ঢাকা, মঙ্গলবার ১২ মে ২০২৬ মাসস
আমরা এক ঘাটেতে রান্দি-বাড়ি, আরেক ঘাটেতে খাই। আমাদের সুখের সীমা নাই! বেদেদের এ প্রচলিত গানের মতোই ছিল তাদের জীবন-যাপন।
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর সংলগ্ন পাঁচ্চর-কাওড়াকান্দি পুরাতন সড়কে (পরিত্যক্ত) গত ২০ বছর ধরে স্থায়ীভাবে ঘর তুলে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের কমপক্ষে অর্ধশত পরিবার। এসব পরিবারে সদস্য সংখ্যা প্রায় আড়াই শতাধিক। ছোট খুপরি ঘরে বসতি শুরু করলেও আর্থিক উন্নতি হওয়ায় এখানকার অনেকেই ঘর তুলছেন বড় পরিসরে।
পরিবারের ছোট শিশুদের পাঠাচ্ছেন কাছের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অথবা মাদরাসায়। তবে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে খুব বেশি লেখাপড়া হয় না। এর আগেই কাজে নেমে পড়ে বেদে পরিবারের শিশুরা। যারা বর্তমানে কিছুটা সচ্ছল, সন্তানদের লেখাপড়া করানোর স্বপ্নও দেখছেন তারা।
বেদেপল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পুরুষেরা। অন্যদিকে খোশ-গল্পে অলস সময় কাটাচ্ছেন নারীরা। পাঁচ্চর সংলগ্ন মাদবরেরচর ইউনিয়নের কাওড়াকান্দি-পাঁচ্চর পরিত্যক্ত সড়কের দুই পাশে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। এর পরেই দুই পাশে ছোট ছোট খুপড়ি ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। ছোট খুপরি ঘরের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ঘরও তৈরি করেছেন অনেকে। সরকারি পরিত্যক্ত এ জায়গায় প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন তারা।
আলাপচারিতায় তারা জানান, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর এলাকার এ বেদে সম্প্রদায় এক সময় নৌকায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। বসবাস করতেন নদীর পাড়ে। তবে শিবচরে আসার পর পরিত্যক্ত সড়কের পাশে থাকতে গিয়ে আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেয়েছেন তারা। দীর্ঘদিন এক স্থানে থাকার ফলে পৈত্রিক পেশারও পরিবর্তন ঘটছে।
স্থানীয় নানান, অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত হয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছলতার মুখ দেখেছে এ সম্প্রদায়। ফলে পুরোনো পেশা বদলে ফেলেছেন অনেকেই। তাবু বা খুপড়ি ঘরের পরিবর্তে বড় ঘরে আধুনিক জীবন-যাপন শুরু করেছে বেদে সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার।
মো. হাসিবুল বলেন, শিবচরে প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস। সরকারি রাস্তার পাশে প্রথমে তাবু করে থাকতাম। প্রথম দিকে আমাদের পৈত্রিক পেশাতেই ছিলাম। তবে এখন আর লোকজন তেমন বিশ্বাস করে না। আয়-রোজগারও তেমন নেই। এরপর থেকেই পেশা পরিবর্তন শুরু হয়। অনেকেই ভ্যান চালায়। আইসক্রিম বিক্রি করে। রাজমিস্ত্রির কাজও করে অনেকেই। এভাবে উপার্জন বাড়ায় আগের পেশা এখন নেই বললেই চলে।
দয়াল সরদার বলেন, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। নৌকায় করে সব জায়গায় যাওয়া যায় না। নৌকা নিয়েই শিবচরের এ এলাকায় এসেছিলাম। এরপর আর নৌকায় ফিরে যাওয়া হয়নি। এখানে জীবনযাত্রা বেশ আধুনিক। আমরা ঘর তুলে স্থায়ীভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে আছি এখানে। ভোটারও হয়েছে অনেকে। আবার স্থানীয় মেয়ে বিয়ে করে অনেকটাই স্থায়ী হয়ে গেছে। আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলেও পাঠাচ্ছি। আগে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। এখন এ এলাকার সমাজের সঙ্গে মিশে আমাদের শিশুরাও স্কুলমুখী হয়েছে।
কুলসুম বলেন, আগে গ্রামে ঘুরে ঘুরে সিঙ্গা লাগাতাম, বাতের ব্যথার ওষুধ বিক্রি করতাম। এখন এসব চলে না। আমাদের সম্প্রদায়ের পুরুষেরা এখন কাজকর্ম করে থাকে। নারীদের মধ্যেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। কিছু নারী গ্রামে বের হলেও সে সংখ্যা কমছে।
স্থানীয়রা জানান, এখানে ৪০/৫০ ঘর বেদের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরেই তারা এখানে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে এখনও সরদার প্রথা রয়েছে। তবে আধুনিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন তারা। পৈত্রিক পেশার পরিবর্তে সাধারণ কাজকর্ম করছেন। সব মিলিয়ে গ্রামের অন্য সাধারণ মানুষের মতোই এখানকার জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা।
সকাল হলেই পরিবারের পুরুষেরা বেরিয়ে পড়েন কাজে। বেদে শিশুরা যায় স্থানীয় মাদরাসায়, কেউ কেউ যায় প্রাইমারি স্কুলে। পৈত্রিক পেশা বদলে ফেলতে প্রাণান্ত চেষ্টা বেদে যুবকদের মধ্যে। আর তাই স্থানীয় নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন তারা। পরিশ্রম করছেন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য। এভাবেই সমাজের মূল ধারার জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা এ সম্প্রদায়ের মানুষের।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম