কার্ল মার্কস : মগজের কোষে কতিপয় পাখি
তখন শৈশব, নিষিদ্ধ ঘোষিত তবু
গোপনে যখন আপনার বই পাচারের ঝুঁকি নিই
আপনাকে তখনো চিনি না
বালকের কাজ ছিল বালখিল্য, বইগুলো পৌঁছে
দেয়া কীর্তিমান পাঠকের হাতে
যে কমিউনিস্ট
যে আপনার বইয়ের বুকে চোখ রেখে
কী এক তৃষ্ণায় ছটফট করত সারারাত
কৌতূহলে মাঝে মাঝে আমি
সেই লাল বইয়ের পৃষ্ঠা খুলে উঁকি মারতাম
আপনার গম্ভীর ছবির চোখে চোখ পড়ে গেলে
ফ্যাকাশে মুখের লজ্জা ঢাকা মুশকিল হতো
মনে হতো জুবিলী স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব
স্কুলপলাতক এই ছাত্রটির মুখোমুখি
হাতে তার লিকলিকে বেত
(যে বেতের নামে শয়তানও সোজা হয়ে যায়
কান খাড়া হয়)
আপনি কি কোনোদিন প্রধান শিক্ষক ছিলেন কোথাও?
মাস্টার হলেই বেশ মানাত আপনাকে;
দেরিতে জেনেছি-
মূলত মাস্টার আপনি
জীবনের পাঠশালায়।
(এরকম তাকিয়ে আছে কেন?
এত ঘৃণা! এত ঘৃণা! এত ঘৃণা!
সনাতন পৃথিবীর প্রতি এত রাগ ! এত ক্রোধ!)
আজ মনে হয়
মূলত আপনি আগ্নেয়গিরির
জ্বালামুখে দাঁড়িয়ে আছেন চুপচাপ
আপনার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে লাভা
অগ্নি ও প্রস্তরখণ্ড শিলা তীব্র তীক্ষ্ণ
লাভায় প্লাবিত চারপাশ
আপনার স্যুটের পকেটে
শরীরের ভাঁজে ভাঁজে চুলে ও দাড়িতে
সভ্যতার অলিতে গলিতে বনাঞ্চলে
গাছের কোটরে পাহাড়ের পাদদেশে
প্রাচীন নগরী ভাঙা গ্রাম বোকা গণতন্ত্র
সবসুদ্ধ ডুবে যাচ্ছে লাভার প্লাবনে
আর আপনি তো দাঁড়িয়ে আছেন
শতাব্দীর লিকলিকে বেত হাতে
পৃথিবীর প্রধান শিক্ষক যেন;
নতুন মাটিতে স্বপ্ন আর সমতার চাষ হচ্ছে আর
আপনার মগজের প্রতিটি কোষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে
একেকটি পাখি, অতঃপর ঝাঁকে ঝাঁকে সাম্যবাদী পাখি
ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে চারপাশে
আমাদের বিলজুড়ে উড়ে-আসা তাঁস
আর আঙিনায় জড়ো-হওয়া কবুতর যেন;
এখন এখানে
গভীর রাত্রির বুকে শোনা যায় ‘দাস ক্যাপিটাল’
মুখস্থ করছে কতিপয় শিশু
এবং আবহমান কালের আঙিনা থেকে
ভেসে আসে অনাদি অনল-লাগা কঠিন কোরাস
পাখির আওয়াজ শুনে খুব দ্রুত হেঁটে যাই
ভবিষ্যতের সে এক যৌথ খামারের দিকে
সূর্যালোকে চোখে পড়ে
দূরে বহুদূরে পৃথিবীর নতুন মাটিতে
কবে
জানা
নেই
প্রান্তরে আজ বহু মানুষের হা-করা করোটি
কী বিশাল এক রুগ্ন আকাশ বৃষ্টিধারায়
তাকে ধুয়ে নেয়।
———————–
হাসন রাজার দিলারা
জগৎ ভরমিয়া তার পঙ্খি হইত মন
রূপের হাওড়ে ডুবে হাসন রাজা কন,-
কও দেখি কুলবতী কত রঙে আর
বুকের ভূ-ভাগে বলো কেমন বিহার
হলে পর, ঝড় বৃষ্টি খরা
এ জীবন তনু মন স্বপ্ন পরম্পরা
বাসনার ব্রত
ফালি ফালি হবে না আর তরমুজের মতো
এই নিশি রাইতের নিঃশ্বাস
বুঝলে দিলারা, এই রাইত, দমে দমে এই যে বাতাস
কোন কথা কয় কার নামে ডাকে
শরীরের বাঁকে বাঁকে
কোন সে মরমি নদী জনম জনম ভর
বান্ধিয়াছি বাসা এই দেহের ভেতর
রাইত যত বাড়ে এই নৌকা নদী কাঁপে
তোমার শরীর যেন বাঁকা তলোয়ার ভরা ছিল খাপে
মাঝ রাইতে লক্ষণশ্রী নীরব নিথর
এই দূর হাওড়ে বজরা ভেতর
তুমি আমি
এ কোন মন্তরে মুগ্ধ জানে অন্তর্যামী
উলঙ্গ পরিরা নাচে মধ্যে দিলারা
আসনে হাসন রাজা দুই চোখে আঁসু তার হৃদয়ে সাহারা
ছটফট কান্দে রাইত বেহুঁশ হাসন
কত নদী হাওড়ের পঙ্খি হইল মন
হাসন উড়িয়া যায় শুয়া পাখি নিঃসঙ্গ দিলারা
জন্ম জন্ম হাসনের দেহখানি দিয়াছে পাহারা।
মোহাম্মদ সাদিক
জন্ম : ১৯৫৫ সালে, সুনামগঞ্জের ধারাগাঁয়ে। আশির দশকের বিশিষ্ট এ কবির এযাবৎ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা আটটি । এছাড়া নাইজেরিয়ার খ্যাতিমান লেখক চিনুয়া এচিবি-এর উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ ‘নেই আর নীলা আকাশ’ প্রকাশিত হয়েছে। মোহাম্মদ সাদিককে গবেষণাকর্মের জন্য আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। কর্মজীবনে তিনি পিএসসির চেয়ারম্যান।
পিতা আলহাজ মোহাম্মদ মবশ্বির আলী ও মা মাসুতুরা তাসমিন-কে নিয়ে তার সংসার। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : আগুনে রেখেছি হাত (১৯৮৫), ত্রিকালের স্বরলিপি (১৯৮৭), বিনিদ্র বল্লম হাতে সমুদ্র শব্দ শুনি (১৯৯১), কে লইব খবর (২০১০) এবং নির্বাচিত কবিতা (২০০৫)।
মাস্টারি বিডি ডটকম । ঢাকা । ২৭ নভেম্বর ২০১৬ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম