সালে পদ্মা নদীর মাঝির চলচ্চিত্রে রূপ দেন।
স্বামী পরিত্যাক্তা কপিলা কুবেরের শারীরিক পঙ্গু স্ত্রী মালার ছোট বোন। মালার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন সে ছিল কিশোরী, বড় দুরন্ত। তারপর তার বিয়ে হয়েছে, একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নেওয়ার পর আঁতুড়ে মারা গেছে। স্বামী শ্যামাদাস আবার বিয়ে করায় কপিলা চলে এসেছে তার বাবা-মার বাড়িতে। কিন্তু তাদের গ্রাম অকস্মাৎ বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় সে এসেছিল কুবেরের সঙ্গে তার জন্ম থেকে খোঁড়া বোনের সংসারকে দেখতে। সন্ধ্যার অন্ধকারে পদ্মা নদীর নির্জন তীরেই নতুনভাবে কপিলার পরিচয় উদ্ঘাটিত হয় কুবেরের কাছে। পদ্মার বিস্তৃত রহস্যময়তাই যেন কপিলা। পদ্মার জলের স্রোতের মতোই কুবেরের মনে কপিলা যেন বয়ে যায়। কপিলার ছলনাভরা হাসি, রহস্যঘন সংলাপ কুবেরের মনে পদ্মার বিচিত্র বৈশিষ্ট্যই ধরা পড়ে। কপিলা যেন বর্ষার পদ্মার মতো। এই পদ্মার তীরেই গভীর রাতে কপিলা কুবেরকে জানাতে এসেছিল দুঃসংবাদ—কুবেরের প্রতি চুরির অপবাদ। তাই কুবের চলে যেতে চায় সুচতুর, মিষ্টভাষী হোসেন মিয়ার সমুদ্রবুকের উপনিবেশ ময়নাদ্বীপে। সন্ধ্যাকাশে আলোর হাতছানি। পাড়ভাঙা নদীর ঘাট, যেন কপিলার জীবনগাথা। পারের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া ঘাটে বাঁধা নৌকার মতোই নিঃসঙ্গ সে। লাল ডোরাকাটা নীল শাড়ির লালপাড় কোমর জড়িয়ে বাঁ হাত মাথার ওপর রেখে অধীর আগ্রহে খুঁজছে ময়নাদ্বীপ। দূরে দুপাল দেওয়া নৌকা। নিচের অংশটি শূন্যতারই সাদা রং, ওপরের অংশ কপিলার পরনের শাড়ির যৌবনের প্রতিরূপ।


প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি
বেলাল চৌধুরী
আমার গোপন পাপগুলি এতদিন পর
বিরূপ-বৈরিতায় শস্ত্রপাণি হয়ে উঠেছে
এবার তাদের বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে
উচ্চারিত হলো- আমার কঠোর দন্ডাজ্ঞা
আমার মাথার ওপর উত্তোলিত তীক্ষ্ন কৃপাণ
চোখের সামনে জ্বলন্ত লাল লৌহশলাকা
ওদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এবার ওরা অটল
আমার সর্বাঙ্গ ছেঁকে ধরেছে মাছির মতো
বিস্ফোটক দগদগে ঘা পুঁজ আর শটিত গরল
গোপন পাপের শরশয্যায় শুয়ে আমি
নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি- হায় রে জলধারা
কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- নিষ্কৃতি নেই আমার
নির্বাসনে মৃত্যুদন্ড- ঠান্ডা চোখে দেখছি আমি
নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ ।

আবার যখন দেখা হবে
নির্মলেন্দু গুণ
আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই
বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।
এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে,
অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়,
আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে
তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ
দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে
দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।
এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মূর্ছা যেতে চাও
মূর্ছা যাবে, জাগাবো না, নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।
‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।

গাছই শুধু
আসাদ চৌধুরী
গাছই শুধু প্রতিবাদে
নাড়ছে পাতা
মানুষগুলে শান্ত বেড়াল
থাবা চাটে-
কুকুর নিজেই চাটছে নিজের
রক্ত মুখের
ভাবটা এমন হাড্ডি থেকেই
ঝরছে এ খুন।
গাছই শুধু প্রতিবাদে
নাড়ছে পাতা
মানুষ বড়ো শান্ত কেবল
থাবা চাটে।

আমার সময়
নাসির আহমেদ
আমি যে সময়ে বেঁচে আছি
সে সময় এমনই ক্ষুর্ধাত ! খেয়ে নেয় নান্দনিক
আর মানবিক যত বোধ ! এইসব দেখে
চিন্তাশক্তি লুপ্তপ্রায় ;
খুনীদের মুখে অনর্গল দেশপ্রেম
বৃষ্টির ধারায় ঝরে যায় !
বিশ্ব অর্থনীতি আর সমর কৌশল
প্রগতির হন্তারক, নিরন্তর বক্তৃতাবিবৃতি
তারা গনতন্ত্র চায়, এমনই সময় !
এখনো কিছুটা প্রঙ্গা আর সচেতনবোধ নিয়ে
জেগে আছে যারা মৃত্যুহীন এ সময়ে
তারাতো মৃত্যুর খুব কাছে !
সত্যি সত্যি আজো বেঁচে আছে গনতন্ত্রে !

হাত
তসলিমা নাসরিন
আবার আমি তোমার হাতে রাখবো বলে হাত
গুছিয়ে নিয়ে জীবনখানি উজান ডিঙি বেয়ে
এসেছি সেই উঠোনটিতে গভীর করে রাত
দেখছ নাকি চাঁদের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদি দুঃখবতী মেয়ে!
আঙুলগুলো কাঁপছে দেখ, হাত বাড়াবে কখন?
কুয়াশা ভিজে শরীরখানা পাথর হয়ে গেলে?
হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম বর্ষা ছিল তখন,
তখন তুমি ছিঁড়ে খেতে আস্ত কোনও নারী নাগাল পেলে।
শীতের ভারে ন্যুব্জ বাহু স্পর্শ করে দেখি
ভালবাসার মন মরেছে, শরীর জবুথবু,
যেদিকে যাই, সেদিকে এত ভীষণ লাগে মেকি।
এখনও তুমি তেমন আছ। বয়স গেল, বছর গেল, তবু।
নিজের কাঁধে নিজের হাত নিজেই রেখে বলি :
এসেছিলাম পাশের বাড়ি, এবার তবে চলি।

শামুক-বেজির মতো
আশরাফুল মোসাদ্দেক
শামুকের স্বভাবে প্রবিষ্ট হই বেজির ভঙ্গিমায় তাকিয়ে দেখি
এখন দেখছি বদলে যাওয়া হবে না কখনো কোনোদিন আর
সেই রাখালের কথা গেঁথে রাখি যার বাঁশি ছিল খেজুরের পাতা
যে রাস্তায় ও কখনো হাঁটবে না তাতে ছিল পল্লবিত শ্বেতদ্রোণ
আলাদা পরিচয় ছিল না তার গরু ও ছাগলবিহীন রাখাল
দুপুরের রোদে শিমুলতলায় কাঁচি দিয়ে কুচিকুচি করা ছায়া
অবিশ্বাসের পেখম তুলে নেচে-গেয়ে চলে গেছে মেঘমাখা দিন
লালাভ উত্তুরে মেঘ চোখগুলো উল্টিয়ে তাকায় এখন-তখন

খদ্দর
তারিক সুজাত
পরাধীনতার অন্ধকারে
আলোর শিখায়
একটুকরো বস্ত্রখণ্ডে
ডাকছে আমার পূর্বপুরুষ
মাটির ঘরে অহংকারে
চরকা কাটেন
বজ্রকঠিন দৃঢ় চোখে
শীর্ণ হাতে গভীর মায়ায়
বাপুজি আমার
কবিগুরুর আশ্রমে
কেরোসিনের কুপির আলোয়
দীপ্ত আকাশ মুক্তপ্রাণে
জাগছে ভারত
উপমহাদেশ
একটুকরো বস্ত্রখণ্ডে
জাগছে আমার পূর্বপুরুষ।

আছি
হাসান মাহমুদ
আছি স্বপ্ন আর বিভ্রমে,
অন্ধ প্রকোষ্ঠে পাত্রহীন পানশালায়।
বিভোর কল্পকান্নায়
আছি বিস্রস্ত জোছনায়
লোকালয়ে! ঘরহীন ঘরে
এই নষ্ট পথের পাশে
আছি– তীব্র-ঝাঁঝাঁলো ঘামগন্ধমাখা
যাত্রীর পাশে নিঃসাড় ভাবলেশহীন
আগন্তুকের মতো
চেনা যায়, প্রিয় প্রতিবেশ?

ইচ্ছেরা সব
শাকিলা তুবা
কথা ছিল রাত জাগব খোলা আকাশের নিচে
আধখানা ফানুস তুমি ওড়াবে
বাকিটা নিয়ে যাবে ঘন্টিঘরের পাহারাদার-
ইচ্ছে ছিল কবি হবো
জানি ঘুমোওনি আর শেষরাত্রির পর
তার বদলে কবিতার অত্যাচারী জনক মোহর কেনে
সোনার মোহরে তোমার ঘুম লেগে আছে, হুঁশিয়ার!
ভেবেছিলাম নীলাম্বর বালুচরীর কারুকাজ হবো
মহার্ঘ্য কিছু দুঃখ ওতে চুবিয়ে সিক্ততা দেখব
তোমার পাশবালিশে বাঁধা পড়েছে ডানা
উড়তে উড়তে প্রজাপতিটা কি দারুণ কাঁপছে।
মন চেয়েছে শুধুই কুঁড়েঘর হতে
পা’য়েতে জড়িয়ে দেব সুখ, অয়ি সখী—
মিলনসুখেও আজ কেন জ্বলে যায় অন্তর!

ময়ূর-বাহনের গল্প
শান্তা মারিয়া
সেই কোন আশ্বিনে বিনতা বলেছিল
কার্তিক ঠাকুর বর হবে তোর,
কত বর্ষা আর রোদের উল্লাস পার হলো
পার হলো কার্তিক তিথি, কোজাগরী রাত—
কার্তিক ঠাকুর আজও এল না।
তবে এক নিবিড় সন্ধ্যায়
সম্ভবত দরজার কলিং বেলে মৃদু সুর তুলে
কেউ বলেছিল, আসতে পারি একান্ত অন্দরে?
না না, কার্পেট মাড়িয়ো না,
জুতো খুলে রাখো বাইরে
তোমার গায়ে ঘামের গন্ধ নেই তো?
এই সব ঝামেলায় কার্তিক ঠাকুর আর এলেন না।
কত বটের ঝুরিতে সুতো বাঁধা হলো
দরগায় মোমবাতি ছড়াল উত্তাপ
প্রজাপতি উড়ে গেল দিগন্তের চক্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে;
করতলে জমে থাকা জমাট বরফ
সমতলকে প্লাবিত করে এগোল না মোহনার দিকে।
কথাগুলো বলে তাকালেন তিনি।
ভীষ্ম অথবা নার্সিসাস
আকাঙ্ক্ষার সড়ক ঘিরে যেই চলাচল করুক
তাদের যাবতীয় বসবাস রয়ে যায়
মানবীর করতলের বাইরে।
কার্তিক ঠাকুরের গল্প তাঁর কণ্ঠে আর শুনিনি।
সে কাহিনি ধ্বনিত হোক বা না হোক
যেকোনো হিম ঝরা রাতে
প্রতীক্ষার সারেঙ্গিতে বাজে মালকোষ
কামিনী সুবাসে ঘন হয় বাতাসের রং
ময়ূর পেখম মেলে নেমে আসা
আদিম দেবতার অট্টহাসিতে
প্রকম্পিত হয় তৃষিত জমিন।

আমাকে ক্ষমা করার আগে তুমি তিনবার ভাবো
শেখ নজরুল
আমাকে ক্ষমা করার আগে
তুমি তিনবার ভাবো
ভুল করলে কিনা?
আমার ভেতরের পশুটা
প্রতিদিন কামড়ের আমন্ত্রণ জানায় আমাকেই
তার কাছে যেতে প্রথম শ্রেণীর ভাড়া পাঠায়
নতুন পোশাকের গন্ধ শোঁকায়
নরম হাতে জুতোর রশি বেঁধে দিতে চায়
বিরতিহীন ঘুমের রাতের রেপ্লিকা পাঠায়
আমাকে মানুষ বলার আগে
তুমি তিনবার ভাবো
ঠিক হলো কিনা?
আমার হাতের আঙুলগুলো ক্রমশ কঠিন হচ্ছে
আমার বুকের পশমগুলো ক্রমশ খাড়া হচ্ছে
আমার চোখদুটি ক্রমশ রাতের দরজার মতো
ওপরে নিচে তালাবদ্ধ হচ্ছে
আমার পা দুটিতে ক্রমশ লাথির কৌশল বাড়ছে
আমার ঠোঁটদুটি প্রতিদিন অসংখ্যবার শুকিয়ে যাচ্ছে।
আমার দিকে তাকানোর আগে
তুমি তিনবার ভাবো
আমি কিন্তু মুখোশ পরা শিখে গেছি!

তোমার পৃথিবীর সাধ
কামাল বারি
অপেক্ষায় থাকো- ডাকবো তোমাকে;
আমার হীরামন আয়োজন জমবে অভিষেকে;
মৃত্যুর রঙ নেই- তবু আমি শতরঙে শতরূপে
উঠবো সেজে;
যে পাখি সুখের সাজি অপেক্ষায় ছিলো!
যে ডাক হায় থেমে গেছে কবে! তবু,
শেষবেলাকার স্বর তুমি জেগে ওঠো-
নতুন সুরে;
সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রকৃত বিনিময়-
তোমার পৃথিবীর সাধ যেন
নিজস্ব রঙে হয়।

গল্প
ফেরা
মিনু চক্রবর্তী

আজ বছর পাঁচেক হল কৌশিকের ডিভোর্স হয়ে গেছে সুমিতার সাথে । সুমিতা তার মেয়ের সাথে আলাদা একটা ফ্ল্যাটে থাকে । যদিও ভালোবেসে কৌশিককে বিয়ে করেছিল সুমিতা কিন্তু কাজপাগল কৌশিকের কাজের পেছনে ছুটে বেড়ানোর নেশা, পরিবারকে সময় না দেওয়া – মেনে নিতে পারেনি সুমিতা । যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি দুজনের সেপারেশান । ডিভোর্স হয়ে গেলেও কৌশিক মেয়ে কৌশানিকে ভুলতে পারেনি কিছুতেই । নিয়মকরে প্রায় প্রতি শনিবার স্কুল ছুটির পর মেয়ের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করে আসে । জানে সুমিতা এসব পছন্দ করেনা । কিন্তু তবুও মন মানেনা কৌশিকের । কৌশিক চেয়েছিল সুমিতা, কৌশানি আর বাবা-মাকে নিয়ে একসাথে থাকতে । কিন্তু বাবা হঠাৎ করে মারা যাবার পর সব যেন ওলটপালট হয়ে গেল । মৃত্যুশয্যায় বাবা কৌশিকের হাত ধরে বলেছিলেন – আমার তৈরী এই কোম্পানিটা আমার স্বপ্ন ছিল । কিন্তু এটাকে বড় করে যেতে পারলাম না। সেই দায়িত্বটা আমি তোমাকে দিয়ে গেলাম । তোমার পরিশ্রম, অধ্যবসায়ে এই কোম্পানি যেদিন ভারতের অন্যতম সেরা কোম্পানি হয়ে উঠবে, জানবে সেদিন আমি শান্তি পাবো । ব্যাস, সেই থেকে কাজের নেশা, কোম্পানিকে বড় করার নেশায় কৌশিক সব ভুলে যেন উন্মাদের মতো হয়ে গিয়েছিল । দশবছরের নিরলস পরিশ্রমে আজ তার কোম্পানি অন্যতম ভারতসেরা । সে ভেবেছিল আর কেউ না বুঝলেও সুমিতা তাকে ঠিক বুঝতে পারবে, কিন্তু ভুল ভেবেছিল । বাবা মারা যাবার পাঁচ বছর পর সুমিতা মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল । সেইসময় কৌশিকের পেছন ফিরে তাকানোর কোনো অবকাশই ছিল না ।
আজ শনিবার মেয়ে বাড়ি যাওয়ার আগে দাড়িয়েছিল স্কুলগেটের সামনে । কৌশানিও জানত বাবা ঠিক আসবে । দুজনে একটা গাছের তলায় বসে কথা বলছে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল কৌশানি ।
— বাবা, মা! …
কৌশিক হতচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। সুমিতা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। এই ক বছরে সুমিতা যেন অনেকটা বুড়িয়ে গেছে। ওর হাঁটার মধ্যে কেমন যেন অবসাদের ছায়া। মুখে বিষন্নতার ছাপ। তবে কি সুমিতা ভালো নেই। কৌশানি অবশ্য বলছিল “জান বাবা মায়ের না অপারেশন হবে” কি হয়েছে সুমিতার। অনেকবার ভেবেছে একটা ফোন করে খবরাখবর জানবে কিন্তু ইগো প্রবলেম। সুমিতাও তো ওকে একবার ফোন করতে পারতো। সুমিতার ঐ সামান্য মাইনেতে ফ্ল্যাট নিয়ে থেকে মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়ানো অসম্ভব। ডিভোর্সের পর প্রথম প্রথম মেয়ের জন্য টাকা দিতে চেয়েছিল কৌশিক কিন্তু সুমিতার আত্মসম্মানবোধ ওই টাকা গ্রহণ করতে দেয় নি।
……..সুমিতা এগিয়ে আসছে। দূর থেকে দেখছে গাছের তলায় কৌশিকের সাথে কৌশানিকে। ও জানতো প্রতি শনিবার ওরা বাপ মেয়ে দেখা করে কিন্তু কোনোদিন ওদের মধ্যে আসেনি ও। কিন্তু আজ যে ওর বড় বিপদ। তাই সম্মান খুইয়ে কৌশিকের মুখোমুখি ওকে হতেই হবে। মা মেয়েতে কেনোমতে ওদের চলে যাচ্ছিল। কেনোদিন কৌশিকের সামনে হাত পাতেনি। যা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে সেইদিকে ফিরেও তাকায় নি কোনেদিন। মেয়েটাকে আঁকড়ে বাঁচবে ভেবেছিল। কিন্তু বিধি বাম। শেষ পর্যন্ত সেই কৌশিকের সামনেই ওকে দাঁড়াতে হচ্ছে। ডিভোর্সের পর একা একটা ফ্ল্যাটে থাকা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছিল। অনেকে সান্ত্বনার ছলে সুযোগ নিতেও চেয়েছিল। কিন্তু সুমিতার ব্যক্তিত্বের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে নি। কাল ওর অপারেশন, কি জানি বাঁচবে কি না। কোলকাতায় একটা বেসরকারী হাসপাতালে অপারেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ওর বাবা রমেন রায়। কিন্তু কৌশানির জন্যই পাঁচ বছর পর আজ কৌশিকের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
………কেমন আছ?
কৌশিকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল সুমিতা।
……..ভালো। তুমি??
কৌশিকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সুমিতা বলল—
……..একটা কথা জানানোর জন্য আজ আমি তোমার সামনে…..
…….বল, কী বলতে চাও?
কৌশিক বলল।
সুমিতা দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে গাছের তলায় বসে পড়লো তারপর ধীরে ধীরে বলল…..
……কাল আমার অপারেশন……
…ব্রেইন টিউমার…….
……..দু’বছর আগে ধরা পড়েছিল, এখন লাস্ট স্টেজ……
জানিনা বেঁচে ফিরবো কি না…..
যদি না বাঁচি তবে মেয়েকে তুমি নিয়ে যেও………
কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগলো সুমিতা।
কৌশিকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। সে হঠাৎ করেই সুমিতার হাতদুটো ধরে কান্নাভেজা গলায় বলে উঠলো…….
……না, না সুমি তোমায় আমি মরতে দেবো না। তুমি বাঁচবে, তুমি আমার জন্য বাঁচবে, আমাদের মেয়ের জন্য বাঁচবে, তোমাকে আমি বিদেশে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করাবো।
——–কিন্তু কৌশিক, আমাদের তো ডিভোর্স হয়ে গেছে।
সুমিতা আস্তে আস্তে বলল।
——–“-ছিঁড়ে ফেলবো আমি ওই ডিভোর্সের কাগজ। জীবনের থেকে তো ওই কাগজ বড় নয়। আবার নতুন করে কাগজ তৈরি হবে। রেজিষ্ট্রির কাগজ। কিন্তু তার আগে তোমাদের পাশপোর্ট ভিসার কাগজ তৈরি করতে হবে।”
এক নিঃশ্বাসে কৌশিক কথাগুলো বলে ফেলল।
* * * * * *
এক সপ্তাহ পর ওদের আবার একসাথে দেখা গেল নেতাজী সুভাষ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। কৌশিক ওদের নিয়ে আমেরিকা যাচ্ছে। সুমিতার অপারেশনটা ওখানেই হবে। কৌশানি আজ খুব খুশি। প্রথম প্লেনে চড়ার আনন্দের থেকেও বাবা মাকে একসাথে পেয়ে।

প্রবন্ধ
আন্তর্জালে, ফেসবুক, বাংলাকবিতা এবং লিটিল ম্যাগাজিনের নতুন দিগন্ত
চিরশ্রী দেবনাথ

বাংলা কবিতা এবং ফেসবুক, সরাসরি দাঁড়িয়ে আছে অনেক জিজ্ঞাসা নিয়ে এখন এই সময়ে। দু হাজার চারসালে ফেসবুক, তারও আগে থেকে শুরু হয়েছে আন্তর্জাল কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যচর্চা। যখন থেকে ব্লগের যাত্রা শুরু হয়েছে, অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত সাহিত্যচর্চার এক নতুন দিগন্ত খুঁজে পেলেন। এই সংখ্যা প্রথমে কম, তারপর আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো। আমি মূলত এখানে বাংলা ভাষা চর্চার কথা বলছি। উন্নত বিশ্বের অভ্যস্ত প্রযুক্তিতে, অনায়াস চর্চা নয়, এ হলো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত প্রযুক্তির ভাঙা হাত ধরে, নিজের ভাষা নিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ। এই সংযোগ ক্রমাগত হয়ে উঠছে বিতর্কিত, প্রশংসিত, নিন্দনীয় এবং সমালোচিত। আর এই সমালোচনার তীরে সর্বপ্রথম বিদ্ধ হচ্ছে বাংলা কবিতা। কবিতা …সম্পাদক এবং প্রকাশক এই ট্রিনিটির বাস্তবতা এবং গ্রহণযোগ্যতাকে রীতিমতো ধূলিসাৎ করে লেখক নিজেই হয়ে উঠছেন নিজের প্রকাশক। এটা উচিত না অনুচিত, এই নিয়ে পাঠকমহল এবং লেখকমহল সরগরম। থাকছেন প্রবীণ লেখক থেকে নতুন দাড়ি গোঁফ গজানো কোমল কবিটিও। এই বিষয়ে মাঝে মাঝে একটি প্রশ্ন প্রায়শই উঁকি দেয়, বাংলা কবিতার পাঠকসংখ্যা কি সত্যিই বিশাল? রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ, এবং স্কুলপাঠ্য বইয়ের আরো কয়েকজন কবি বাদ দিলে সাধারণ মানুষ কি কবিতা পড়ে? আর কোনো আধুনিক কবি নিয়ে কি তাদের মাথাব্যথা আছে?
ফেসবুক বিশ্বের আরো অনেকগুলো স্যোশাল সাইটের মধ্যে অন্যতম একটি স্যোশাল সাইট। কিন্তু বলা যায় এক একচ্ছত্র সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, সে পৃথিবীতে।
কিন্তু ফেসবুক কি বাঙালীর কবিতা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম?
অবশ্যই সেখানে প্রকাশিত হতে পারে, নতুন বইয়ের ঠিকানা, নতুন লিটিল ম্যাগাজিনটির প্রকাশিত হওয়ার সংবাদ, বইয়ের আলোচনা ইত্যাদি, কিন্তু কবিতা নৈব চ, নৈব চ। এসব কিছুর মুখে ছাই দিয়ে, তরুণ তরুণী, মধ্যবয়সী, গৃহবধূ, বৃদ্ধ বৃদ্ধা, সবাই এই প্ল্যাটফর্মকে তাদের কবিতাভূমি করে তুললেন। কেউ কেউ বলছেন কি নির্লজ্জ এরা, অবশ্যই, এটা ক্ষমাহীন নির্লজ্জতা। কারণ, কবি এখানে জোর করে নিজের কবিতা অন্যকে পড়াচ্ছেন। কবিতা সাহিত্যের কোমলতম মাধ্যম। কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দায় সত্যিই কার?
কোন লেখকের কবিতা অকবিতা এবং কার কবিতা সুকবিতা, সেটাই বা কে বলবে। ফেসবুকে অবিরাম ছড়িয়ে পড়ছে আতসবাজি অথবা ছাইয়ের মতো হাজারো পঙক্তি…প্রতিদিন। কোনো কোনো লেখক বা লেখিকাকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি ব্যক্তিগত পরিমণ্ডল। কেউ যদি প্রতিদিন ফেসবুকে কিছুটা সময় দেন এবং অন্যের কবিতায় লাইক কমেন্ট করেন, বিনিময়ে তিনিও পাবেন সম পরিমাণ লাইক কমেন্ট। তার মানে কি হলো বাংলা কবিতার কোনরকম গুরুত্ব থাকলো না।
আবার অন্যভাবে ভাবলে ফেসবুকের এই চরম পরিস্থিতিতে পৌঁছুনোর আগে, নতুন কবিরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন একটি লিটিল ম্যাগাজিনের, একজন সম্পাদকের, যিনি তার লেখাটি মনোনয়ন করবেন এবং তা ছাপা হবে, সেজন্য অপেক্ষায় কাটতো তিন চার মাস, ছয়মাস অথবা একবছর। কখনো কখনো হয়তো সেবারের সংখ্যাটি প্রকাশিতই হলো না।
একজন তরুণ লেখক কবির স্বীকৃতি পেতে পেতে লেখালেখিই ছেড়ে দিতেন হয়তো।
আমরা আমাদের জীবনকে গতির সঙ্গে তাল মেলাতে অভ্যস্ত, খাগের কলম, পাতায় লেখা থেকে ছাপাখানা, বই, এখন কম্পিউটার, যতো দ্রুত পারা যায় এগিয়ে যাচ্ছি। অধিকাংশ লেখাই এখন কলমের পরিবর্তে, কম্প্যুটারে অথবা মোবাইলে টাইপ করে, ই মেলে পাঠানো হয়। এতে ভুল হবার সম্ভাবনা কম, ইমেল সুনিশ্চিত ভাবে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছুবে, হয়তো অতীত আমাদের নস্টালজিক করবে কিন্তু আমরা বর্তমানের সুবিধাটুকুই সাদরে গ্রহণ করবো।
একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও এটুকু বলতে হলো এজন্য যে, গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও হারিয়ে ফেলছি নিজেদের ধৈর্য। লজ্জাহীন ভাবে নিজের কবিতার এক একজন প্রকাশক।

কারণ লেখাটি আন্তর্জালে আসা মাত্র কয়েকহাজার চোখ একে জরিপ করে, একটি লিটিল ম্যাগাজিনে ছাপানো লেখা নিঃসন্দেহে এতো লোকের চক্ষু গোচর হয় না। এই লোভ আমাদের ক্রমশ বেহায়া করে তুলছে। ফলত দেখা যাচ্ছে, কবি সম্মেলন, কৃত্তিবাস কিংবা দেশের মতো ম্যাগাজিনে ছাপানো কবিতাটিও সেই কবির ফেসবুকের ওয়ালে প্রকাশ পাচ্ছে, তখনো হয়তো সেই লিটিল ম্যাগ বা পত্রিকাটির সদ্যজাত সংখ্যাটি বিক্রির অপেক্ষায় কিংবা কোনো কবি সাদরে অপেক্ষা করছেন কখন কপিটি তার মফস্বল শহরের বইয়ের দোকানে এসে পৌঁছুবে এবং তিনি কিনবেন।
সমস্যা বা সুবিধা এখানে একটাই, ফেসবুকে কবিতা দেওয়া যাবে না, এই নিষেধাজ্ঞা জারি করার লোকটি নেই। অসংখ্য মানুষ যারা লেখালেখি ভালোবাসেন কিন্তু সেই আলোটি ছড়াতে পারেননি সেভাবে কোথাও তারা হয়তো, আন্তর্জালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পারছেন। যে বা যে কয়জন তরুণ তরুণী কবিতা সত্যিই বোঝে, কবিতাকে ভালোবাসে প্রাণপণে, কিন্তু কিছুতেই একটি নিজস্ব বা নিজেদের কবিতাপত্র বের করতে পারছে না, তারা খুলে ফেলতে পারছেন একটি ব্লগ, একটি ওয়েব পত্রিকা কিংবা একটি ওয়েবজিন।
এখন বাংলা কবিতার সঙ্গে প্রযুক্তির সংঘাত কতটা যুক্তিযুক্ত, হঠাৎ করে এই যে একদল লেখকলেখিকা “ফেবুকবি “আখ্যায় আখ্যায়িত হয়ে অবাধে লিখে যাচ্ছেন, এবং বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থাও, এই সুযোগকে, খুব ভালো ভাবে কাজে লাগাচ্ছেন, তাদের প্রচেষ্টায় নতুন লেখক লেখিকারা সহজেই বই বের করতে পাচ্ছেন। দুই মলাটের ভিতর নিজেদের লেখক পরিচিতি খুঁজে নিতে চাইছেন ফেসবুক কেন্দ্রিক এইসমস্ত লেখকলেখিকারা। আন্তর্জাল এই পরিচয়, পরিচিতি এবং প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। খুব কি নিন্দার্হ?
কিন্তু নিঃসন্দেহে মানের অধোগমন ঘটছে। কারণ ফেসবুকের লেখায় যত্নের অভাব থাকে। আরো নানারকম ভুল, শব্দ ব্যবহারের, বাক্যগঠনের, কিন্তু তা শুধরোবার চেষ্টা না করেই বই ছাপা হয়ে যাচ্ছে, যা হয়তো কিছুদিন পর বাংলা কবিতার একটি ভুল ক্যানভাস হয়ে উঠতে পারে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।
তবে এই সঙ্গে এটাও প্রবলভাবে ঠিক, এইসব লেখকলেখিকাদের মধ্যে হয়তো আগেও অনেকে কবিতা লিখতেন, কিন্তু প্রকাশের সুযোগ পাননি, এখন ফেসবুকে লিখে, কিছু সংখ্যক পাঠক তাদের লেখাকে কবিতার স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং খুব স্বাভাবিক ভাবে তারাও বই প্রকাশের উদ্যোগ নিচ্ছেন। ঠিক তখনই সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে , এইভাবে কবিতা নাম দিয়ে সবকিছু ছাপিয়ে দেওয়া কি উচিত ?
বাংলা কবিতা ক্রমাগত গভীর অসুখের দিকে যাচ্ছে নাতো?
অথবা একেই কি বলে কবিতার স্বর্ণযুগ, যখন কিছু মানুষ ফেসবুকে অবিরাম অসংখ্য কবিতা লিখে, বাংলা কবিতাকে করে তুলছেন সার্বজনীন, জনপ্রিয়, জ্ঞানে অজ্ঞানে, বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে।
ভাষা স্রোতের মতো, থেমে থাকলেই তা মৃতনদী হয়ে যায়, ফেসবুক সেই কম জনপ্রিয় বাংলা কবিতাকে প্রতিদিন তুমুলভাবে বাঁচিয়ে রাখছে, এসবকিছুরই উত্তর দেবে একমাত্র কাছের ভবিষ্যৎ এবং সময়ই বলবে আজকের ফেবু কবিদের গ্রহণযোগ্যতা।
শুধু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এটুকুই বলা যায়, বাংলা কবিতা আজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়!
তবে আন্তর্জালের এই লেখালেখি, নিঃসন্দেহে আগামীদিনের ছাপানো লিটিল ম্যাগাজিনগুলোর, অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে, বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়েই।
আর পরিবেশবিদদের ভাষায় যদি বলি, বাদ দাও কাগজ, সেখানে লেখা আছে মৃত অরণ্যের কান্না। নাহ্, তা অবশ্যই নয়, ছাপানো কাগজের গুরুত্ব বরাবরই অসীম। কিন্তু সেই ছাপানো কাগজটি কি সব লেখকদের বাড়িতে সযত্নে সংরক্ষিত হয়। জায়গার অভাব,একবার উল্টেপাল্টে দেখার পর, হারিয়ে ফেলা কিংবা অবশেষে পুরনো কাগজের ঝুড়িতে। নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমী মানুষও আছেন, যিনি, তিরিশ বছর আগের লিটিল ম্যাগাজিনটিও সযত্নে রাখেন, হয়তো বা সেটিই হয়ে উঠে আজকের একটি মূল্যবান ফেসবুক পোস্ট।
এই শতকের শুরু থেকে যারা প্রযুক্তির এইসমস্ত সুবিধা নিতে চেয়েছেন, তারা কিন্তু বিস্তর হ্যাপা সামলেছেন। একটি সদ্য জাগ্রত ওয়েব পত্রিকায় লেখা পাঠানোর জন্য তাকে ইন্টারনেট কাফেতে যেতে হতো, এতো মোবাইল আর নেট সংযোগ তখন স্বপ্ন, স্মার্টফোন তখনো বিজ্ঞানীর চিন্তায়। অবশেষে কাঠখড় পুড়িয়ে রীতিমতো পয়সা খরচ করে তাকে পাঠাতে হতো লেখা। অকস্মাৎ এই স্মার্টফোন, ইউনিকোড বদলে দিল চোখের নিমেষে সব।
বাংলা ভাষার প্রথম ওয়েব পত্রিকা, “পরবাস “, প্রথম বাংলা কবিতার ওয়েব পত্রিকা “কৌরব ওনলাইন “।
বর্তমানে, আদরের নৌকা, দলছুট, ইচ্ছামতী, হাতপাখা, নতুন কবিতা, মাসকাবারি, মথ, গুরুচন্ডালী, বাউণ্ডুলে, দ্রঃ বিদ্রঃ, সৃষ্টি র মতো ওয়েবপত্রিকারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রত্যেকটি পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই, ই মেল বা স্যোশাল নেট ওয়ার্কিং সাইটের মাধ্যমে পাঠক এবং লেখকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সগৌরবে। কতজন পাঠক তা পাঠ করলেন সেই সংখ্যাটিও জেনে নেওয়া যাচ্ছে তখুনি। শুধুমাত্র একটি স্মার্টফোনকে অবলম্বন করে সম্পূর্ণ একটি ওয়েব পত্রিকা পড়ে নেওয়া যাচ্ছে, দরকার হচ্ছে না কম্প্যুটর বা ল্যাপটপের।
একটি শীর্ণকায় লিটিল ম্যাগ আজও একজন বা কয়েকজন তরুণ কবির স্বপ্ন, সামান্য টাকা জড়ো করে ছাপানো একটি কবিতাপত্র, এ হলো কবিতার জয়, গৌরব আর অহংকার, কিন্তু আজকের সেই তরুণ বা তরুণেরা কেন ছাপানো পত্রিকার খরচ বাঁচিয়ে একটি ঝকঝকে ওয়েব পত্রিকার স্বপ্ন দেখবে না। সেখানেও সে সম্পাদক। তার হাত দিয়ে কবিতার ঝাড়াইবাছাই হবে। সদ্য লিখতে আসা নবীনের বেশ কয়েকটি কবিতা বাদ যাওয়ার পর একটি কবিতা সেই ওয়েব ম্যাগে স্থান পাবে।এভাবে এখানেও উপস্হিত হতাশা উদ্রেককারী একজন নির্মম সম্পাদক। তাহলে তো কোয়ালিটির সঙ্গে আর কোন আপস রইল না।
তাই সম্পূর্ণ বিনাখরচে একজন কবিতাপ্রেমিক আজ খুলে ফেলতে পারেন একটি আন্তর্জাল পত্রিকা। একটি ব্লগপত্রিকা। ব্লগ খুলতে বিশেষ কোন কারিগরী বিদ্যা লাগে না, দরকার একটি টেমপ্লেট। যা নিজেরাই তৈরি করে নেওয়া যায়। ব্লগস্পট, উইবলি, ওয়ার্ডপ্রেস থেকে
সম্পূর্ণ বিনামূল্যে একটি ডোমেইন নিতে হয়।খুলতে হয় একটি একাউন্ট, দরকার একটি ইউজার আই ডি এবং পাসওয়ার্ড। ব্লগস্পটের ক্ষেত্রে তাও দরকার নেই। জি মেলের আই ডি এবং পাসওয়ার্ড দিয়েই কাজ চলে যায়, কারণ এটি গুগোলের সাইট।

দুইহাজার নয় সালে চালু হয়েছিল, এমনই একটি ব্লগ পত্রিকা “বাক্ “। ব্লগস্পট থেকে এটি তৈরি করা হয়। এটি হলো প্রথম ব্লগজিন। আন্তর্জালে যারা লেখালেখি করেন তারা এই ব্লগপত্রিকাটি সম্বন্ধে নিশ্চয়ই অবগত থাকবেন। মূল্যবান আলোচনা, কবিতায় সমৃদ্ধ ব্লগ পত্রিকা “বাক্ “।
এধরনের আরো কয়েকটি ব্লগ পত্রিকা হচ্ছে, অন্যনিষাদ, অনলাইন কালিমাটি , ই -দুয়েন্দে, ক্ষেপচুরিয়ান্স, দুইহাজার বারো সালের পর থেকে ঘন ঘন আত্মপ্রকাশ করছে এইধরনের ব্লগ পত্রিকা।
এই পত্রিকাগুলোর পাঠকসংখ্যা হাজার হাজার। নানাভাবে লেখালেখি পৌঁছে যাচ্ছে, পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে থাকা পাঠকের কাছে চোখের নিমেষে।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের একটি পরিচিত কমিউনিটি ব্লগ “ঈশানের পুঞ্জমেঘ “উত্তর পূর্বাঞ্চলের বহু কবি, গল্পকার, ঈশানের পুঞ্জমেঘে নিয়মিত লিখছেন। এই ব্লগের একটি সহকারী ব্লগ হচ্ছে “কাঠের নৌকা “।যেকোন লিটিল ম্যাগাজিনের পি.ডি.এফ ফাইল টি এখানে আপলোড করা যায় , যা লিটিল ম্যাগাজিনটির একটি সুরক্ষিত ইতিহাসের দায়িত্ব নেয়।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে, বাংলাভাষার, বাংলাকবিতার চর্চা যে কত গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়, তা সেই দেশের অসংখ্য ঝকঝকে ওয়েব পত্রিকা, ব্লগই প্রমাণ করে। আন্তর্জাল যোগাযোগ করে দিয়েছে, এবং দিচ্ছে, বাংলাভাষার এইসময়ের লেখকলেখিকাদের সঙ্গে, তা তিনি যে দেশেই থাকেন না কেন।
সবথেকে বড়ো কথা অর্থাভাবে কখনো একটি আন্তর্জাল পত্রিকার মৃত্যু ঘটে না, যদি ঘটে তবে তা ঘটবে যারা সেটি খুলেছিলেন, তাদের সদিচ্ছার অভাবে। অনেকেই বলেন আন্তর্জালে লেখা চুরি হয়। আন্তর্জালে আপনার লেখাটি খুব বেশী মাত্রায় সুরক্ষিত জেনে রাখুন। কারণ সেখানে সামান্য একটি বাক্যবন্ধ দিয়ে সার্চ করলেও কে কবে কখন এ ধরনের পোস্ট করেছিলেন তা গুগোল খুঁজে বের করে আনে।
তবুও অনেকেই এখনো বাংলা কবিতা, বিশেষ করে ফেসবুকে এই কবিতা প্রবাহ, ওয়েব পত্রিকায় কবিতার ঝকঝকে উপস্থিতি, সবকিছুর মধ্যেই বিতর্ক, খুঁজে পাচ্ছেন। অকবিতা, নিম্নমানের লিটিল ম্যাগাজিন অতীতেও ছিল, বিতর্ক তখনও ছিল, এখন আরো অধিকমাত্রায় অকবিতা বোধহয় ভালো কবিতাকে আরো বেশী করে সামনে তুলে আনছে আর ছাপানো লিটিল ম্যাগের সঙ্গে একটি আন্তর্জালিক কবিতাপত্র বর্তমান সময়ে লিখিত কবিতার একটি স্থায়ী ভাণ্ডার হয়ে উঠছে, যদি না কখনো সেই অসম্ভব দিন আসে আন্তর্জালের ভবিষ্যতের সুনিশ্চয়তা বা স্থায়িত্ব নিয়ে।
মাস্টারি বিডি ডটকম । ঢাকা । ২৫ জুন ২০১৭ । ১১ আষাঢ় ১৪২৪
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম